Saturday, 4 June 2022

অলৌকিক উপস্থিতি--দীপঙ্কর চৌধুরী


অলৌকিক উপস্থিতি--
                                                                   দীপঙ্কর চৌধুরী

রথীন বিশ্বাস কর্মযোগের কারণে কলকাতার একটি শ্মশানের নিকট এক পুরনো তিনতলা পাকা বাড়িতে একাই বসবাস করত। সেখান থেকে তার অফিস কয়েক মাইল দূরে। প্রতিদিনই রথীন বাবু বাড়ি থেকে অফিস যাতায়াত করতেন। তবে রথীন বাবু যে বাড়িতে থাকতেন সেখানে একজন বৃদ্ধ চাকর রবীন খুড়ো তাঁর দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ওই রবীন খুড়োকে দেখতে একটু অদ্ভূত রকম ছিল। যেমন তাহার চোখ দুটো ছিল টকটকে লাল, চুলগুলো ধপধপে সাদা, দাড়িগুলো প্রচন্ড বড়ো দাবড়া দাবড়া ও হাত এবং পায়ের নখগুলো হিংস্র পশুর মতন। অফিসের কাজের চাপে রথীন বাবুকে প্রায়ই  মধ্যরাত্রিতে বাড়ি আসতে হতো। তবে যে পথ দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরতেন সেই পথটি ছিল ঘন অরণ্যে বেষ্টিত। বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে রথীনবাবু বৃদ্ধ চাকরের সঙ্গে গল্প গুজবে বসতেন। বৃদ্ধ চাকর রবীন খুড়ো রথীন বাবুকে বলতেন সেই বাড়ির নিকট যে শ্মশানটি রয়েছে, সেই শ্মশানটি তে একটি আত্মার উদ্ভব ঘটে ঠিক মধ্যরাত্রিতে। আর ঠিক ঐ দিনই যখন রাত্রি একটা বেজে তিরিশ মিনিট তৎক্ষণাৎ ওই সময় শ্মশানটি থেকে এক উচ্চ আর্তনাদ ভেসে আসছে। এবং তার কাছাকাছি তে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। হঠাৎ করে রথীন বাবুর নিদ্রা ভাঙ্গে। তিনি তার কক্ষের দক্ষিণ জানালা দিয়ে লক্ষ করেন এক অদ্ভূত আকারে একজন বৃদ্ধ ঘন সাদা পাঞ্জাবী পোশাকে ওই নির্জন স্থানে থেকে হাঁক দিচ্ছেন “রথীন তুমি কোথায়?" রথীনবাবু একেবারেই হতভম্ব। মুখশ্রীতে চিন্তিত ভাব ক্ষণিকে তার মাথা থেকে ঘাম ঝরে চলেছে অবিরত। হাত-পা কেঁপে চলেছে। কিন্তু রথীনবাবু অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। তাই তৎক্ষণাৎ তিনি দ্রুত বেগে গমন করেন ওই অদ্ভুত আকৃতির বৃদ্ধর নিকট। যখন তিনি সেই শ্মশানে পৌঁছালেন তখন দেখতে পেলেন ক্ষণিক পূর্বে যে লোকটি “রথীন তুমি কোথায়?" বলে আর্তনাদ করছিল সে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। যেনো, সে ছিল কোন এক আত্মা। আর তার উপস্থিতি ছিল আলৌকিক। পরদিন সকালে রথীনবাবুর যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন সেই চাকরটি তাকে বলল- গতকাল রাত্রে মনে হয় ওই শ্মশান থেকে কেউ আপনার নাম ধরে ডাকছিল যে- “রথীন তুমি কোথায়?" মনে হয় যেন ওই বৃদ্ধ চাকর তিনি উপস্থিত ছিলেন ঘটনা সময়ে। রথীনবাবু উত্তরে জবাব দিলেন- হ্যাঁ ছিল। তবে আমি যখন তার নিকট যাই তখন উনি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। কথাটি বলেই তিনি অফিসের পথে অগ্রসর হলেন। এবং অফিস যাওয়ার পথে তিনি পাশের বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারেন যে বাড়িতে রথীনবাবু বসবাস করেন সেই বাড়িতে নাকি কেউ থাকেনা। তবে গত চোদ্দ দিন পূর্বে একজন বৃদ্ধ মারা যান। তিনি অবশ্য সেই বাড়িতে চাকরের কর্মে কর্মরত ছিলেন। কথাটি শোনার পর রথীন বাবু আরও একবার হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তিনি একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়লেন। এবং সেদিন অফিস না গিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়ি এসে দেখলেন যে, এই বৃদ্ধ আর বাড়িতে নেই। রথীনবাবু বৃদ্ধকে চারিদিকে খুঁজলেন কিন্তু কোথাও তার দর্শন পেলেন না। তিনি ভাবলেন বৃদ্ধ হয়তো সত্যিই আর নেই। হয়তো বৃদ্ধ রবীন খুড়ো তার আত্মার শান্তির জন্য ওই বাড়ির প্রতি নিজের মায়া দূরীভূত করার জন্য ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন গত চোদ্দ দিন ধরে। এরপর রথীনবাবু মানসিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। এবং তিনি ভাবতে থাকেন ওই বুড়ো এতদিন তার নিকট ছিল কিন্তু কদাপি তার কোনোরূপ ক্ষতি পর্যন্তও করেনি। আবার তার নিকট সে সত্যিই একজন চাকরের মতন ছিল। বরং তার সর্বদা ভালোই চেয়েছিল। তাই রথীনবাবু বৃদ্ধ চাকর রবীন খুড়োর আত্মার শান্তির জন্য তাঁর শ্রাদ্ধ করলেন। এবং পরিশেষে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করলেন।

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...