Friday, 3 June 2022

ছিনিয়ে নেওয়া--অমিত দত্ত


ছিনিয়ে নেওয়া
অমিত দত্ত


পরেশ অধিকারী স্বপ্নেও ভাবেননি আবার কোনদিন তাকে কালিম্পঙে আসতে হবে। আসলেও উঠতে হবে এই স্টার্লিং পার্ক হোটেলে। যে অপরাধের চিহ্ন তিনি মুছে ফেলতে চেয়েছেন চিরদিনের জন্য এবং যে কাজে তিনি সফলও, সেটাই যে আবার জীবন্ত হয়ে উঠবে তা তিনি কল্পনাও করেননি। কিন্তু নিতান্ত নিরুপায় হয়েই তিনি কালিম্পঙে এসে এই হোটেলে উঠেছেন। 
     ডিনারের পরে নিজের রুমে বসে বসে এই কথাই তিনি ভাবছিলেন। কাল হোটেলের কনফারেন্স রুমে ভবিষ্যতের বিজনেস পার্টনার মি. ব্রিজেস পটেলের সাথে মিটিং আছে। এই ডিলটা হওয়া খুবই জরুরী। যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তাহলে পূর্বভারতের অন্যতম বৃহৎ জুয়েলারী চেইনের সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে। ব্রিজেস পটেল আগামীকাল কালিম্পং আসছেন। 
      দশটা বছর কীভাবে যে কেটে গেল! দশ বছর আগে এই হোটেলেই তিনি আর অরুন্ধতী উঠেছিলেন। তার প্রাক্তন স্ত্রী। পরেশবাবু সবকিছু পরিকল্পনা মাফিকই করেছিলেন। দার্জিলিং থেকেই কালিম্পং এসেছিলেন। এখানকার নার্সারিগুলো, বিখ্যাত বৌদ্ধমঠ জ্যাং ঢোক পালরি ফোডাং ইত্যাদি দেখার পর ঠিক হয়েছিল পরদিন ভোরে ডেলো পাহাড়ে যাওয়া হবে। সেইমতো পরদিন ভোরে যখন অরুন্ধতী ডেলো পাহাড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে মুগ্ধ ছিল, পেছন থেকে একটা ছোট্ট ধাক্কা এলো। পরেশবাবুর সাথে অঙ্কিতার সম্পর্কের প্রধান বাধা ছিল অরুন্ধতী। বড্ড বেশি ঝামেলা করত। সরিয়ে দেওয়া ছাড়া কী ই বা উপায় ছিল? আর পাহাড়ে কি দুর্ঘটনা ঘটে না?
      পরেশবাবু ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত দশটা। শুয়ে পড়তে হবে। উনি আলো নিভিয়ে দিলেন।
     টপটপ। টপটপ। নাঃ আওয়াজটা তো বন্ধ হচ্ছে না। বাঁ হাতে বাঁধা হাতঘড়িটা চোখের সামনে তুললেন পরেশবাবু। রেডিয়ামের আলোয় দেখলেন বারোটা বাজে। কীসের আওয়াজ হচ্ছে? জলের নয়তো? বাথরুমের কল খোলা না কি? 

      পরেশবাবু উঠে বাথরুমে গেলেন। আলো জ্বাললেন। নাঃ কল তো বন্ধ। তাহলে? ভুল শুনেছেন বোধহয়। লাইট নিভিয়ে পরেশবাবু বিছানায় এসে বসলেন। টিকটক। টিকটক। এত জোরে ঘড়ির আওয়াজ! আবার লাইট জ্বালালেন পরেশবাবু। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। নাঃ স্বাভাবিকভাবেই সব চলছে। আলো জ্বালার সাথে সাথেই অবশ্য আওয়াজটা থেমে যায়। 
      নাঃ বড্ড বেশি ভাবনা চিন্তা করছেন। তাই এসব উল্টোপাল্টা চিন্তা আসছে। আজকে আলো জ্বেলেই শোবেন। ঘুমটা হওয়াটা খুবই দরকার। কিন্তু কীসের একটা গন্ধ আসছে? একটা মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ। আর এই গন্ধটা পরেশবাবুর চেনা চেনা লাগছে। অরুন্ধতী এই পারফিউমটা মাখত না? কিন্তু সে তো…তাছাড়া এই গন্ধ আজ এই রুমে কোথা থেকে আসবে? কোথায় যেন চূড়ির ঝমঝম আওয়াজ হলো? কেউ কি স্লিপার পরে ঘরে হাঁটছে? এসব কী হচ্ছে? সবই কি ওনার মনের ভুল? সময় বয়ে চলল। পরেশবাবু স্থির হয়ে বিছানার উপর বসে আছেন। ওনার নড়াচড়ার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। মাথার মধ্যে গত দশ বছরের ঘটনা সিনেমার রিলের মতন পরপর চলে যেতে লাগল। ভোরের দিকে উনি বিছানা থেকে নামলেন। টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। একটা লেখার প্যাড টেনে নিয়ে খসখস্ ক’রে কিছু লিখলেন। তারপর ঘরের দরজাটা খুলে করিডোরে বেরোলেন। 

       “ পরেশ অধিকারী তাহলে এই ঘরটাই বুক করেছিলেন?” ইনভেস্টিগেটিং ইন্সপেক্টর স্টার্লিং পার্ক হোটেলের ম্যানেজারকে প্রশ্নটা করলেন।
       “ হ্যাঁ স্যার। এই ঘরটাই।” ম্যানেজার উত্তর দিলেন।
       “ হুঁ, ডেলো পাহাড়ের নীচে ওনার বডি পড়েছিল। পাজামার পকেটে এই হোটেলের একটা বিল পেয়েছিলাম আমরা। সেই সূত্রেই আসা।” 
       “ হ্যাঁ স্যার, আমরাও গতকাল থানায় ইনফর্ম করেছিলাম যে ওনাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্ত বিলংগিঙ্কস উনি ঘরেই ছেড়ে গিয়েছিলেন।”
        “ ঠিক আছে চলুন, ঘরে ঢোকা যাক।” ইন্সপেক্টর ঘরের ভিতর ম্যানেজারকে নিয়ে ঢুকলেন। টেবিলের উপর একটা লেখার প্যাড খোলা অবস্থায় আছে। তাতে মেয়েলী হাতে লেখা ‘ তুমি আমার ছিলে। আমারই রইলে।’ দেওয়াল ঘড়িটা তখনও বলে চলেছে টিকটক। টিকটক।

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...