সান্ত্বনা চ্যাটার্জী
সকাল থেকে নাগাড়ে বৃস্টি পড়ছে, আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, মাঝে মাঝ, বিদ্যুৎ চমকে যাচ্ছে, কিছু পরেই সাকরেদ মেঘ ডাকা ডাকি করছে। আমরা রবিদার বাড়িতে আড্ডা মারছি। মাসীমা মুড়ি আর গরম গরম তেলে ভাজা, চা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আমি বললাম রবিদা, তুমি তো ভূপর্যটক, কত জায়গার গল্প করো, তুমি কখোনো মিশরে গেছ?, পিরামিড আর মমি দেখেছ!
অবশ্যই, ওখানে না গেলে কি চলে ! মিশর বা ইজিপ্ট তো পর্যটকদের স্বর্গ।এত প্রাচীন শহর, পিরামিড,মমি, না দেখলে কিসের পর্যটক।জানিস তো পৃথিবীর সাত টি বিস্ময় এর মধ্যে পিরামিড একটি । কায়রোর প্রান্তে গিজাতে (Giza) সব থেকে বড় পিরামিড এখোনো আছে। আমি একাই গেছিলাম ইজিপ্ট,
তখন সেপ্টেম্বর ।আমি কায়রো তে একটি হোটেলে উঠেছিলাম।ছোটো ঘরোয়া পরিবেশ। আমার পাশের ঘরে একটি ফ্রেঞ্চ মেয়ে ছিল ,আইলিন।
চুমকি বলে উঠল, কেমন দেখতে ছিল! মেয়েলি প্রশ্ন ।
ভীষন সুন্দর আর মিষ্টি স্বভাব, অনেক গল্প করতাম, আমার কাছে ভারতের কথা শুনতে চাইত, আমিও
ফ্রান্সের অনেক কথা জানতে চাইতাম।
কি ভাষায় কথা বলতে তোমরা !
আইলিন ভাঙা ভাঙা ইংরাজী বলতো। আমিও তাই।বলেছিল, আহরন বা আরন নামে একটি ইজিপ্সিয়ান এর সংগে আলাপ হয়েছিল বছর দুই আগে, তখন ই তাদের মধ্যে একটা আকর্ষণ তৈরী হয়।ওদের ব্যাপারটা অনেকটা হিন্দি সিনেমার মতন।
মানে দুজনের দুজনকে ভালো লাগে, মেলামেশা করে ক্রমশ বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিনত হয় ।দুজনেই বলে যে যদি দূরে গিয়েও ওদের ভালোবাসব বজায় থাকে তবেই বিয়ে করার কথা ভাববে।আইলিন তখন আর্ট কলেজে , দু বছর লাগবে আরো শেষ হতে।
খোকন বলে, তার মানে দূরে গিয়েও.....
হ্যাঁ তাই দুজনে ঠিক করেছিল তার পরেই দুজনে বিয়ে পাকা করবে। জানিস বোধ হয় ইজিপ্টের প্রধান ধর্ম ইসলাম। আইলিন খৃস্টান ছিল। মিশরের লোকেরা নাকি ভীষণ গোঁড়া। আহরন খুব কট্টর মুসলিম পরিবারের ছেলে, তাই সে জানত তার পরিবার হয়ত এ বিয়েতে মত দেবে না। আহরনের বিয়ে আগে থেকেই ঠিক করেছিল তার বাবা মা এক সুন্দরী স্বজাতীয় মেয়ের সংগে। সে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভেঙে নিজের মর্জি মতন বিয়ে করতে গেলে নিজের রোজগার বাজাতে হবে ।সে তখন ইজিপ্টের এক নাম করা সংস্থার হয়ে প্রাচীন স্থাপত্য খনন এবং গবেষনা কাজে লিপ্ত ছিল! তার কাজে কর্তৃপক্ষ খুব সন্তুষ্ট এবং দুবছরের জন্য একটি বিশেষ কাজে নিযুক্ত করে । আহরনচেয়েছিল সে কাজটি যথাযথ কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করে তবেই বিয়ে করবে।
ইজিপ্টের লোকেদের বিশ্বাস মানুষ আর পশু মরে যাবার পরে আবার জন্মায়। তাই বড় লোকেরা অনেক টাকা রেখে যেতো তার শরীর মমি করবার জন্য। যাদের পয়সা কড় কম তারা বালির নিচে রেখে দিত মৃত দেহ। যখন আবার জন্মাবে তখন যেন পুরানো শরীরটা খুঁজে পায়।
প্রথম প্রথম দুজনার নেট এ অনেক কথা হোতো। ক্রমশই যোগাযোগ কম হয়ে এল ! কারন দুজনেই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত থাকত। আহরন জানিয়েছিল সে অত্যন্ত বিশেষ কাজে ব্যস্ত , এ কাজের সময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে কথা হবে। তা প্রায় মাস ছয়েক আগে। কিন্তু এখনো কোনো খবর পাচ্ছেন, তাই নিজেই এসেছে আহরনের খোঁজে।আইলিন বলল যদি আহরন বিয়ে করতে ইচ্ছুক না হয় তাহলে ফ্রান্স ফিরে যাবে।আইলিনেরকরুন মুখ আর চোখে জল দেখে আমার মনে হল তাকে আমার আহরন কে খোঁজার ব্যাপারে আমার সাহায্য করা উচিত।
সে যাই হোক প্রথম দিন আমরা এখানকার প্রাচীন স্থাপত্য , পিরামিড, ধ্বংস স্তুপ এ সব নিয়ে অনেক ঘাঁটা ঘাঁটি করলাম।আইলিনে আর আহরন এর চ্যাট রেকর্ড সে যেই যাদের কাছে শেষে কাজ করত তাদের অফিসে গেলাম।তারা প্রথমত আমরা বিদেশী বলে কোনো কথাই বলতে চাইছিল না। শেষে অনেক অনুরোধ উপরোধ করার পর জানাল যে আহরন সেফ মুস্তাফা খুব একটা গুরুত্ব পূর্ন গবেষণায় নিয়োজিত
হয়েছিল কিন্তু গত চার মাস যাবৎ কোনো খবর নেই।তার অধীনস্থ কর্মচারীরা প্রধানত মজদুর সবাই ফিরে এসেছে । ওদের কথামত অনেক বার সেখানে লোক পাঠান হয়েছিল কিন্তু আহরনের কোনো হদিশ
মেলেনি। আমরা পথ নির্দেশিকা নিয়ে এলাম ।
পরের দিন আমরা তিন জনে হোটেলের কাছে একটা অনেক পুরানো একটা পিরামিডের ধ্বংসাবশেষ দেখতে গেছিলাম। শুনেছিলাম এটি কখনোই কোনো পিরামিড ছিল না। যা ছিল তা একটি বহু পুরানো আধ ভাঙ্গা বাড়ি । শোনা যায় এটি এক নিষ্ঠুর ফারাওয়ের বাসস্থান , যেখানে তিনি বহু দাস দাসীকে অত্যাচার করতেন। তাদের হাত পা মোটা লোহার শিকল দিয়ে ফেলে রাখা হতো মৃত্যুর জন্য। স্থানীয় মানুষ বলে রাতের বেলায় এখানে ঝন ঝন করে শিকলের আওয়াজ হয়, আর মানুষের যন্ত্রনায় গোঙানির শব্দ পাওয়া যেত।
ইদানীং তা বন্ধ হয়েছে, কারন পুলিশ এসে ভিতরে গিয়ে শিকল বাঁধা মানুষের কঙ্কাল পেয়ছে তাদের নিয়ম মাফিক সংস্কার ও করা হয়েছে। যাই হোক আমরা সূর্য অস্ত যাবার পরে সেখানে গেছিলাম। বেশ একটা গা ছমছমে পরিস্থিতি ।
আমাদের সরকারী ছাড় পত্র দেখে ভিতরে যেতে দিল ।সেখানে সেদিন কিছু পেলাম না যাতে করে
তার কোনো চিন্তা খুঁজে পাই।
মনমরা হয়ে সেদিন ফিরে এলাম।কিন্তু লক্ষ করলাম যে দুটো সন্দেহ জনক লোক আমাদের অনুসরণ করছে। ব্যাপারটা কি!
সেদিন রাতেই আমরা একটি গাড়ি ঠিক করে রেখে ছিলাম, বালির জন্য একটি ট্র্যাক্টর বা জীপ জাতীয় গাড়ি । এবার যে পিরামিড এর সন্ধানে গেলাম সেটি বেশ দূর হোটেল থেকে। এখানেও
প্রবেশ দ্বারে এক দারোয়ান গোছের লোক টুলে বসেছিল। আমাদের ভিতরে যেতে তো দিল, কিন্তু বার বার সাবধান করে দিল যেন নিচে যাবার চেষ্টা না করি। কেন জানতে চাইলে বলল তোমাদের যা বলা হয়েছে তাই করো।।
ভিতরটা আরো ভূতুড়ে আলো অন্ধকার মতন। আমরা জানতাম এখানেই কাজ করত আহরন। মাটির তলার চেম্বার এই যাব আমরা কিন্তু সে কথা জানাই নি দারোয়ান কে।ঘোরানো সিঁড়ির দিয়ে অনেকটা নীচে নামতে হল।সেখানে বেশ কিছু বেদী দেখলাম। ও গুলো যে প্রাচীন কালের কিছু মমি সেটা বোঝা যাচ্ছিল ।মোট ছটি মমি দেখলাম, শেষ বেদীর কাছা কাছি গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমাদের দুজনের ই বুক ধক ধক করা শুরু করল। শেষের মমিটা বেদির কাঁচ ভেঙে উঠে বসেছে, চড় চড় করে তার গায়ের উপরের আস্তরণ টা মট মট করে ভেঙে যাচ্ছে মৃত মমিটা পিছনে আবছা অন্ধকারে আর কেউ নয় আমাদের আহরন।
গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা এখান থেকে পালাও, না হলে তোমরা ও আমার মতন মমি হয়ে যাবে।এখানে যত জীবন্ত মানুষ নেমেছে তারা কেউ আর বেঁচে নেই। রাতের বেলা য় যেই আসবে মমির হাতে মরবে।
আমি আইলিনের হাত ধরে টেনে ছুটতে শুরু করলাম ঘোরানো সিঁড়ির কাছে এসে হেল্প হেল্প করে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে উঠবার যত চেষ্টা করি আইলিন কেবল বলছে, আহরন, আমরা ওকে কি করে ফেলে যেতে পারি।আহরন নিশ্চয় কোনো বিপদে আছে।চল রবি আমরা ফিরে যাই ওর কাছে। আমাদের চ্যাঁচামেচি তে দারোয়ান চলে এসেছে। হাতে আলো নিয়ে ভয়ানক রাগ করতে লাগল। তোমরা এতো নিচে কেন এসেছ, আর কি করে এলে, এখানে কোনো পর্যটক কে আসতে দেওয়া হয় না। তা আবার
একা একা স্থানীয় গাইড ছাড়া।
আমার তখন কোনো কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা করার মতন অবস্থা ছিল না। আইলিন পাথরের মতন হয়ে গেছে। গাড়ি হোটেলে এলে আমি আইলিনকে নিয়ে ওদের রিসেপশানে বসে জল দিতে বললাম। ওখানেই লোকেরা খুব অতিথি বৎসল। আমাদের জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছে। সব শোনার পরে বলল তোমাদের গাড়ি কোথায় আর তোমাদের বন্ধুর ছবি দেখাতে পারবে ?
আইলিন তার মোবাইলে আহরনের দুবছর আগের ছবি দেখালো। ছবি দেখে সবাই বলল তোমরা খুব ভাগ্যবান, নিচের ঘরে আজ পর্যন্ত যে গেছে আর ফেরেনি।যার ছবি দেখালে ওর নাম আহরন শেফ মুস্তাফা।।এখানে প্রাচীন পিরামিড নিয়ে গবেষনা করত।মাস ছয়েক আগে নিচে যায় গবেষনার কাজে, কিন্তু বেঁচে ফেরেনি।পরের দিন সকালে মৃতদেহ পাওয়া যায় ছ নম্বর বেদীর উপর।
আমরা দুজনেই বলে উঠলাম তা কি করে, আহরনের কাজের যায়গায় তো সেকথা জানায় নি।
আল্লার দিব্বি বলছি সে মারা গেছে । অফিস থেকে কেন জানায় নি বলতে পারব না, হয়তো আপনাদের বিশ্বাস করে নি।।
আহরন আইলিন কে খুব ভালোবাসত নিশ্চয় তাই আপনাদের দুজনকে দেখা দিতে নিজের মৃত্যু স্থানে নিয়ে গেছিল। আপনি ছিলেন বলে আহরন দুজনকে নিয়ে গেছিল। সবাই তো বলে সত্যিকারের ভালোবাসা প্রেমিক আলবিদা না বলে যেতে দেয় না।আপনি ম্যাডামের খেয়াল রাখুন, একটু সুস্থ হলে ফিরে যাবেন।।
No comments:
Post a Comment