Saturday, 4 June 2022

অভিশপ্ত ব্রীজকলমেঃ স্বপ্না মজুমদার পুনা (মহারাষ্ট্র)


অভিশপ্ত ব্রীজ
স্বপ্না মজুমদার, পুনা (মহারাষ্ট্র)


নীরা আর সঙ্গীতা কলকাতায় পড়াশোনা করে প্রথম চাকরির প্লেসমেন্টে পুনা শহরে এলো।দুজনেই এক কলেজ থেকে পাশ করেছে।পুনাতে প্রথম প্লেসমেন্ট পেয়ে দুজনেই খুব খুশি। খুব যে বিশেষ বন্ধু ওরা,,তেমন নয়। তবে অচেনা শহরে দুটি বাঙালি মেয়ে বেশ ঘনিষ্ঠ হওয়ায়, বন্ধুত্ব হয়েছে এখন। হাওড়া থেকে আজাদ হিন্দ ট্রেনটিতে আরো অনেক বাঙালি ছেলে মেয়ের সাথে আলাপ হয়েছিল নীরা আর সঙ্গীতার।
এখানে এসে একটি মেসে দুজনে থাকবে ঠিক করেই এসেছিল। সেই মতো নিজেদের রুমটি ওরা গুছিয়ে গাছিয়ে নিল।দু,তিন দিন একটু এদিক ওদিক ঘোরাঘুরিও করলো। নীরা বলছিল,---জানিস তো এখানে কাছাকাছি অনেক দারুন দারুন জায়গা আছে,
ধীরে ধীরে ঘুরবো কেমন।
----- এসেছি তখন,ঘুরবো তো ঠিকই। তবে আগে অফিসে জয়েন করি। কি যে কাজ হবে বুঝতে পারছি না।
----- আমার অফিস তো বলেই দিয়েছে,,এখন তিন মাস রোজ যেতে হবে।তারপর ওয়ার্ক ফ্রম হোমে কাজ করতে হবে তবে,ওই দুদিন সপ্তাহে যেতে হবে মনে হয়।
----- সেই রে।দেখা যাক।কোভিডের পরে সব সিচুয়েশন ঘুরে গেছে।

দিন কয়েক পরেই দুজনেই অফিস জয়েন করে। আইটি ইন্ডাষ্ট্রির শহর এটা। চারিদিকে অনেক অফিস দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই মন দিয়ে কাজ করছে। সেদিন অফিস থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে যায় দুজনের। বৃষ্টি শুরু হয়েছে।পাহাড়ি শহর।প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে। অফিসের ক্যাবে দুজন শুধু। বেশ ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ রাস্তায় বড়ো গাছ পড়েছে দেখে ড্রাইভার বলে,-- থোড়া ঘুমকে যানা পাড়ে গা।ইয়ে রাস্তা তো বন্ধ লাগতা হ্যায়।
নীরা বলে,--- উও তো দেখা হমনে।চলিয়ে দুসরি রাস্তে সে।
ড্রাইভার গাড়ি অন্য রাস্তায় ঘুরিয়ে চালাতে শুরু করে।
একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে চলতে শুরু করতেই দূর হতে
সাদা পোষাক পরা তিনজন,হয়তো স্বামী,স্ত্রী ও ছোটো বাচ্চা হবে। ওরা এগিয়ে আসতে থাকে,আর হাত দেখাতে থাকে লিফট চাই ওদের। নীরা বলে,--- এই বৃষ্টিতে ওরা বেশ বিপদে পড়েছে মনে হয়।ড্রাইভার,,আপ রুকিয়ে। লিফট দেনা হ্যায়।
ড্রাইভার বলে,--- নেহি,,ঠিক সে দেখিয়ে।উন লোগো নে ক্যায়সে আতে হ্যায়। উও ভূত হ্যায়। মুঝে জলদি যানা হ্যায়। রুকুঙ্গা নেহি।ইয়ে ব্রীজ মে কভি কভি আ্যয়সা হোতা হ্যায়,,শুনা হ্যায় ম্যায়নে।
----  শুনা হ্যায় তো,,ইধার আয়া কিঁউ?
---- ক্যায়া করু ম্যাডাম! যানে কে লিয়ে অর রাস্তা নেহি।
নীরা, সঙ্গীতা দেখে সত্যিই তো ওদের পা কোথায়?
ওরা যেনো উড়ে উড়ে আসছে। ভয় পেয়ে যায় ভীষন দুজনে।দেখে এতো বৃষ্টির মধ্যেও ওরা ভেজেনি।
ভীষন ভয়ে দুজনে দুর্গা নাম জপ করতে থাকে।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা গাড়ি যেতে যেতে হাত ইশারায় বলে,--- জলদি সে যাইয়ে।
নীরা, সঙ্গীতা পিছনে তাকিয়ে দেখে ওই তিন মূর্তি খুব জোরে জোরে গাড়ির পিছনে দৌড়চ্ছে।
ড্রাইভার খুব দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে ব্রীজ পার হবার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ  আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়,আলো ঠিকরে পড়ে।
বৃষ্টি আরো জোরে পড়তে থাকে। হঠাৎ দেখে গাড়িতে ড্রাইভার নেই।গাড়ি উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়চ্ছে।
নীরা, সঙ্গীতা ভয়ে আড়ষ্ঠ।ফোন করতে থাকে চারিদিকে। পুলিশ স্টেশনে।
গাড়িটা জোর ধাক্কা মারে ডিভাইডারে।
নীরা, সঙ্গীতা রক্তাক্ত,অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকে গাড়ির মধ্যে।পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ড্রাইভারকে পাওয়া যায় মৃত অবস্থায় ব্রীজের নীচে।
বাড়ির লোক কলকাতা থেকে ছুটে আসে। অফিসের লোকজন আসে।সবাই বলাবলি করে, বেশ কিছু বছর আগে ওই ফ্যামিলিটা কার আ্যকসিডেন্ট করে এই ব্রীজে। সে সময় অনেক লিফট চেয়েছিল ওরা। কোনো গাড়ি সেদিন বর্ষার রাতে ওদের লিফট দেয়নি। পরে মধ্য রাতে ট্রাকের ধাক্কায় ওরা মারা যায়। সেই থেকে বর্ষা রাতে ওদের এভাবে কেউ কেউ লিফট চাইতে দেখেছে মাঝে মাঝে।লিফট দিতে গাড়ি স্লো হলেই ওরা গাড়িটাকে ব্রীজ থেকে ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দেয়। এভাবে এই ব্রীজে অনেক আ্যকসিডেন্ট হয়েছে।
নীরা, সঙ্গীতা হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেও
ভয় ওদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। মনের সুস্থতার জন্য এখন ওরা দুজনেই  সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং করছে।ড্রাইভারের মৃত্যুটা বেশ রহস্য হয়ে রইলো।
বন্ধ চলন্ত গাড়ি থেকে  কিভাবে ব্রীজের নিচে গিয়ে পড়লো কেউ বুঝতেই পারলো না।হয়তো গাড়ির দরজা খুলে গিয়েছিল।।

***মহারাষ্ট্র, পুনা

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...