Saturday, 4 June 2022

লাখু গোয়ালার গরু-- ঋভু চট্টোপাধ্যায়


লাখু গোয়ালার গরু--                
ঋভু চট্টোপাধ্যায়



দরজাটা হাল্কা খুলে মুণ্ডুটা দরজার ভিতরে কিছুটা ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাক্তার সাহেব আসব?’ ডাক্তারবাবু মাথা তুলে একবার দেখে বললেন, ‘তুমি কে,সোজা আমার ঘরে, কি ব্যাপার?’

–এজ্ঞে আমি লাখু গোয়ালা,আমার লখির লগে এয়েছি।

–কি হয়েছে তোমার লখির?

-এজ্ঞে বাচ্চা দিবেক।

–বাচ্চা দিবেক তো ভর্তি করে দাও।

-এজ্ঞে ইখানেই গ্যাঁড়া, ভরতি লিছে নাই।

-কেন?

-এজ্ঞে টিকিটের লাইনে কত কথা, বাপের নাম শুধায়, মায়ের নাম শুধায়।

-তুমি তাদের নাম বলবে।

-ইখানেই গ্যাঁড়া, মায়ের নাম জানি, আদুরি, কিন্তু বাপের নাম তো জানি না।

–কেন? তোমার মেয়ে নয়?

-বিটির পারা বটে, কিন্তু বিটি লয়।

-তাহলে যার মেয়ে তার নামটা লিখে দাও, আর এখান থেকে যাও, আমার অনেক কাজ।

–উখানে তো নাম লিছে নাই।

-আচ্ছা আমি বলে দেব, এবার নাম নিয়ে নেবে।

তারপরেই মহকুমা হাসপাতালের সুপার বেল বাজিয়ে হাসপাতালেরর এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিকে ডেকে বললেন,‘এই পল্টু এই লোকটার কি হয়েছে একটু দেখে দিও তো।’ কর্মচারি ভদ্রলোক আচ্ছা বলে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট কুড়ি পরে এক্কেবারে হাঁপাতে হাঁপাতে সুপারের ঘরে এসে বলেন,‘স্যার লোকটা একটা গরু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে এসেছে, গরু নাকি বাচ্চা দেবে।’ কথাটা শুনেই সুপারের মাথার অবশিষ্ট চুলগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা আরম্ভ করে দিল।এই হাসপাতালে যোগ দেওয়ার পর প্রতিদিনের নিত্য নতুন ঝামেলাতে মাথার চুল পঞ্চাশটাতে গিয়ে ঠেকেছে।ঝামেলা বলে ঝামেলা, জন্ম প্রমান পত্র থেকে মৃত্যু প্রমান পত্র, ডাক্তার থেকে জমাদার, মোক্তার থেকে ফোক্তার, ঝামেলা করতে কেউ বাদ দেয় না।এর পর রোগী থেকে ভোগি, পেসেন্ট পার্টি থেকে লোকাল পার্টি, ব্যান্ড পার্টি ও তো আছে।সুপারের অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা ঘুমিয়ে বাঁচি।কিন্তু এসব কথা বাইরের লোককে বলা যায় না।তাই একটু ঝাঁঝ নিয়ে বলেন, ‘লোকটাকে ডাকো তো দেখি।’ ডাকতেই লাখু গোয়ালা হাজির।সুপারের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা পেন্নাম ঠুকে বলে, ‘বলেন স্যার।’

–তোমাকে এই হাসপাতালে গরু নিয়ে আসতে কে বলেছে?এটা কি গরুর হাসপাতাল?

-তা লয় জানি, কিন্তু আমাকে যে বললেক এখন মানুষের হাসপাতালে পশুদেরও চিকিৎসে হচে।

শেষের কথাটা শুনে সুপার রীতিমত রেগে উঠে বলেন, ‘কে বলেছে, এই কথা কে বলেছে শুনি।’

-এজ্ঞে আমার পুঁটিকে যে মাস্টার পেরাইভেট পড়ায়, সেই তো বললেক।

-তোমাকে বলে দিলে, আর তুমি অমনি নিয়ে চলে এলে।

-কি করব সার, আমি তো লেকাপড়া শিখি নাই, আমাকে যা বললেক তাই করলুম। বললেক, ‘লাখু কাকা, তুমার গরুর বাচ্চা দিবে, তুমি আমাদের মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে চলে যাবে।’ আমি অবাক হয়ে শুধারাম, ‘আমাদের হাসপাতালে আমার লখির চিকিৎসে করবেক কেনে?’ আমাকে বললেক, ‘তুমার আর বুদ্ধি হল নাই কাকা, কলকেতাই মানুষের হাসপাতালে কুকুরের টিরিটমেন্ট হইচে, আমাদের হাসপাতালে তুমার গরুর চিকিৎসে হবেক না কেনে?’

আমি বললুম, ‘নারে তুই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস।’ আমাকে বললেক, ‘নাগো কাকা, তুমি এক কাজ কর, পঞ্চায়েত অফিস থেকে লিখিয়ে নাও।’

আমি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পাড়ার ডালু বোসকে বললাম, দুদিন পর ডালু বোস কাগজ দিয়ে দিলেক, আমার লগে ভারি খাতির কিনা।শেষের কথাগুলো শুনেই সুপার রীতিমত অবাক হয়ে বলল,‘তোমাকে কাগজ দিয়ে দিলে?’

–লাখু বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলে, ‘হুঁ, দিবে নাই কেন? আমাদের গাঁয়ের বটে।’

রাগে তখন সুপারের মাথা ফুটতে আরম্ভ করছে।যথা সম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলে, ‘দেখি তো কাগজ টা।’

লাখু গোয়ালা পকেট থেকে কাগজটা বের করে সুপারের হাতে দিল।কাগজটা পড়ে সুপারের চোখ দুটো  খুলে পাশের গাছে চেপে যাওয়ার মত অবস্থা হল।কাগজের ভাষা সত্যি হলে গরুর নাম লক্ষী ঘোষ, বাবার নাম লক্ষণ ঘোষ।সুপার কাগজটা টেবিলে রেখে লক্ষণের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি পড়াশোনা কর নি?’

–এজ্ঞে না, নুনু বেলাতে গেদে অভাব ছিল, পড়তে পারি নাই।

সুপারের অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করলেও কিছু না বলে শুধু বলে, ‘দেখ এটা মানুষের হাসপাতাল, এখানে পশুর চিকিৎসা হয় না।’ লাখু বলে,‘কেনে, কলকেতার হাসপাতালে কুকুরের টিরিটমেন্ট হলে ইখানে গরুর হবেক নাই কেন?’

এই প্রশ্নে সুপার কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না,শুধু বলে,‘তোমাদের গ্রামে গরুর ডাক্তার যায় না?’

–যায় সার, তবে ভালো লয়, প্যাটে পুকার উষুধ দ্যায়, উসব খেলে গরুট গেদে লাদে,ইতিমধ্যে বাইরে একটা গোলমাল শুনে সুপার তার চেম্বারের বাইরে এসে দেখে হাসপাতালে ভিতরে সবাই একটা গরুকে নিয়ে অস্থির। গরুটাও হাম্বা হাম্বা করে ডেকে বেশ কয়েকটা ঘরে কিছু ক্ষয় ক্ষতি করে শেষে লেবার রুমে ঢুকে পড়েছে।কথাটা শুনে লক্ষণ লেবার রুমের ভিতর গিয়ে মিনিট দশ পরে হাসি মুখ নিয়ে বেরিয়ে বলে, ‘আমার লখির বকনা হইছে। গ্যাঁজলাটা কেটি গেলে আপনাকে খাঁটি দুধ খাওয়াবো।’

 

***Sougata Chatterjee
B1-85/1, V.K.Nagar, M.A.M.C, Durgapur-713210
Paschim Bardhaman
Phno- 6295919013
Email-wribhuwriter.dgp@gmail.com

ঋভু চট্টোপাধ্যায়
আসল নাম সৌগত চ্যাটার্জী। সরকারি স্কুল শিক্ষক। প্রকাশিত লেখা আনন্দবাজার, দেশ, সুখী গৃহকোণ, গৃহশোভা, তথ্যকেন্দ্র, প্রভৃতি বাণিজ্যিক পত্রিকা। মনকলম, দেখা, সহ বহু লিটিল ম্যাগাজিন। বাংলা লাইভ, উদ্ভাস সহ একাধিক অন লাইন পত্রিকায়। নিয়মিত লেখা বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতে।

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...