ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়
বাইরে জ্যোৎস্না ছিল। ভেতরে অন্ধকার। নাইট ল্যাম্প ইচ্ছে করে জ্বালায় নি অপূর্ব। রাত এখন দুটো। মাঝে মাঝে আকাশ ঢেকে যাচ্ছিল মেঘে। ঘরের ভেতরে একেবারে ঠাসা অন্ধকার। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি।
-আমি নীলা। শুনতে পাচ্ছ?
ফিসফিসে কন্ঠস্বরে প্রথমটা উল্লসিত হলেও পরে চমকে উঠেছিল অপূর্ব। নীলা কী করে--
-এতদিন পরে? কোথায় ছিলে নীলা? তুমি নাকি-
নীলা নাকি তার মামার বাড়িতে চলে গিয়েছিল।
-সে অনেক কথা। এখানে হবে না। চল বাইরে যাই। বীরুদের সেই স্থলপদ্ম গাছের নিচে যে শান বাঁধানো বেদিটা আছে। যার ওপর আমরা কথা বলতুম।
-এখন? এত রাতে? বৃষ্টি পড়ছে দেখছ কেমন?
আবার সেই খিলখিলে হাসি।
-বৃষ্টি তো ঝিরঝিরে। তুমি বড় ভালবাসতে এমন বৃষ্টিতে ভিজতে। বলতে বৃষ্টি নয় যেন এক ঝাঁক কবিতা। কত রাত আমরা এমন ভিজেছি বল তো?
-কিন্তু সে তো-
আবার খিলখিলে হাসি, তোমার বৌ তো এখন নেই? আর ভাবছ কেন? আমিই তো তোমার বৌ হতুম নাকি?
তা ঠিক। কিন্তু হয় নি। বিয়ের দিন শুভদৃষ্টির সময় চোখ থেকে পানপাতা সরাতে নীলার বদলে শীলাকে দেখে অপূর্বর চোখে লেগেছিল বিদ্যুতের ঝলক। মালাবদল ভুলে গিয়ে রগড়াচ্ছিল তার দুই চোখ।
-কিন্তু আজ এতদিন পরে-
নীলা বলল, এস না বেরিয়ে পড়ি। সেই আগের মত-
বেরিয়ে পড়ল অপূর্ব। সত্যি ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা যেন তাদের আদর করছে এমন ভাল লাগল। অপূর্বর কেমন একটা মনে হচ্ছিল। বলল, বিয়ের দিন-
হ্যাঁ সেদিন। অপূর্বর আশীর্বাদও হয়ে গিয়েছিল শীলার সঙ্গে। শুভদৃষ্টির সময় কেবল জানতে পেরেছিল অপূর্ব। জেনে চমকে উঠেছিল। নীলার সৎ বোন ছিল শীলা।
নীলা শুধু বলল, আমার বোন শীলাও তো সুন্দরী।
অপূর্ব সুন্দরকে ভালবাসে নি। সে ভালবেসেছিল নীলাকে।
-শীলা একদিন দেখে ফেলেছিল আমাদের। আমাকে বলল সেও ভালবাসে তোমাকে আর তোমার সঙ্গে বিয়ে না হলে সে সুইসাইড করবে। আর তাই-
-আর তাই তুমি ভয়ে পালিয়ে গেলে?
অপূর্ব বেশ বিরক্ত হল। অন্ধকারে সেটা টের পেল না নীলা। বলল, আমি চলে গেলুম মামার বাড়ি। শুধু সেই দিনের জন্যে। আর তোমার বাবা মাকে আমার বাবা মা শীলাকেই দেখিয়ে দিল আমার বদলে।
মনে পড়ে গেল অপূর্বর। মেয়ে দেখার দিনে তার বাবা মা বলেছিল মেয়ে দেখতে যেতে। সে বলেছিল, আমার আর দেখার কি আছে বল?
মা হেসে বলেছিল, ওর সঙ্গে মেয়ের যে প্রেম গো। আমি দেখি নি কিন্তু অপুর মুখে শুনেছি সে বেশ সুন্দরী।
-কিন্তু তুমি সেদিন-
-এত আস্তে আস্তে গেলে হবে নাকি? সে কথায় কান না দিয়ে নীলা তার হাত ধরে টানল।
-আরে এত রাতে আবার কোথায় যাব?
-দেখতেই পাবে।
অন্ধকারে ছায়ার মত একটা রিক্সা এসে হাজির। চালকের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। মাথায় আবার একটা পলিথিন বাঁধা। সে হয়ত ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা সহ্য করতে পারছে না।
-ওঠ। আমরা যাই।
-কোথায়?
-দেখতে পারে।
নীলার পাশে এসে বসল অপূর্ব। বেশ আনন্দ হচ্ছে। কতদিন পরে পেয়েছে এক রোমান্টিক ছোঁয়া।
নীলা এসেছে সেই স্থলপদ্ম গাছের গাছে। চাঁদের জ্যোৎস্না ঝরে পড়েছে তার ওপর। কেমন মায়াময় করে তুলেছে জায়গাটা।
নীলা রিক্সা থেকে নেমে সটান চলে গেল শান বাঁধানো বেদির কাছে। বলল, কই তুমি যে বললে অপূর্ব এখানেই আসবে?
অপূর্ব তখনও রিক্সায় বসেছিল। সে অবাক হয়ে ভাবছিল সে এত কাছে তবু নীলা কেন তার খোঁজ করছে? সে বলল, এই তো আমি তোমার সামনে নীলা।
বেশ জোরেই তো বলেছিল সে কিন্তু তার গলার আওয়াজ সে নিজেই শুনতে পেল না কেন? এতক্ষণ তার পাশে বসে রিক্সায় এল। এখন তার উপস্থিতিও টের পাচ্ছে না? নীলার কি এত ভুলো মন হয়ে গেল?
রিক্সাওলা সমীর বলল, আসবে। চুপ করে বসুন।
তার গলাটা কেমন ঘড়ঘড় করছে। কোথা থেকে সে একটা কোদাল বার করেছে। তারপর কোপাতে শুরু করেছে সামনের জমিটা। ভ্রূ কুঁচকেছে নীলার। মাটি খুঁড়ছে কেন সমীর?
সমীরের ঘড়ঘড়ে উত্তরটা শুনতে পেল না অপূর্ব।
এমন সময় আবার আকাশে মেঘ জমছে। চারিদিক মুহূর্তে একেবারে আলকাতরার পোঁচ লাগিয়ে দিল কে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা ঝর ঝর করে পড়তে লাগল।
-নীলা চলে এস রিক্সায়। বৃষ্টিটা বেশ বেড়েছে।
সে চেঁচাচ্ছে কিন্তু আওয়াজ ঢেকে যাচ্ছে বৃষ্টির তোড়ে। এদিকে গাঢ় আঁধারে কোথাও দেখা যাচ্ছে না নীলাকে। বৃষ্টির ছাট সহ্য করতে না পেরে সামনের পলিথিনের ঢাকনাটা নামিয়ে দিল অপূর্ব।
এ তো মহা ফাঁপরে পড়ল সে। নীলা না নিয়ে এলে সে তো দিব্বি উপভোগ করতে পারত এমন বৃষ্টিঝরা রাতটাকে মজা আর আনন্দে। যত সব পাগলামি।
প্রচন্ড হাওয়ার দাপটে সামনের পলিথিনের ঢাকনা এলোমেলো উড়তে লাগল। কড় কড় করে বাজ পড়ল একটা। নজর গেল সমীর যেখানে মাটি খুঁড়ছিল সেদিকে।
এমন সময় আবার জোরে বাজ পড়ল। গর্তটা কত গভীর তাই দেখছে অপূর্ব। তার গভীরে কে দাঁড়িয়ে আছে? ওপরে তোলার কাকুতি মিনতি করছে সমীরের কাছে। কিন্তু সমীর তাতে কান না দিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি ভরাট করেই যাচ্ছে।
একটা কঙ্কাল। বীভৎস করোটি আর সাদা হাড়।
শুধু পরণের পোশাক দেখে চিনতে পারছে নীলাকে সে। নাহলে-
ভোরে একগাদা বুটের আওয়াজের সঙ্গেই ডোরবেল। পুলিশ এসেছে তার বৌ শীলার খোঁজে। তার বাবা মা মানে অপূর্বর শ্বশুর আর শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অপূর্ব বলল, শীলা তো সেখানেই-
সেখানে পাওয়া যায় নি তাকে।
কতগুলো কুকুরে খুঁড়ে খুঁড়ে হাড়গুলো বার করেছে। নীলার হাড়। শীলা চেয়েছিল অপূর্বকে কিন্তু নীলা রাজি হয় নি। তার সৎ মা, সৎ বোন আর নিজের বাবা ষড়যন্ত্র করে তাকে খুন করেছিল।
গভীর রাতে সমীরকে দিয়ে ভুলিয়ে তাকে অপূর্বর সঙ্গে বিয়ে দেবার লোভ দেখিয়ে এই স্থলপদ্ম গাছের নিচে মাথায় লাঠি মেরে খুন করে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিল। সেও ছিল এমন এক বাদল ঝরা আবার চাঁদনি রাত।
No comments:
Post a Comment