Saturday, 4 June 2022

ভূত যদি ভুলো হয়--বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী


ভূত যদি ভুলো হয়
বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

প্রীতিশবাবু সদ্য রিটায়ার করেছেন । বাড়িতে বসে আছেন । মন মেজাজ খারাপ । কতগুলো কাঁচা পয়সা মাসে মাসে আসছিল । সে পথ বন্ধ হয়ে গেল । এখন আর কি ঠুঁটো জগন্নাথ । দিনকতক পরে শুরু হবে বৃদ্ধা স্ত্রীর গঞ্জনা । থোক টাকার মায়া ত্যাগ করতে সময় লাগবে । পেনশন বেরতে সময় লাগবে । ততদিনে ব্যাঙ্কের জমা টাকা আত্মসাৎ করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই । মেয়ে দুটোর বিয়ে হয়ে গেছে । বাপ মায়ের গলগ্রহ হয়ে পড়ে নেই , এটাই রক্ষে । ওরা আসা যাওয়া করে কম । সংসার ভারী হয়েছে , সুতরাং অবকাশ কমে গেছে । রিটায়ার করা বাবার আর সামর্থ্য নেই বসিয়ে বসিয়ে চর্ব্য - চষ্য - লেহ্য - পেয় খাওয়াবে হোল ফ্যামিলিকে । এবেলা এসে ওবেলা ফেরত যাওয়াই দস্তুর ।

জীবন এরকমই । মেয়েদের অন্য পরিবারে বিয়ে হয়ে যায় । সেই পরিবারের বংশ রক্ষা করতে হবে আপন পরিবার গঠনের স্বার্থে ।

কিছুদিন মন খারাপ করে বসে থাকার পর প্রীতিশবাবু গৃহিণী সুচরিতাকে বললেন , গ্র্যাচুইটি , প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাগুলো আর বীমার টাকা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে রাখতে চান । সুদসহ বেশি আয় তো চাই ।
সুচরিতা স্বামীর দিকে তাকিয়ে জানতে চান , তা কি করবে বলে ঠিক করেছ ?
প্রীতিশবাবু বললেন , আমার এক জ্ঞাতিভাই আছেন চাকদায় । অনেকদিন তিনি এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন । ভাবছি ওনার কাছে অ্যাডভাইস নিয়ে টাকাগুলোর গচ্ছিত করার সঠিক পথ পাবো । তাই আগামীকাল বিকেলের মধ্যে চাকদা রওনা হয়ে যাব ।
শুভস্য শীঘ্রম্ । চাকদার বাড়ি প্রীতিশবাবু বহুকাল আগে দু'একবার এসেছেন ।  জ্ঞাতিভাইয়ের নাম দীপ্তেন্দু । সে তখন বাড়িতে ছিল না । কিন্তু প্রীতিশবাবুকে দেখে কোথা থেকে উদয় হয়ে হাসতে হাসতে বলল , কেমন আছিস প্রীতিশ ? 
প্রীতিশবাবুর মনের মধ্যে তখন অনেক দোলাচল । টাকাগুলো সঙ্গেই এনেছেন । কাজ মিটিয়ে  রাত হলেও বাড়ি ফিরে যাবেন । ওদিকে স্ত্রী বাড়িতে একলা রয়েছেন । 

দীপ্তেন্দু চা সিঙাড়া খাওয়ালো । টাকা জমা রাখার লাভজনক উপায় সব বলল । তারপর ফর্ম বের করে লিখেজুখে নিয়ে বলল , এক সপ্তাহের মধ্যেই খবর জানাবে । আর বলল সে একাই বাড়িতে থাকে । মা মারা গেছেন । বিয়ে থাওয়াও করে উঠতে পারেনি । 
অন্ধকার হতে না হতেই প্রীতিশবাবু সে জায়গা ছেড়ে বাড়ির পথে রওনা হলেন । একটা দুশ্চিন্তা রয়ে গেল , অতগুলো থোক টাকা । কি জানি কি হয় না হয় । যতক্ষন না সার্টিফিকেটগুলো হাতে না আসছে , শান্তি নেই ।
দীপ্তেন্দু আবার পরের সোমবার ঠিক এরকম সময়ে আসতে বলেছে । কারন প্রীতিশবাবুর বাড়ি গিয়ে কাগজগুলো পৌঁছে দেওয়ার ফুরসত নেই । অনেক কাজ থাকে । মরার সময় পর্যন্ত নেই ।
যাইহোক পরের সোমবার আবার এলেন প্রীতিশবাবু । আজ কাগজপত্র বুঝে নিয়ে তবে যাবেন । কিন্তু গাড়িঘোড়ার পথে দেরী হয়ে অন্ধকার হয়ে গেল দীপ্তেন্দুর বাড়ি পৌঁছতে । দীপ্তেন্দুর বাড়িতে মনে হল কেউ নেই । একতলা দু'কামরার বাড়ি । একেবারে ফাঁকা । অন্ধকার গম গম করছে ।

একটু বাদেই হাসতে হাসতে দীপ্তেন্দু প্রীতিশবাবুর একেবারে পাশটিতে এসে দাঁড়ালো । কিন্তু এ কোন দীপ্তেন্দু ! কঙ্কালসার করোটি সর্বস্ব চেহারা কি করে হল ! 
দীপ্তেন্দু প্রীতিশবাবুকে অবাক করে দিয়ে বলল , কাগজপত্র আমার কাছেই রেখেছি । বলে সে প্রীতিশবাবুর হাতে যা দিল তাহল এক বান্ডিল সাদা হাড়ের টুকরো । 
ছ্যাত করে উঠলো প্রীতিশবাবুর শরীরটা । দীপ্তেন্দুর হাত বরফের মত ঠান্ডা । শরীর থেকে হিমশীতল ঠান্ডা আভাস বেরচ্ছে । 
কিছু জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে দেখেন সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই । মানেটা , প্রীতিশবাবুর বুঝতে দেরি হল না। এখন নিজের প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলে আত্মরক্ষা হয় । অন্ধকার পথে প্রীতিশবাবু পড়িমড়ি করে হনহনিয়ে চললেন । পিছন ফিরে মোটেও তাকালেন না ।

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...