Tuesday, 7 June 2022

জাম পুকুর--সন্ধ্যা রায়


জামপুকুর--সন্ধ্যা রায়

আমি এক সরকারি চাকুরে। এই গ্রামে নতুন এসেছি। আমার ঘরের চারদিকে বাগান, পাশেই একটা বড় বিশাল বাড়ি। বাড়িটা অনেক পুরনো, অনেকটা সাবেকি বাংলো টাইপের। আমার ঘর সোজা রাস্তাটা গিয়ে বড় রাস্তায় মিশেছে। আবার ওই বড় রাস্তাটা চলে গেছে শহরের দিকে। আমি ঘরের জালনার পাশে বসে সোজা রাস্তার ওপারে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। দূরের ঐ পাহাড়টা সবুজ গাছে ঘেরা। নীল আকাশ, বড় মনোরম এই দৃশ্য। হঠাৎ সামনে একটা বাচ্চা আর এক মহিলাকে ছুটে বেড়াতে দেখলাম। মনে হচ্ছে ওরা দুজনে খেলছে। ওরা দুজন মা ও ছেলে হবে। গ্রামের মহিলার মাথায় বড় ঘোমটা, তার মুখ দেখা যায় না। জালনা থেকে আমি ওদের খেলা দেখছিলাম। সকালটা বেশ ভালো কাটলো। আবার অফিসে বেরোলাম। জনা ছয়েক স্টাফ। প্রথম দিন সবার সঙ্গে মিলেমিশে গল্প করে সময় কাটলো। অফিস থেকে বেরোবার মুখে আমার বন্ধু, অর্কর ফোন এলো, সে বলল, রঙ্গন, ভাবলাম তোর অফিস আর তার পাশের গ্রামটা একবার দেখে আসবো--

রঙ্গন বলল, ভালই তো, আয়না আমি অফিসের সামনে একটা ছোট হোটেলে বসে চা খাচ্ছি। তারপর তুই এসে গেলে একসাথে রাতের খাবার খেয়ে দুজনে গ্রামে ফিরব । তুই আয়, রঙগন বলল আমি ততক্ষণ এখানেই আছি । 

অর্ক বলল, আচ্ছা রাখছি বাস আসছে আমি বাসে উঠছি । বলে অর্ক ফোনটা রেখে দিল ।

রঙ্গন মনে মনে ভাবতে লাগলো। এই হোটেলটা রাস্তার ওপরে বলে যত লরি বাস-ট্যাক্সি কার যাচ্ছে, ড্রাইভার যাত্রীদের অনেকেই এখানে চা নাস্তা করে নিচ্ছে । কেউ আবার দুপুরে আর রাতের খাবার খেয়ে যায় আমার ভালোই হয়েছে । ভাবছি এখানকার নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যাব । এরপর সিগারেটটা ধরিয়ে নিয়ে বসলাম। সামনে অস্তগামী সূর্য, এত সুন্দর দৃশ্য। এই দৃশ্য দেখার জন্য লোকেরা কোথায় না কোথায় যায়! আর আজ আমি চোখের সামনে এখানেই দেখতে পাচ্ছি । সুদূর প্রসারিত হলুদ সরষে খেতটা যেন দিগন্তে মিশে গেছে । আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের কোনটা অন্ধকারে ঢেকে রেখেছে । দুই পাহাড়ের মাঝে সূর্যটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। যেন কোন পটে আঁকা ছবি। কি মনোরম দৃশ্য। কালকে অর্ককেও  দেখাবো। সূর্য গেল সেই অতলে তলিয়ে, চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো। বেশকিছু গাড়ি আলো ছড়িয়ে দিয়ে নিমেষে চলে যাচ্ছে। আবার কেউ নামছে, উঠছে। এর ভেতরেই পৌঁছে গেল  অর্ক । খুশি হলাম ওকে দেখে, এই অন্ধকারে এত সময় একা বসেছিলাম । দুজনে মিলে চা খেলাম।

একটু পরেই দেখছি পেছন থেকে চাঁদের উদয় হলো চাঁদ টা দেখে মনে হচ্ছে মাত্র দু তিন দিন পরেই পূর্ণিমা হবে । অর্ক চাঁদের আলোতে চারপাশটা দেখে খুব খুশি হল। হোটেল থেকে আমরা রাতের খাবার খেয়ে রওনা দিলাম ঘরের দিকে । বিরাট খোলা মাঠ দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না অর্ক খুব আনন্দে গান ধরল   ------- ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে, কারো নজর লাগতে পারে  ।   গানের শেষে এসে পৌ্ছালাম ঘরের  সামনে । তখনই দারোয়ান এসে বলল --- বাবু তোমাকে কর্তামশাই ডেকেছে কথা আছে।  

রঙ্গন বলল কোথায় যাব? 

দারোয়ান বললো, ওই যে পাশের বাড়িটা, ওটাতে-- 

রঙ্গন বলল, ওখানে তো কোন আলো দেখি নি , ওর দরজায় সব সময় একটা বড় তালা ঝুলানো থাকে।  

লোকটা বলল, এখন যান, পাবেন, ঘর খোলা আছে । 

রঙ্গন বলল, ঠিক আছে, কাল যাব । 

আচ্ছা, বলে দারোয়ান চলে গেল । 

দুই বন্ধুতে অনেক গল্প গুজব হল তারপর ঘুমিয়ে পরল রাতে। হঠাৎ প্রচনড শব্দে ওদের ঘুম ভেঙে গেল । অর্ক বলল, একি এতো জোরে আওয়াজ ? একটু পরেই বাসনের জোরে আওয়াজ হল। রঙ্গন বলল, এতো বড় বাড়ি হয়ত অনেক লোকজন আছে । একটু পরেই জোরে জলের আওয়াজ হল যেন নদীতে বান এসেছে । 

রঙ্গন বলে উঠলো, বাইরে বর্ষা হচ্ছে না তো ? ওরা বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে দেখলো। ওরা চুপচাপ শুয়ে আছে, কোন কথা নেই। একটু পরে ওরা অনেক লোকজনের আওয়াজ শুনতে পেল। রঙ্গন ভাবল, ও দিনের বেলায় অনেকটা সময় ছিল না, তাই হয়ত লোকজন থাকার কথা জানতে পারেনি। ও জানে না দিনেও এমন হয় কি না। 

ভোরের দিকে ওদের চোখে ঘুম এল। সকালে উঠতেও দেরী হয়ে গেল। সকালে ওরা দেখল বাইরে রাতের বৃষ্টির নাম নিশানা নেই। রঙ্গন অফিসে যাওয়ার মুখে বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখল সেই তালাবন্ধ ঘর। এখানে কেউ থাকে না নাকি? রঙ্গনের মনে ভয়ের উদয় হল। ও ভাবল এখানে থাকবো না, গ্রামের ভেতরে গিয়ে কোন ঘর নিয়ে থাকব । দুই বন্ধু চুপচাপ ভাবতে ভাবতে হোটেলে পৌঁছাল। হোটেলবালাকে জিজ্ঞেস করল, ওই বড় পুরনো বাড়িতে কেউ থাকে না নাকি ? হোটেলওয়ালা বলল, ওখানে ত কেউ থাকে না, ওই বাড়ির পেছনে এক বড় গভীর জলাশয় আছে, নাম তার জামপুকুর। শুনেছি, ওই বাড়ির বড় কর্তার নাতি ওই জলে পড়ে যায় আর ওকে বাঁচাতে গিয়ে ওর ছেলে আর ছেলে বউ দুজনেই মারা যায়। পরে বুড়ো কর্তাও  মারা গেছে শুনেছিলাম। তারপর গ্রামের লোকেরা কেউ গরু চরাতে গেলে বা বাচ্চারা ভুলে চলে গেলে কেউ নাকি বেঁচে ফেরে না। গ্রামের লোকেরা গিয়ে দেখে জলে পড়ে মরে আছে। এ সব শুনে রঙ্গন অফিসে গেল। নিজের কাজ করে কাউকে কিছু না বলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় মতলব আটল এখানে আর সে থাকবে না । বলল, বুঝলি অর্ক এখানে থাকা চলবে না । চলে যাব । 

অর্ক বললো, ঠিক বলেছিস চল, আমার সঙ্গে চল। ব্যাগটা নিয়ে আসি আগে । সন্ধ্যায় গিয়ে দেখে বড় বাড়ীটা তালা খোলা। রঙ্গন বললো, একবার দেখা করে আসি। ওরা দুজনেই গেল। ওরা দেখল টেবিলে একটা হারিকেন জ্বলছে, ঘরটা স্যাঁতস্যাঁতে । সীতানাথ মুখুজ্যে মশায় বসে আছেন । রঙ্গনরা যেতেই ওদের বসতে বলল । অর্ক দাঁড়িয়েই ছিল। রঙ্গন পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিয়ে বলল, আমি আর থাকব না এখানে । আমার মন টিকছে না । সীতানাথ ইয়া বড় চোখ তুলে বলল, কেন সে কি? কি হয়েছে ? চিৎকার করলেন তিনি। 

অর্ক ওর চোখ দেখে ভয় পেয়ে গেল । ও উঠে দাঁড়ালো । তখন ভেতর থেকে ওই ঘোমটা দেওয়া বউটা আর ছোট ছেলেটা বেরিয়ে এলো । ওরা জোরে জোরে হাসতে থাকলো । রঙ্গনরা দেখল, বউটা ঘোমটা খুলে দাঁড়িয়ে, ও একটা কঙ্কাল। ছেলেটা আর সীতানাথ বাবুও তাই--ওরাও কঙ্কাল। হারিকেনের আলোয় রঙ্গন ও অর্ক দেখতে পেল, অন্ধকারে কুড়ি পঁচিশটা আরো কঙ্কাল এসে দাঁড়িয়ে। কঙ্কালরা অট্টহাসি হাসছে। ওই আওয়াজে আর ভয়ে রঙ্গন মূর্ছা গেল। ওকে টেনে নিয়ে বারান্দায় এসে  অর্ক চিৎকার করে উঠলো--হেল্প, হেল্প--কেউ কি আছেন ?

অন্ধকারে কেউ এলো না। হঠাৎ ওর মনে হল, ওর ব্যাগে জলের বোতলটা আছে। ও তাড়াতাড়ি জলের বোতলটা থেকে জল নিয়ে রঙ্গনের চোখে দিল । রঙ্গন তাড়াতাড়ি উঠে বসলো সম্বিৎ ফিরতেই দুজন প্রচন্ড দৌড়ে সোজা দোকানে এসে বসে পড়ল। 

রঙ্গন দোকানদারকে বলল, বাস কখন আসবে ? 

দোকানদার বলল, বাস ত এখনই বেরিয়ে গেল । আবার সেই ঘন্টা দুই পরে লাস্ট বাস কিন্তু আশ্চর্য একটু পরেই একটা বাস এলো! ওরা তড়িঘড়ি করেই সেই বাসে উঠে বসলো, দেখল, প্যাসেঞ্জারের সবাই ঠান্ডায় চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে।  অর্কর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, বুঝলি আমরা বড় বাঁচা বাঁচলাম । 

বাস অন্ধকারে ছুটে চলেছে। রাস্তায় লোক উঠছে - নামছে।  আর কিছু পরে ওদেরও নামতে হবে। হঠাৎ ওরা দেখতে পেল, ওদের মোড় এসে গেছে। রংগন দাঁড়িয়ে বললো, থামাও থামাও, সিঁথির মোড় এসে গেছে। আমরা নামব-- 

বাস থামল না, অর্ক চিত্কার করে উঠলো, থামাও থামাও রঙ্গনের চিৎকারে বাসের সবাই পেছনে ঘুরে তাকাতেই রঙ্গন আর অর্ক দেখলো সামনে বসে ওরা সবকটা কঙ্কাল! এবার ওরা চিৎকার করতে করতে বাসের দরজার কাছে এসে সজোরে ধাক্কা মারলো । এক মুহূর্তের জন্য বাস থামল আর দরজা খুলে গেল । অর্করা  দুজনে ভয়ে হাত ধরাধরি করে নামছে । দুজনে যেন কাঁপছে । নেমে ওরা সামনেই দেখল ওই ঘোমটা দেওয়া বউ আর তার ছেলেটা, কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে এমনি কঙ্কাল দেখে রঙ্গন আর অর্ক ভয়ে চিৎকার করে উঠল। মহিলা আর ছেলেটা বাসে উঠতেই অট্টহাসির আওয়াজে চার দিক যেন ভরে গেলো। বাসটা অন্ধকারে ছুটতে শুরু করল, আর মুহূর্তের মধ্যেই কোথাও মিলিয়ে গেল।  

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...