Saturday, 4 June 2022

সিগারেট--তাপসকিরণ রায়


সিগারেট--

                                                                  তাপসকিরণ রায় 

আমি তখন সবে মাত্র মান্ডলার না গ্রাম না শহর ধরণের একটা জাগায় সরকারি স্তরের চাকরিতে জয়েন করেছি। মান্ডলা মধ্যপ্রদেশের এক অরণ্য প্রধান জেলা। এখানে দিনে চহল-পহল লাগা থাকলেও সামান্য রাতেই নির্জনতায় ঘিরে যায়। একটু দূরে হলেও এখানকার চারপাশ জঙ্গলাকীর্ণ। এতটা ইন্টেরিয়রে যাবার ইচ্ছে না থাকলেও আর্থিক দিক বিবেচনা করে আমায় এখানে আসতেই হয়েছিল। ছোট একটা তৌশীল অফিসের চাকরি করি--আমার বাসস্থান থেকে আধ কিলোমিটার দূরে হবে। জাগাটা অনেকটা খাপছাড়া ধরনের। কোন রকম প্ল্যান ছাড়াই এখানের ঘর বাড়ি রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছে।

মোটামুটি পছন্দ মত ভাড়ায় একটা বাড়ি পেয়ে গিয়ে ছিলাম। ঘর থেকে প্রায় দু শ মিটার দূরত্বে হালকা বনের সীমানা শুরু হয়ে গেছে। পাশেই ছিল একটা ছোট নদী। গ্রীষ্মে হাঁটুজল, কোথাও কোথাও পায়ের পাতা ডোবা জল থেকে যায়। তবে বর্ষায় তার রূপ একেবারে পাল্টে যায়--ফুলে ফেঁপে কলকল ছলছল শব্দ করতে করতে সে সশব্দে বয়ে যায়। ঘর থেকে সামান্য কিছুটা এগোলেই নদীর পুল। স্থানীয় লোকেরা এ পুল একেবারেই ব্যবহার করে না। এই পুল নিয়েই স্থানীয়দের ভয় ভীতি জড়িয়ে আছে। কিসের ভয় বা ভয়ের কোন ঘটনার কথা কেউ বলতে পারে না।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,  আপনারা এ পুল দিয়ে যাতায়াত করেন না     কেন ?

তাদের উত্তর ছিল--আমরা বলতে পারবো না, তবে শুনেছি, এ পুলের বড় বদনাম আছে। অনেকে ভয় পেয়েছে--রাতে পুলের ওপর পা রাখলেই নাকি গা ভারী ভারী হয়ে যায়। শরীর ছমছম করে ওঠে। ব্যাস, স্থানীয় লোকের কাছ থেকে এই পর্যন্ত ভয়ের ইতিহাস শুনে ছিলাম। আমি আমার নিজের মন থেকে, ফুঁ, বলে অবিশ্বাসে  ভয় ভাবনা দূরে সরিয়ে দিয়ে ছিলাম।    

ঘর থেকে অফিসের দূরত্ব আধ কিলো মিটার থেকে একটু বেশী হবে। আমি কিন্তু নির্ভয় ছিলাম, দিব্বি পুল পার করে শর্টকাট পথ ধরে প্রতিদিন পৌঁছে যেতাম আমার অফিসে। পুলের বদনামের কথা বেমালুম ভুলেও গিয়ে ছিলাম । দিনের বেলায় রোজ যাই আসি—মনে মনে ভাবি--এতে ভয়ের আছেটা কি ? শুরুতে দু একজন আমায় সতর্ক বার্তা দিয়েছিল বটে, কিন্তু আমি ছিলাম ডোন্ট কেয়ার--

একদিন হঠাৎই অফিসে ইমার্জেন্সী কাজ এসে পড়ল। বস আমাকে নাইটেও কাজে আসতে হবে বললেন। এই প্রথম বার রাতে আমায় অফিস করতে যেতে হবে। ঘর থেকে বেরিয়ে অভ্যাস মত নদীর ধারে পুল পার করবো বলে এসে দাঁড়ালাম। না, মনে ভয় ছিল না। রোজই তো পারাপার করছি পুল, তবে আর ভয় কিসের ? রাত বলে ? মনে মনে ধুস, বলে পুলে পা রাখলাম। অন্য দিনের মত আমি রাতেও স্বাভাবিক পা ফেলে ফেলে পুল পার হচ্ছিলাম। আর কয়েক স্টেপ দিলেই পুল পার হয়ে যাব, ঠিক এমনি সময় আমি পেছন থেকে স্পষ্ট একটা ডাক শুনতে পেলাম, কেউ যেন বেশ গভীর আওয়াজ নিয়ে আমায় ডাক দিয়ে উঠলো, কি আশ্চর্য আমার নাম ধরেই কেউ যেন আমায় ডাক দিলো,  এই প্রদীপ, শোন--

আমি চকিত হলাম, মনে মনে ভেবে নিলাম, না, আমার নাম জানার মত এখানে কেউ আছে বলে ত আমার মনে পড়ছে না !

পেছন ফিরলাম, দেখলাম একটা মাঝ বয়সী লোকের চেহারা--এই আমার থেকে হাত আট দশ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার চেহারা তত স্পষ্ট নয়, বাইরের আলো আঁধার মাখানো, সাধারণ সাদামাটা পোশাক পরা। ওর হাত দুটির ওপর আমার নজর এলো, দেখলাম গাঢ় ছায়ার মত তার দুটি হাত। ঈষৎ হাত বাড়িয়ে সে আমায় বলল, এই, একটা সিগারেট দাও তো--

গলার আওয়াজ বেশ ভারী। তার হাত দুটি তার শরীরের তুলনায় বেশ লম্বা বলে মনে হচ্ছিল। আমি স্মোক করি না, তখনও কিছু ভাবতে পারছিলাম না, খানিক চুপ থেকে বললাম, আমার কাছে ত সিগারেট নেই--

লোকটা যেন হতাশ হয়ে পড়ল। অফিসে যাবার তাড়নায় হবে বোধহয় আমি  আবার অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। আর দু পা বাড়িয়ে পুল পার করতে যাচ্ছি, ঠিক সেই মুহূর্তে বেশ জোর গলায় পেছন থেকে লোকটা বলে উঠলো, প্রদীপ, কালকে মনে করে আমার জন্যে সিগারেট আনিস কিন্তু ! এবার আমি চমকে উঠলাম, ওর গলার আওয়াজে আমার বুকের মাঝখানটা যেন একবার কেঁপে উঠলো।  

--মনে করে অনবি, কালকে এমনি সময় পুলের ওপরে এসে আমায় দিয়ে যাস, কঠোর ও গম্ভীর সুরে লোকটা আবার বলে উঠল।

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম, এবার ভয়ে আমার মুখ থেকে কথা সরছিল না। দ্রুত পায়ে অফিসে গিয়ে পৌঁছলাম। অফিসে আমনের সঙ্গে ইতিমধ্যে আমার বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। তাকে সব কথা খুলে বললাম। সে বলল, ওই পুলের বদনামের কথা অনেকবার শুনেছি, তুই আর ওই পথে আসিস না।

পরদিন আমনকে আমার ঘরে ডাকলাম। ওকে জানিয়ে ছিলাম যে আজ রাতে আমি ওই লোকটার হাতে সিগারেট তুলে দেব। ও ভয়ে ভয়ে বলে ছিল, কি পাগলামি করছিস ? তবু আমার ইচ্ছা বেশ দৃঢ় ছিল। রাতে আমনকে পুল থেকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে আমি ধীরে ধীরে এসে পুলের ওপর চড়লাম। তখন মাঝ পুলে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে এপাশ ওপাশ মুখ ফিরিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি তবু মুখ তুলে বলে উঠলাম, আপনার সিগারেট এনেছি--আমি হাত বাড়িয়ে একটা নয়, গোটা এক প্যাকেট সিগারেট শূন্যে তুলে ধরলাম--

যেন দূর থেকে মহাকালের গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো, হ্যাঁ, প্রদীপ, এই যে আমি--কেউ আমার হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিলো বুঝতে পারলাম। পরক্ষণেই প্রকাণ্ড একটা কালো অবয়ব আমার সামনে ভেসে উঠলো, ছায়াটা আমার মাথার ওপর ঝুঁকে ছিল। আমি চমকে উঠলাম। হঠাৎ তার পায়ের দিকে আমার চোখ পড়ল। একি দেখছি আমি, লোকটার পায়ের পাতা পেছন দিকে কেন ? তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ে গেলো ভুতের পায়ের পাতা নাকি সামনের দিকে না থেকে পেছন দিকে হয়। তবে কি—ঠিক তক্ষণই আমার ভাবনাকে ছেদ করে লোকটার মুখ থেকে উচ্চারিত হল, থ্যাংকস--

তারপর আর কিছুই নেই। 

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...