হারান চন্দ্র মিস্ত্রী
আমাদের গ্রামের অনেকেই পশ্চিম দিকের মাঠের উঁচু জায়গাটা দেখেছে। ছোটোদের সেখানে যেতে দেওয়া হত না। সেখানে গেলে ছোটোদের বাতাস লাগে। তাতে তারা ভুল বকে আর তাদের জ্বর হয়। ডাক্তার তাদের রোগ সারাতে পারেনা। গুনিন এসে ঝাড়-ফুঁক দিলে ও জলপড়া-তেলপড়া দিলে তবে ছোটোরা সুস্থ হয়।
শিশু জন্মানোর পর তার নাড়ি কেটে সরায় ভরে নিয়ে সেখানে ফেলে আসা এ গ্রামের রীতি। গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার কেটে ফেলা নাড়ি সেখানে শুকিয়ে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এই জায়গাটিকে সবাই বারবাড়ি বলে।
যতনের বউ সেবারে ঝগড়া করেছিল। স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া। বউটার বয়স কম। বার বার কাউকে না জানিয়ে বাপের বাড়ি পালিয়ে যায়। প্রথম প্রথম যতন গিয়ে বউ আনত। তার শ্বাশুড়ী অনেক অনুনয় বিনয় করে তার সঙ্গে মেয়েকে পাঠিয়ে দিত। এখন বিরক্ত হয়ে যতন শ্বশুরবাড়ি যায় না। তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ী মেয়েকে এনে রেখে যায়।
সেবার অমাবস্যা ছিল। সেদিন সকালে যতনের স্ত্রী,বামনী ও যতনের মধ্যে পান্তাভাত খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়। পান্তা খেয়ে যতন কাজে গেলে বামনী নতুন শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে। তারপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পাড়ার এক যুবক বলল,"বৌদি যখন বাপের বাড়ি যায়নি তখন বারবাড়ির ডাঙাটা চল দেখে আসি।"
একজন বলল,"ওখানে গিয়ে গলায় দড়ি দিতে পারে।"
কেঁদে ফেলল যতন। সে বলল,"তোরা আমার সঙ্গে চল। আমার একা যেতে ভয় করছে।"
তখন সবাই তার সঙ্গে বারবাড়ির উপর গেল।
বারবাড়িটা ছিল জমি থেকে এক মানুষ উঁচু।মাঝখানে পুকুর। চারদিকে বাবলা, আকন্দ, ফণিমনসা আর খিরিজ গাছে ঠাসা জঙ্গল। রাতে সেখান থেকে শিয়ালের ডাক শোনা যায়।
বারবাড়ির বনে গিয়ে তারা দেখে অবাক! বামনী বোচকা থেকে শাড়ি নিয়ে বাবলাগাছে দোলনা বেঁধে দিব্যি দোল খাচ্ছে। সে দোল খেয়ে একবার পুকুরের মাঝখানে যায় আবার ফিরে আসে ডাঙায়। যতন তার বউকে বলল,"তুই বাড়ির বউ হয়ে এই সাংঘাতিক জায়গায় সন্ধ্যে পর্যন্ত দোল খাচ্ছিস কি করে?"
বামনী আরো কষে দোল খেতে খেতে বলল,"আমি এখানে ভালো আছি। দারুন মজা পাচ্ছি, মাসি। হা-হা-হা-"
এক যুবক বলল,"সাংঘাতিক কান্ড। বৌদিকে নামিয়ে বাড়ি নিয়ে চল।"
সবাই ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে গেল। সন্ধ্যার পরে এলো ভীষণ জ্বর। ডাক্তার ওষুধ দেয়। জ্বর ছেড়ে যায়। আবার জ্বর আসে। জ্বরের কোনো কিনারা হয় না। গুনিন এলো, ঝাড়-ফুঁক করল। জ্বর ছাড়ে, আবার আসে।
এক বয়স্ক লোকের পরামর্শে যতন তিন গ্রাম দূর থেকে এক গুনিনকে ডাকল। সে খুব কাটোয়ার গুনিন। গুনিন এসে ইঁদুর মাটি যতনের ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে দিল। তারপর সে বামনীকে বলল,"তুই কে রে বেটি।"
বামনী বলল,"আমি নারাণী।"
গুনিন বলল,"তুই বামনীকে ধরলি কেন?"
বামনীর মুখে নারাণী বলল,"বামনী রং-সিঁদুর পরে সুন্দরী সেজে আমার বাড়িতে গেছে। তাই ওকে ধরেছি।"
গুনিন বলল,"তুই ওখানে এলি কোথা থেকে।"
নারাণী বলল,"আমাদের বাড়ি ছিল ওখানে। আমার স্বামী খুব সাহসী ছিল। সে ওখানে বাড়ি তৈরি করেছিল। আমরা সুখে ছিলাম। হঠাৎ অসুখ করে আমার স্বামী মরে যায়। আমি বাপের বাড়ি যাইনি। আমাদের কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। স্বামীর চিন্তায় আমিও একদিন মরে যাই।"
"তোরা এখন ওখানে আছিস কেন?" জিজ্ঞেস করল গুনিন।
-"আমাদের নামে কেউ পিণ্ডি দেয়নি। আমরা তরে যেতে পারিনি।"
-"তুই বামনীকে ধরেছিস কেন?"
-"আমাদের পুকুর আছে, বাড়িঘর আছে, গাছপালা আছে। বামনীকে আমি আমার কাছে নিয়ে যাব।"
-"কিভাবে নিয়ে যাবি?"
"যেদিন ওর স্বামী বাড়ি থাকবে না, সেদিন বারবাড়িতে নিয়ে গিয়ে ঘাড় মটকে দেব।"
যতন ভয় পেয়ে গেল। উপস্থিত মহিলারা ঘেঁসাঘেঁসি করে বসল। গুনিন জিজ্ঞেস করল,"ওকে তুই কি খেতে দিবি?"
-"আমাদের পুকুরে অনেক মাছ আছে। আমি মাছ খেতে দেব। আমি ওর খুব যত্ন করব।"
মড়ার মাথার উপর হাড়ের ঠোকা মারল গুনিন। চিৎকার করে উঠল নারাণী। সে বলল,"ওরে বাবা রে, মরে গেলুম রে। আমায় ছেড়ে দে রে।"
-"সামান্য একটা বানে কাৎরে পড়লি নারাণী। এবার আমি পঞ্চবান মারব।"
-"আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি। আমাকে ছেড়ে দে।"
-"আর কোনোদিন বামনীকে ধরবি?"
-"না। তিন সত্যি করছি।"
গুনিন বলল,"তাহলে মুখে জুতো নিয়ে ঘরের বাইরে যা।"
বামনী মুখে একটি জুতো নিয়ে উঁচু বারান্দা থেকে নিচে নামতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। উপস্থিত সবাই বলল,"ছেড়ে গেছে ছেড়ে গেছে।"
গুনিন বলল,"মাথায় জল দাও।"
যতন গুনিনকে সেদিন ছাড়ল না। ভালোমন্দ খাবার রান্না করে খাওয়াল।
সন্ধ্যাবেলা পাড়ার লোক গুনিনের কাছে গল্প শুনতে এলো। গুনিন যতন আর বামনীকে ডেকে কাছে বসাল। গুনিন জিজ্ঞেস করল বামনীকে,"তুমি কিভাবে বারবাড়িতে গেলে।"
-"সেদিন আমরা স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া করেছিলাম। ও কাজে যেতে আমি বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছিলাম। বারবাড়ির পাশ দিয়ে গেলে কেউ দেখতে পাবেনা। তাই সেখান থেকে যাচ্ছিলাম।"
-"তারপর।"
-"হঠাৎ দেখলাম একটা বউ আমাকে ডাকছে। আমি সেদিকে এগিয়ে যেতে দেখলাম একটা কি সুন্দর বাড়ি।"
বামনী বউটিকে জিজ্ঞেস করল,"তুমি কে?"
বউটি বলল,"আমি নারাণী। তোর মাসি। আয় মা। কতদিন তোকে দেখিনি।"
-"আমার খুব কষ্ট মাসি।"
-"আমি জানি। আজ থেকে আর তোর কোনো কষ্ট থাকবে না। তুই আমার কাছে থাকবি।"
-"আমি কি খাবো।?"
-"ও মা। তোর খাবার অভাব। তোর জন্য মাছভাজা করে রেখেছি। খাবি আয়।"
তারপর বামনীকে মাদুরে বসাল। সেখানে দাঁড়িয়ে হাত লম্বা করে রান্নাঘর থেকে থালায় করে মাছভাজা এনে খাওয়ালো।
-"তুমি হাতটা লম্বা করলে কিভাবে মাসি?"
-"সহজ ব্যাপার। ঘোর অমাবস্যা চলছে । আজ রাত থেকে তুইও পারবি।"
-"তারপর আমি দোলনায় বসে দোল খাচ্ছিলাম। আর কোনো কথা আমার মনে নেই।"
এই গল্প শুনে গুনিন বলল,"তোমরা ঘটনাটা শুনলে?"
বামনী বলল,"আর আমি কোনোদিন একা বাপের বাড়ি যাব না।"
যতন বলল,"তোর মনে থাকবে?"
বামনী মাথা নেড়ে বলল,"হুঁ।"
___________
#লেখক_পরিচিতি
হারান চন্দ্র মিস্ত্রী। পিতা-সহদেব মিস্ত্রী। মাতা-ছায়া মিস্ত্রী।জন্ম-17ই মার্চ 1970। জন্মস্থান ও ঠিকানা-গ্রাম-আমতলা, পো:-আমতলা, থানা-ক্যানিং, জেলা-দক্ষিণ 24 পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ । শিক্ষা-1991 সালে ট্যাংরাখালী বঙ্কিম সরদার কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন।পেশা-প্রাথমিক শিক্ষক। সাহিত্য কর্ম- 1990 সালে কলেজ পত্রিকায় প্রথম গল্প "শিকার"প্রকাশ পায়। 2002 খ্রিস্টাব্দে "এবং প্রিয়শিল্প" পত্রিকায় প্রথম কবিতা "অর্পণ" প্রকাশ পায়। প্রথম প্রকাশিত ছড়ার বই "ছড়ার আকাশ" প্রকাশ পায় 2010 খ্রিস্টাব্দে। দ্বিতীয় ছড়ার বই "ছড়ার পাতা" প্রকাশিত হয় 2011 সালে। 2012 খ্রিস্টাব্দে ইন্সটিটিউট অফ যোগা তন্ত্র অ্যাস্টোলজিক্যাল স্টাডি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার তাকে "কবিতা সুধাকর" সম্মান প্রদান করে।
No comments:
Post a Comment