সাবিত্রী দাস
আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে ফিরতে পারবে পানুর একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। কুসুম পুর পার হয়ে গেলেও নাহয় কথা ছিল! কুসুমপুর থেকে আরো মাইল দুয়েক যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে।
তখনো কুসুমপুর গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ আসেনি,শুধু কুসুমপুর নয়, ধলাজুড়ি, আমডাঙা, কাজলাডাঙা, বীর হাটী এই গ্রামগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। দামোদর নদীর পাড়ে হাট বসতো সপ্তাহে দুদিন মঙ্গলবার আর শুক্রবার। কুসুমপুর , আশপাশের আরো চার পাঁচটা গ্রামের লোকজন ঐ হাটেই যাবতীয় কেনাবেচা করতো।এ জন্য হাটের দিন গুলোতে কেনাবেচা সেরে আসতে আসতে কোন কোন দিন সন্ধ্যাও হয়ে যেত। হাট থেকে কুসুমপুরের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার মতো। হাট থেকে কুসুমপুরের পথে অনেক ঝোপঝাড় খানাখন্দ ছিল। তখনকার দিনে গ্রামের রাস্তা আর কেমন হবে! বীর হাটি ছিল কুসুমপুর থেকে আরো দু মাইলের পথ। বীর হাটির পানু ঘোষ দুধ নিয়ে হাটে বেচতে যায়, সেদিন সব দুধ বিক্রি হতে হতে বেলা গড়িয়ে গেল।
কুসুমপুরের পথে বাঁশবাগানে তেনারা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন,অনেকেরই এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা আছে। একথা মনে পড়তেই গা ছমছম করা একটা অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরলো। যাই হোক, যতই ভয় করুক বাড়ী তো ফিরতেই হবে। সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ ,সন্ধ্যা নেমে আসার ঠিক আগের সময় মুখ আঁধারে বাঁশবাগানের কাছে পৌঁছাতেই দেখে রাস্তায় লম্বালম্বি বাঁশগুলো পড়ে আছে। ভেতরে ভেতরে যতই ভয় ভয় করুক না কেন বাঁশগুলো না ডিঙোলে তো যাওয়াই যাবে না। যা হয় হোক ভেবে যেই না বাঁশ পার হতে গেছে গোটা বাঁশঝাড় সাঁ সাঁ করে উঠে গেছে উপরে। পানু একটা পা বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে তাকে শুদ্ধ নিয়েই বাঁশঝাড় ক্রমশ উপরে উঠতে থাকলো।বীভৎস একটা মুখ খ্যাক খ্যাক করে হাসছে, ঐ মুখটা তো হরুর! তিনবছর আগে এই বাঁশ বাগানেই গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। ভয়ে হাত পা শরীর কাঁপতে লাগলো , দুধের ফাঁকা ক্যান, হাট থেকে কিনে আনা জিনিস গুলো হাত থেকে ছিটকে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় পানু তো আঁ আঁ করতে করতে ছিটকে পড়েছে রাস্তায় বলা বাহুল্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়েছে।পরের দিন সকালে যখন তার ঘুম ভাঙলো দেখে বাড়ীতে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে।
ভাগ্য ভালো বলতে হবে, ভাগ্যিস তখন বীরহাটির মধু ডাক্তার রোগী দেখে ফিরছিলেন। পানুকে রাস্তায় বেঁহুশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বোঝেন পানু ব্যাটা কিছু একটা দেখে ভয়ে বেঁহুশ হয়ে গেছে। নিজের গাড়ীতে তুলে নিয়ে পানুর বাড়ীতে পৌঁছে দেন।
No comments:
Post a Comment