----অদিতি ঘটক
"আমি যে কি বলে তোকে কৃতজ্ঞতা জানাবো ভেবে পাচ্ছি না। আমি তো মরমে মরে ছিলাম এই ভেবে যে, আমাদের সেই ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বটা এইভাবে নষ্ট হয়ে গেল বলে। তুই যে এত..দি..ন পর আমায় ডেকে কথা বলতে চাইলি আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দিলি তার জন্য তোকে ধন্যবাদ জানবার ভাষা নেই।
অয়ন, আমি সত্যি বলছিরে, উষশীকে তোর থেকে কেড়ে নেবার অভিপ্রায় আমার কোনোদিনই ছিল না। আমি জানতামও না তুই ওকে ভালোবাসিস।
তুই তো জানিস আমি উষশীকে টিউশনি পড়াই। আরো পাঁচজনকে যেমন পড়াই, তেমনই। টিউশনি পড়িয়েই তো আমার হাত খরচা ওঠে। তুই তো জানিস, আমাদের অবস্থা। পকেটমানি দেওয়ার মত ক্ষমতা বাবার আর কবে ছিল। বরাবর নিজেই টিউশনি করে আর স্কলারশীপের টাকায় পড়াশোনা এবং অন্যান্য সমস্ত প্রয়োজন মিটিয়েছি। তুই তো সব জানিস। তোর কাছে তো কোনো কিছুই লুকনো নেই। আমাদের বন্ধুত্ব তো কোনোদিন তেমন ছিল না রে। তুই তো এটাও জানিস, উষশীর মা নেই। জানিসই তো ও কেমন চাপা স্বভাবের মেয়ে। ওর সুবিধা অসুবিধার কথা কোনোদিনও মুখ ফুটে বলে না। কলেজ ফেরত পড়াবার জন্য উষশীদের বাড়ি যেতেই সেদিন উষশীর শয্যাশায়ী বাবা আমার হাত চেপে ধরে উষশীর সব দায় দায়িত্ব আমায় সঁপে দিয়ে গেলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও কম হতচকিত হয়নি কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটার কথাও ফেলতে পারিনি রে---
বিশ্বাস কর, তবুও আমি উষশীকে আলাদা ভাবে জিগ্গেস করে ছিলাম। ওর আপত্তি আছে কিনা। স্বল্পভাষী উষশী দুদিকে মাথা নেড়ে না বলে তার সম্মতি জানিয়েছিল।
◆◆
অয়ন ! মেল ট্রেন আসছে, লাইনের ধার থেকে সরে আয়। এবার তো আমার দিকে ফের। মুখ ঘুরিয়ে অন্তত একবার তাকা আমার দিকে।
আমি হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি-- যদি কোনো শাস্তি দিতে চাস আমি মাথা পেতে--- কথা শেষ হবার আগেই মেল ট্রেনটা স্টেশন কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কিছু বোঝার আগেই অয়ন ঝাঁপিয়ে পড়ল, রুদ্রেশও দৌড়ল অয়নকে বাঁচাতে-- কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। অয়ন লাইনের তলায়, রুদ্রেশ ট্রেনের গতির টানে নীচে। লাইনের পাশে একদম প্লাটফর্মের ধার ঘেঁষে পড়ে।
◆◆
এই চিত্রনাট্য যখন অভিনীত হচ্ছে তখন দুই বন্ধুকে অনুসরণ করে আসা আরও দুই বিশেষ বন্ধু উষশী ও ঋষিতা হাতধরাধরি করে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে সব দেখছে--
দুই বাল্যবন্ধুর থ্যাতলানো দেহ দেখে আর উষশীর মুখের অদ্ভুত প্রশান্তি দেখে ঋষিতার উষশীকে ধরে থাকা উষ্ণ মুঠোটা শীতল, শিথিল হয়ে খসে পড়ে। ঋষিতা স্টেশনের উল্টো দিকে দৌড়তে থাকে।
উষশীকে সে যতই ভালোবাসুক তবুও এই নৃশংস, অভিশপ্ত ভালোবাসা সে চায় না। এই নিষ্ঠুর প্রাপ্তি থেকে ঋষিতা অনেক দূরে পালাতে চায়। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেও বেশিদূর এগোতে পারেনা। এক ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়ে। কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন ওকে লাইনের উপর জোর টেনে আনে। অসম শক্তির লড়াই এ সে হেরে যায়। আর সেই সময়ই একটা থ্রু ট্রেন.... উষশীও এই এখানেই...।
বলুন ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপনের এটা উপযুক্ত জায়গা কিনা। দেখুন রেল লাইনটা কেমন মুঠো মুঠো লাল রক্ত গোলাপ এ সেজে---
◆◆
কি করছিলেন কি? মরবার শখ হয়েছে? দেখছেন না থ্রু ট্রেন। হাতটা ধরে টেনে না আনলে তো একেবারে..
--- না, মানে, চিঠি, আমন্ত্রণপত্র, এটা তো পরিত্যাক্ত স্টেশন, রক্তগোলাপ, ভ্যালেন্টাইন ডে ...
পরিত্যাক্ত! রক্তগোলাপ, ভ্যালেন্টাইন ডে! হাহাহা... এইবার আপনি...! হাহাহা.....
★★★★★★★★★★★★★★★★
***অদিতি ঘটক
চুঁচুড়া
হুগলি
No comments:
Post a Comment