Monday, 6 June 2022

নিলয়ের মননে-- দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়


নিলয়ের মননে
দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়

নিলয় বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই অনেক সুখে আনন্দে দিন কাটিয়েছে, অভাবের চিহ্ন কোথাও নেই।প্রতি বছর দুবার করে বাইরে যাওয়া, বড়ো স্কুলে পড়াশোনা করা,নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে বিদেশে চাকরি নেওয়া।অনেকটা রূপকথার গল্পের কাহিনী মনে হয়।
সেবার ওরা আগ্রায় বেড়াতে গেছিল, ওখানে অনেক স্থাপত্য শিল্পের দৃষ্টান্ত রয়েছে,তাজমহল তো বিখ্যাত। ঘুরে ঘুরে যত নিলয় দেখে,তত প্রশ্নের পর প্রশ্ন তার মনে উঁকি দেয়, কিছুতেই দমন করতে পারে না।
মহলের মধ্যে কে আছে যে,কান্না শোনা যায়,কে যেন
কাঁদতে কাঁদতে বলে,জানো আমার গল্প, আমি এখানেই বন্দী আছি। সবাই আমাকে দেখতে আসে, কিন্তু আমার কান্না শুনতে পায় না, সবার এতো ভালো লাগে, কেন জানো,এর মধ্যে আমার অস্তিত্ব আছে বলে, আমার ভালোবাসার রক্ত গোলাপ সাদা উজ্জ্বল পাথরের গায়ে, জ্বলজ্বল করে জ্বলে!
অনেক টাকা খরচ করে বানানো সেরা মহলের,প্রতি দেওয়ালে দেওয়ালে আমার কান্না প্রতিধ্বনিত হয়, তাতে তোমরা রোমাঞ্চিত হও।
আর , বলো আশ্চর্য !
কি আছে, যা শুধু অনুভূত হয়।
নিলয় বিড়বিড় করে বললো ভূ , ভূত !
হা হা করে কে যেন, হেসে উঠলো,বললো দাঁড়াও,
আমি তাজমহল বানানোর মিস্ত্রি,এখান ছেড়ে আমিও যেতে পারিনি, কারণ এই মহল বানানোর পর আর কোনো কাজ করতে পারিনি,
ইচ্ছে ছিল, আরও কিছু কাজ করার ,সম্রাট,সে হুকুম দেননি,
তাই আমরা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছি !
কিসের প্রতিশোধ ? সম্রাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।
আর আপনি সেই সম্রাট !
আ- আমি মানে !
হা হা হা হা  ! 
ভূ - ভূত !
ওর মা বলে কিরে ভূত ভূত করছিস কেন? 
কোথায় ভূত ?
কোথাও কেউ নেই, ফালতু চিন্তা করা তোর স্বভাব হয়ে গেছে।
এর মধ্যে লালকেল্লা আগ্রার অনতিদূরে রয়েছে। নিলয় বাবা মায়ের সঙ্গে ওখানে আসে।
ওখানে এসেও একই সমস্যায় পড়তে হয়, যদিও "লালপাথর" "সিনেমার সঙ্গে এই জায়গার তেমন মিল নেই,
তবুও নিলয় ও সিনেমার স্মৃতি আবছা আলোয় ছায়া ছায়া দেখতে পায়, খুনের সময়,যে আর্ত চিৎকারে বলেছিল--- "অমরদা"  , কথাটা কেমন যেন গুলোতে থাকে,
ফতেপুর সিক্রিতে এসে, থমকে যায়। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে, আগে তো কখনও আসিনি , আবার যেন কে ছুটে চলে গেল, আবার সেই ডাক,অমরদা আআআ...
ওকে যেন খুব চেনা লাগে।
দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে,
তারপর কিছু মনে নেই !

যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখি বাড়িতে শুয়ে আছি, ঠাকুমা মাথার কাছে বসে আছে, ডাক্তার বললেন,হ্যালুসিনেসন 
আসতে আসতে পরিবর্তন হয়ে যাবে।
বিদেশে ভালো চাকরি করে, একটা বিয়ে দিয়ে দিন, ঠিক হয়ে যাবে।
বড়োলোকের একমাত্র মেয়ে,ডানা কাটা পরির মত সুন্দরি মেয়ে মিলির সঙ্গে বিয়ের ঠিক হয়ে যায়, তারপর
ঘোরাঘুরি সপিং মলে কেনাকাটা,আইনক্সে সিনেমা দেখা ,সি সি টুতে খাওয়া, জমিয়ে আড্ডা,মিলির মধ্যে ডুবে যায় নিলয়, তারপর ধূমধাম করে বিয়ে করে নাইজেরিয়া পৌঁছে যায়।

এখানের মনোরম পরিবেশে 
ছিমছাম বাংলো বাড়িতে মিলির সাজানো সংসার। উইকেন্ডে দুজনে ল্ং- ড্রাইভিংএ যায়, বেড়াতে যায়,
পার্টিতেও যায়।কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু মাঝে করোনার দাপট খুব বেড়ে গেলো, 
আক্রান্ত হয়ে মিলি মারা গেল।

সমস্যা আবার শুরু...
সারা বাংলোময় কে ঘুরে বেড়ায়, গান গায়, সকল হলেই জল পড়ার শব্দ হয়,
ছুটে ছুটে দেখতে গিয়ে কোথায় যেনো হারিয়ে যায়।
গা ছমছম করে,
অফিসে ছুটি নিয়ে নিলয় বাড়ি ফিরে আসে। ঠাকুমাকে 
সমস্যার কথা বলে।
ঠাকুমা নিলয়ের বাবা মা কে জানায়।
নিলয়ের বাবা মা আবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে,
এবারেও ডাক্তার আবার বিয়ে দিয়ে দিতে বলেন, আরও বলেন, আপনারা ওকে কখনও সময় দেননি, নিজেদের কাজে ব্যস্ত জীবন কাটিয়েছেন, ফলে ওর এটা দেখা দিয়েছে,
বাবা মা দুঃখী মনে গরীবের একটা মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলেন।কোনো ঘটা করলেন না।
সোমা গরীবের মেয়ে হলেও সুন্দরী,শিক্ষিতা।
তাই খুব সহজেই নিলয়ের সঙ্গে সিস্টার সুলভ আচরণে,
নিলয়কে বস করে ফেলে।
কিন্তু ওখানে পৌঁছে সোমারও
কেমন যেন গা ছমছম করছিল, পরদিন সকালে সেই জল পড়ার আওয়াজ, কাছে
যেতে যেতে,সব চুপচাপ।
সোমা এখানে একটা হাসপাতালে সিস্টারের কাজে যোগ দেয়।
সন্ধের সময় চা খেতে খেতে দুজনেই শুনতে পায় কে যেন
গান গাইছে
নিলয় বলে ওঠে মিলি, মিলি এসেছে,
তারপর সব চুপচাপ।
সোমা চিন্তায় পড়ে, সারারাত ঘুমোতে পারেনা,
ওদিকে নিলয় সোমাকে মিলি ভেবে,সোমার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে নিলয় সোমাকে প্রচন্ড বকাবকি শুরু করে, সোমা খাবার গুছিয়ে হাতের কাছে রেখে, নিজের কাজে চলে যায়।
সামনে থেকে সরে গিয়েও সোমা বেশ চিন্তিত থাকে।
ডাক্তারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে, জানতে পারে ওগুলো মনের ভুল।তাই শক্ত হয়ে সংসার করতে হবে।

নিলয়ের সঙ্গে সোমা মুখোমুখি হতে চায়না,তাই পেছনের দরজা দিয়ে চুপিচুপি ঢুকে, লুকিয়ে থাকে। 

দেখে নিলয় টেনসন করছে,
 বলছে আমাকে কেউ বোঝে না, সবাই নিজের কাজে ব্যাস্ত।
বাবা মা একবারও ভাবে না আমার ওপর দিয়ে কিরকম ঝড় গেল,
আবার কতো বছর পর দেশে ফিরতে পারবো, 
আদৌ কারো সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবো কিনা,

এ সোমা  আবার কোথায় চলে গেল, আমাকে না বলে।
আর ওকে কিছু বলবো না।
শেষে
ও আবার আমাকে ছেড়ে...
নাঃ, একটা ফোন করে দেখি।
সোমা ঠিক তখনই বলল, খেতে দিয়েছি।
নিলয় একটু অবাক হলো,
খেতে বসে আবার সেই গান শোনা যায়।
দুজনে দুজনকে চেপে ধরে,

তারপর আবার চুপচাপ!


***দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়
৬, হরিচরণ চ্যাটার্জী স্ট্রিট আড়িয়াদহ কোলকাতা--- ৭০০০৫৭
৭০০৩২৪০৯৫৭


No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...