Showing posts with label তৈমুর খান. Show all posts
Showing posts with label তৈমুর খান. Show all posts

Saturday, 4 June 2022

জলমাতার সঙ্গে একদিন--তৈমুর খান


জলমাতার সঙ্গে একদিন--
তৈমুর খান


হঠাৎ জলের উপর ভেসে উঠলাম। পৌষের বিকেলবেলা। বুড়িগঙ্গার দুই তীরেই মানুষ থৈথৈ করছে। জলে ডুবুরি নেমেছে। বেশ কয়েকটি ট্রলার এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছে। মৃতদেহগুলি সারি সারি শোয়ানো আছে। তাহলে আমি কী করে বাঁচলাম? সত্যি আমি কি বেঁচে আছি? নিজের প্রতি সন্দেহ হলো। একটা টলার আমার দিকে ছুটে আসছে। কয়েকজন পুলিশ এবং ডুবুরি বলছে: ওই তো একজন ভেসে উঠল! এখনও জীবিত আছে! সাঁতার দিচ্ছে! আশ্চর্য তো!

    আমার কাছাকাছি এসেই দুই পাশ থেকে হাত দিয়ে টেনে তুলল ট্রলারে। ডাক্তারও অপেক্ষা করছিল। সবকিছু দেখে বলল ঠিকঠাক আছে। কিন্তু আশ্চর্য! সকাল ছয়টা থেকে এই বিকেল চারটে পর্যন্ত জলের তলায় থেকে জল শোষণ করে শরীরটা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিছুই হয়নি। পেটেও তেমন জল নেই। চোখ-মুখও স্বাভাবিক। ওরা একের পরে এক প্রশ্ন আমার দিকে ছুঁড়ে দিতে লাগল।

 —এতক্ষণ ধরে কোথায় ছিলেন?

 —তা তো বলতে পারব না।

 —ব্রিজ ভেঙে বাসটি সম্পূর্ণ জলে ডুবে যায়। তেমন কেউই বের হতে পারেনি। এখনও পর্যন্ত ৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনও জলের তলায় কমপক্ষে ১০ জন রয়ে গেছে। ডুবুরিরা তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। অথচ আপনাকে কেউ দেখল না!

 —আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! বাসটি যখন প্রচণ্ড শব্দে জলে পড়ে, তখন পর্যন্ত আমি জেনেছিলাম। তারপর আমার আর কী হয়েছিল কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি সাঁতার কাটছি। আর আপনাদের দেখতে পাচ্ছি।

 —এটা কি সম্ভব? একেবারে অবাস্তব। বারো ঘন্টা ধরে জলের তলায় কোনো মানুষ জীবিত থাকতে পারে না। ইটস্ এ গ্রেট মিস্ট্রিরিয়াস থিংস্।

 —কিন্তু আমিতো মরিনি। আমিতো জীবিতই আছি। চা খাবার ইচ্ছে করছে আমার। গরম গরম দু'কাপ চা খাব।

  সবাই অবাক হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ডাক্তার বলল: আপাতত কোনো ওষুধ লাগবে না। তবে নজরে রাখতে হবে। আপনি এখন ফিরতে পারবেন না। ক্যাম্পে থাকুন।

  আমাকে দেখতে শয়ে শয়ে লোক ভেঙে পড়ল। সাংবাদিকরা একের পরে এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে লাগল । ক্যামেরাম্যান বিভিন্ন রকম অ্যাঙ্গেলে ফটো তুলতে লাগল। আমি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু একটা কথাই বারবার বলতে লাগলাম: আমার কিছু মনে নেই। কীভাবে আমি জলের তলায় ছিলাম সেটাও মনে করতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে, কেউ যেন আমাকে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। এত দ্রুত যাচ্ছিল যে আমি কিছুরই ঠাহর করতে পারছিলাম না। চোখ খুলে তাকাতেও পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কোনো এক পাতালে চলে যাচ্ছি।

     সেদিন অনেক রাতে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দৌলতপুর থানার পুলিশ আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। বাড়ি পৌঁছেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সারা শরীর জুড়ে কীরকম এক ধরনের ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল। আর নিজেকে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। সত্যিই আমি কি বারো ঘন্টা ধরে বুড়িগঙ্গার জলের তলায় স্বপ্ন দেখছিলাম?

     সেদিন ছিল সোমবার। শনিবার হাফবেলা স্কুল ছুটি করে বাড়ি এসেছিলাম। সোমবার ফাস্ট বাস গিয়ে আবার স্কুল করতাম। সেই উদ্দেশ্যেই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বাসে উঠি। ডি এস টি সি বাস। এইটুকু মনে পড়ছে বাসের ড্রাইভার একহাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেছিলেন। অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে কার সঙ্গে জোরে জোরে ঝগড়া করছিলেন। এতই রেগে গেছিলেন যে তিনি দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাই বাস আর কন্ট্রোলে রাখতে পারেননি। দৌলতপুর ব্রিজ ভেঙেই বুড়িগঙ্গার জলে পড়ে যায়। কেবল বাসের খালাসী সাঁতার কেটে তীরে ফিরতে পারে। ড্রাইভারসহ বাসের সব যাত্রীরই সলিল সমাধি ঘটে। তাহলে আমি?

   জলে বাস পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাসে জল ঢুকতে শুরু করে। অধিকাংশ যাত্রীই শীতের পোশাকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের ঢেকে রেখেছিলেন। কেউ কেউ ঘুমের মধ্যেও ছিলেন। ওই পর্যন্তই আমার চেতনা। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখি একটা আশ্চর্য ঘরের মধ্যে আমি বসে আছি। চারিপাশে জল। কিন্তু ঘরের মধ্যে এক ফোঁটাও জল প্রবেশ করছে না। জলই যেন প্রাচীরের মতো দণ্ডায়মান হয়ে আছে। আমার সম্মুখে দীর্ঘদেহী অতীব ফর্সা অশীতিপর এক বৃদ্ধা বসে আছেন। তার চারিপাশে স্তূপ হয়ে আছে মানুষের কঙ্কাল। এত কঙ্কাল! মনে মনে চমকে গেলাম। বৃদ্ধার আয়ত চোখের দিকে চেয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। তারপর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম: 

—আমি কোথায় এসেছি?

 বৃদ্ধা বললেন: জলপুরীতে।

 —আপনি কে?

 —আমি জলমাতা।

 —জলমাতা! এরকম নাম তো কোনোদিন শুনিনি!

 —জলমাতারা কখনও স্থলে যায় না। তারা জলেই থাকে। জলেই ঘরবাড়ি আর জলেই সংসার।

 আরও অবাক হয়ে ভালো করে চেয়ে দেখলাম। জলমাতার হাত পায়ের আঙুলগুলো মানুষের মতো হলেও অনেক অনেক দীর্ঘ। মাথার চুল সাত হাতের বেশি। বৃদ্ধা হলেও শরীরের ত্বক যুবতী নারীর মতোই উজ্জ্বল ও টকটকে লাল। তিনি যেখানে বসে আছেন তার নিচে জলেরই একটা চৌকি। কিন্তু জল এতটুকু নড়াচড়া করছে না। স্তব্ধ হয়ে খাড়া হয়ে আছে। শরীরে পোশাক বলতে ঝিকিমিকি এক ধরনের রেশমের কাপড়। দুই হাতের আঙুলেই প্রবালের পাথর বসানো আংটি। দুই ঠোঁট এমনই রসালো যে মনে হচ্ছে এখনই কোনো দামি সুস্বাদু পানীয় পান করে এলেন। আমি এসব দেখতে দেখতেই বললাম:

 —সংসারের তো কিছুই দেখছি না!

 কথাটি শুনেই তিনি আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করলেন:

 —ওই দ্যাখ!

 নির্দেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে থেকে জলের স্তম্ভ সরে গেল। সম্মুখে উজ্জ্বল হয়ে উঠল একটা আলোক শোভিত অট্টালিকা। মাছের আঁশের মতো উজ্জ্বল চকচকে এর দেওয়াল। ইট দ্বারা যে নির্মিত নয় তা বুঝতে পারলাম। জলের ঢেউকে একত্রিত করে জমাটবদ্ধ করলে যেরকম হয় ঠিক সেরকমই মনে হল। বাড়ির মধ্যে ছোট ছোট অনেক ছেলেমেয়ে ছোটাছুটি করছে। তাদের পরনে ফ্রক জাতীয় পোশাক। কয়েকজন সুন্দরী যুবতী রুপোলী মাছের মতন মনে হচ্ছে ভেসে বেড়াচ্ছে। এক স্বর্গীয় প্রতিভাসে মেতে ওঠা স্বপ্নাতুর দৃশ্য। সারা শরীরে শিহরন অনুভূত হল। তারপর বললাম:

 জলমাতা, আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে! কিছু পানীয় যদি পান করাতে পারেন?

 জলমাতা বসে বসেই তার হাতখানা প্রসারিত করলেন। আর অমনি দুই হাতে লাল ও নীল রঙের পানীয় এনে বললেন: পান কর। এতেই তোর তৃষ্ণা ও ক্ষুধা নিবারণ হবে।

 অদ্ভূত সেই পানীয়ের স্বাদ। এখনও মুখে লেগে আছে। এখনও ক্ষুধা-তৃষ্ণা বলে কিছু নেই। মনে হচ্ছিল অমৃত পান করছি। সমুদ্র মন্থন করা সেই অমৃত।  সেদিন  তা পান করার পর জলমাতাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম: চিরঋণী রইলাম। আপনার দয়া কোনোদিন ভুলতে পারবো না।

 জলমাতা বললেন: দয়াতো প্রথম থেকেই করেছি। বাসে থাকা সবযাত্রী মারা গেছে। আমি শুধু তোকেই বাঁচিয়েছি। আমার হাতের কাছে তুই ছিটকে পড়েছিলি। তবে একটা শর্ত আছে। এটা সারাজীবন তোকে মেনে চলতে হবে।

 কী সেই শর্ত?

 জলমাতা আঙ্গুল তুলে ইশারা করলেন। সেই দিকে তাকাতেই দেখি, আরও তিনটে বাস জলের তলায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন জলের তলায় থেকেও বাসগুলি নষ্ট হয়নি। তা দেখতে দেখতে বললাম: ওগুলো তো বাস! কখন পড়েছিল?

 জলমাতা বললেন: ১০ বছর আগে, আরেকটি ৫ বছর আগে, আরেকটি ৩ বছর আগে। একইভাবেই সব প্যাসেঞ্জারেরই সলিল সমাধি ঘটে। আমার যখন ইচ্ছে হয় তখন এভাবেই একটা বাসকে জলের তলায় আকর্ষণ করি। আর এভাবেই বাস এ্যাক্সিডেন্ট হয়। কেউ জীবিত ফিরে যেতে পারে না।

 —তাহলে আমি তো জীবিত! আমিও কি ফিরে যেতে পারব না?

 একটা শর্তে ফিরে যেতে পারবি, তা হলো, এই জলপুরীর কথা পৃথিবীর কোনো মানুষের কাছে কোনোদিনও বলতে পারবি না। যেদিন বলা শুরু করবি, সেদিনই মুখে রক্ত উঠে মারা যাবি। কেউ বাঁচাতে পারবে না।

 আমি জলমাতার শর্তে রাজি হলাম। বললাম: কোনোদিনও আমি একথা মুখে উচ্চারণ করব না। কোনোদিন আমি বলব না। শুধু আমাকে একটা চিহ্ন দিন সারাজীবন আমি নিজের কাছে রাখব।

 জলমাতা একটা আংটি দিলেন। আর বললেন প্রবালের আংটি। ডান হাতের মধ্যমায় ধারণ করবি। কোথায় পেয়েছিস কেউ জানতে চাইলে কোনোদিনও বলবি না।

 সেই থেকেই এই প্রবালের আংটি আমার হাতে রয়েছে। জলমাতার গল্প কারও সামনেই করিনি। আজ ইচ্ছে হল তাই লিখে জানালাম। জলমাতা, আমাকে ক্ষমা কোরো।

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...