তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী
আজ বেশ কয়েকমাস পর ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরছে অনুপ। তবে অন্যবার ফেরার সময় মনে যে খুশির উত্তেজনাটা থাকে, এবারে সেরকমটা নেই। মাসখানেক আগে তার তিনজন বন্ধু সমর, প্রবাল আর রূপম এক বৃষ্টিবাদলার দিনে বজ্রাহত হয়ে মারা গেছে। মনটা খারাপ হয়ে আছে সেইসব ভেবে, বড়োই কাছের বন্ধু ছিল তারা। ছোটো থেকে একসাথে খেলাধুলো করতে করতে বড়ো হওয়া, গল্পগুজব, প্রত্যেকবার গ্রামে আসার পর একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া খুব করে মনে পড়ছিল ফিরতে ফিরতে। ট্রেন থেকে নেমে যেন আরো বেশি করে মনখারাপ লাগছে। বর্ষার দিনে তাস খেলে ফেরার পথেই এই বিপত্তি। অনুপকে বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাও করেছিল সে বাড়ি আসতে চায় কিনা, বন্ধুদের শেষ বিদায় জানানোর জন্য। কিন্তু ও নিজেই আসতে চায়নি, ওদের ওভাবে কিছুতেই দেখতে পারবে না সে।
হাঁটতে হাঁটতে ভাঙা বাড়িটার কাছে চলে এসেছে, রাস্তার পাশেই পড়ে। এখানেই তাস খেলতে এসেছিল ওরা, কতো ছোটবেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। আজ হঠাৎ করেই অনুপের মনে পড়ে যায় কানাইয়ের কথা। কানাই ওদের চাইতে তিন চার বছরের ছোটো ছিল, ওদের সাথেই খেলত। খুব ভালোবাসতো কুমিরডাঙা খেলতে। ছোটবেলায় ওরাও খেলত, কিন্তু বড়ো হতে হতে ক্রিকেট ফুটবলে ধীরে ধীরে ওরা হারিয়ে যেতে থাকে। কানাইয়ের কিন্তু এসবের পাশাপাশি সেই একইরকম ভালোবাসা রয়ে গিয়েছিল কুমিরডাঙার প্রতি।
একদিন অনুপের বাবা ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, "হ্যাঁরে, তোরা খেলতে গিয়ে কানাইকে নিস না কেন?"
"ধুর, ও খালি মেয়েদের মতো কুমিরডাঙা খেলবে। আমাদের ভালো লাগে না। আমার ফুটবল ক্রিকেট খেলি।" অনুপের অকপট জবাব।
"তা তোরা আগে তোদের খেলা খেলে নিয়ে ওর সাথে একটু খেলে নিবি কুমিরডাঙা।"
"না আমরা ওসব মেয়েছেলে খেলা খেলি না।"
একটা বিরাশি শিক্কার চড় এসে পড়ে অনুপের গালে।
"ছি ছি, মুখের এমন ভাষা! দূর হয়ে যা এক্ষুনি, বেরো।"
চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অনুপ। ভাঙা বাড়িটার এককোণে বসে কানাইয়ের উপর রাগে ফুঁসতে থাকে। ও-ই গিয়ে বাবাকে নালিশ করেছে। ক্লাস টেনে তারা পড়ে এখন, কুমিরডাঙা খেলবে!
বিকালে বন্ধুদের সাথে খেলার সময় যথারীতি কানাই এলো, অনুপ দেখেও দেখলো না ওকে। বেশ অনেকক্ষণ পর অনুপ এসে বললো, "কিরে কানাই, কুমিরডাঙা খেলবি?"
বাকি বন্ধুরা অবাক হয়ে যায়। যেখানে কুমিরডাঙা খেলার কথা শুনলে অনুপ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, সে-ই নিজে থেকে খেলবে বলছে!
কানাইয়ের চোখেমুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস, "তোমরা খেলবে আমার সঙ্গে? তোমরা তো আমাকে খেলতেই নাও না।"
"হ্যাঁ খেলবো, তবে নীচে নয়। ছাদে চল।"
বাড়িটা তিনতলা। পুরোনো দিনের বাড়ি, ছাদগুলো উঁচু উঁচু। সেই অর্থে বাড়িটার তিনতলার উচ্চতা বেশ ভালই বলা চলে। এদিক ওদিক ভাঙাচোরা, পলেস্তারা খসে পড়লেও সিঁড়িগুলো মোটামুটি অক্ষতই রয়েছে। সেইমতো ছাদে উঠে খেলতে থাকে ওরা। হঠাৎ করেই একধাক্কায় কানাইকে নীচে ফেলে দেয় অনুপ। হতভম্ব হয়ে যায় সমর, প্রবাল আর রূপম।
গভীর রাতে যখন কানাইয়ের মৃতদেহ সৎকারের জন্য গ্রামের শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো, অন্যান্যদের সঙ্গে অনুপের বাবাও কানাইয়ের শেষযাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন। অনুপ তখন নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা। কুমিরডাঙা খেলার ঝামেলা থেকে সে এখন চিরতরে মুক্ত। কানাইয়ের এহেন পরিণতির জন্য ওর বিশেষ কোনো দুঃখ হয়নি কখনও, সেই অর্থে কানাই ওর বন্ধু ছিল না। তবে এমনটা মন থেকে করতেও চায়নি ও, রাগের মাথায় করে ফেলেছে। বন্ধুদেরও বুঝিয়েছিল তেমনটা। তারাও ঘটনাটা কাউকে কোনদিনও জানায়নি।
পুরোনো অনেক কথা মনের মধ্যে ভিড় করে এসেছিল। সম্বিত ফিরতেই অবাক হয়ে যায় অনুপ। হেঁটেই চলেছে কখন থেকে, এতখানি রাস্তা পার হয়ে এলো। পাশে আবার সেই ভাঙ্গা বাড়িটাই এসে পড়েছে। গ্রামে এরকম অনেকগুলো বাড়ি ছিল বলে তো মনে পড়ছে না। রাস্তার আলোগুলো স্তিমিত হয়ে জ্বলছে। এতো অন্ধকারের রাতে সামনের বেশিদূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। রাতের শেষ ট্রেন ধরেছিল বলে লোকজনও নেই রাস্তায়।
শ্রান্ত পায়ে এগোতে থাকে অনুপ। বেশ খানিকটা যেতেই ভয় পেয়ে যায়। যাওয়ার পথে আবার সেই ভাঙ্গা বাড়িটা এসে পড়েছে যেটা একটু আগেই অতিক্রম করে এলো। এই নিয়ে মনে হয় চার পাঁচ বার বাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়া হয়ে গেলো ওর। কিন্তু আবার সেই ঘুরেফিরে আসছে, যেন এই বাড়ির চৌহদ্দি থেকে ও বেরোতে পারবে না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে দেখে জল শেষ। অসাবধানতাবশত হাত থেকে পড়ে যায় বোতলটা। অনুপ নীচু হয় সেটা কুড়োনোর জন্য।
হঠাৎই পেছন থেকে কেউ একজন এসে অনুপের গলাটা জড়িয়ে ধরে। কিশোরসুলভ স্বরে বলে ওঠে, "কতো বড়ো হয়ে গেছো অনুপদা। দেখো না, আমি সেই ছোটোটিই রয়ে গেলাম। আর বড়ো হতে পারলাম না। এসো না একটা খেলা খেলি!"
ভয়ার্ত অনুপ অনুভব করতে পারে তার গলার বাঁধন ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে। দম আটকে আসছে তার। পাশ থেকে ফিসফিস করে কানের কাছে কেউ যেন বলে ওঠে, "কুমির তোমার জলকে নেমেছি.."
(সমাপ্ত)
***লেখক পরিচিতি :
আমি তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী। ছোটো থেকে ভূতপ্রেত, রূপকথার রাজ্যে ছিল আমার অগাধ বিচরণ। বই ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। এছাড়া মজার গল্প, সামাজিক গল্প, রহস্য গল্পও বিশেষ প্রিয় ছিল। ছোটবেলাটা কেটে গেলো সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রচিত গল্পের ছায়ায় ছায়ায়। কিশোরী বেলার সঙ্গী হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবীরা। স্কুলে পড়াকালীন লেখালেখির দিকে গভীর আগ্রহের সঙ্গে ঝুঁকেছিলাম। ইচ্ছে ছিল অনেক গল্প লিখবো। তার সাথেই আবার ইচ্ছে হলো আঁকিয়ে হতে। সময়ের চাকা গড়গড়িয়ে শেষপর্যন্ত হয়ে গেলাম অঙ্কের দিদিমণি। অনেকদিন পর নতুন করে ফিরে এলাম লেখালেখির ভালোলাগার জগতে। সকলে ভালো থাকুন, এভাবেই পাশে থাকুন। শুভেচ্ছা রইলো।
খুব ভালো লাগলো...ফিরে দেখা শৈশব.
ReplyDelete