গোবিন্দ মোদক
আমি ভবতোষ ভাদুড়ী, একজন শিশুতোষ-ছড়া লেখক রূপেই আমার পরিচিতি। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার প্রকৃত নাম ভূতনাথ ভাদুড়ী, কিন্তু ওই ভূতেদের পাল্লায় পড়ে আমার সেই পিতৃদত্ত নামটি 'এফিডেভিট' করে বদলে ভবতোষ করতে হয়েছে। আপনারা হাসছেন! কিন্তু সে কথা মনে পড়লে আমার খুব কান্না পায়! সাধ করে কি কেউ চায় পিতৃদত্ত নাম ত্যাগ করতে, তা সে যতই সেকেলে নাম হোক! কিন্তু আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল সেটা করতে।
তখন আমি ভূতনাথ ভাদুড়ী, স্বনামধন্য ভৌতিক গল্প লেখক এবং একইসঙ্গে ভৌতিক ছড়াকার। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার এমন কোনো পত্র-পত্রিকা ছিল না যাতে আমার ভূতের গল্প বা ভূতের ছড়া, নিদেনপক্ষে ভূত বিষয়ক প্রবন্ধ না প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই আমার নামের মাহাত্ম্য থাকুক বা নাই থাকুক আমাকে পাঠক মহল একডাকে চিনত – ভূতের গল্পের বা ভূতের ছড়ার একমেবাদ্বিতীয়ম্ লেখক হিসেবে আমাকে লেখক সমাজ মান্য করত। পত্রিকার সম্পাদকগণ মজা করে আমাকে বলতেন – "আপনি নামেও ভূতনাথ, কামেও ভূতনাথ!" সত্যি কথা বলতে কি এমন কোনও ভৌতিক বিষয় ছিল না যে বিষয়ে আমি গল্প-কবিতা লিখিনি – আর সে সব গল্প-কবিতাগুলি যে কি হারে পাঠকসমাজে জনপ্রিয় ছিল তা আর বলবার নয়! আর গল্পগুলোর মতোই বিখ্যাত ছিল আমার নাম – "ভূতনাথ ভাদুড়ী!" কিন্তু ভূতেদের তা সইল না!
* * * *
সে এক বর্ষার দিন! ভরা আষাঢ় মাস! বাংলা একাডেমির জীবনানন্দ সভাঘরে সাহিত্যের একটি অনুষ্ঠানের শেষে শিয়ালদা থেকে রাতের লালগোলা প্যাসেঞ্জার ধরে বাড়ি ফিরছি। শুরু হয়েছে তুমুল বৃষ্টি! সেই সঙ্গে এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়া! আমাদের স্টেশনে যখন নামলাম তখন রাত দেড়টা! ওই দুর্যোগের রাতে স্টেশন থেকে বাড়ি যাওয়াও একপ্রকার অসম্ভব! কাজেই স্টেশনে বসে রইলাম সকালের অপেক্ষায়! ছোট্ট স্টেশন, ওয়েটিং রুম নেই। অগত্যা শেডের নিচে বসে রইলাম। প্রচন্ড হাওয়ায় বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিতে লাগলো। সুতরাং ঘন্টাঘরের বারান্দায় উঠে বসলাম।
অনেকক্ষণ বসে থেকে একটু তন্দ্রামত এসে গিয়েছিল। হঠাৎ টের পেলাম আমি একা নই, আমার চারপাশে অগুনতি কালো কালো ছায়া নড়াচড়া করছে! চোখ কচলে ভালো করে দেখতেই আমার তো মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল! শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো ঠান্ডা একটা ভয়ের স্রোত! দেখলাম নানা ধরনের ভূত আমাকে ঘিরে ধরেছে – আমার দিকে আঙুল তুলে কৈফিয়ৎ দাবি করছে! ওদের চেঁচামেচি আর হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ শব্দে কান পাতা দায়! এমন সময় ব্রহ্মদত্যি আসতেই শোরগোল থেমে গেলো। ব্রহ্মদত্যির এজলাসে সিড়িঙ্গে ভূত একটা লম্বা খাতা এনে আমার বিরুদ্ধে নালিশগুলো একে একে পড়তে লাগলো – আমি কোন কোন ভূতের নামে কি কি অপমানজনক কথা-বার্তা গল্পাকারে লিখেছি সেসব শুনে উপস্থিত ভূতমন্ডলী বারবার উত্তেজিত হয়ে পড়তে লাগলো! মামদোভূত হাতুড়ি ঠুকে "শান্তি! শান্তি!!" বলে বৃথাই চেষ্টা করতে লাগল ওদেরকে থামাবার! সবাই-ই আমার কঠোর শাস্তি চায়, আর তা হল প্রাণদণ্ড! আমাকে রেললাইনে ফেলে দিয়ে মারবার সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যেতেই আমি তো ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি! এমন সময় এক কবি-ভূত উঠে আমার পক্ষ নিয়ে জানালো যে – বিভিন্ন ছড়া-কবিতায় এই ভূতনাথ ভাদুড়ী ভূতেদের অনেক প্রশস্তিও গেয়েছে। সে দু'একটি কবিতা পাঠ করে ব্রহ্মদত্যির মনে খানিকটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হল। তখন ব্রহ্মদত্যি গম্ভীর স্বরে জানালো যে – ভূতনাথ ভাদুড়ীকে দু'টো লঘু সাজা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে! প্রথমটি হলো সে জীবনে আর কোনদিন ভূতের গল্প বা কবিতা লিখতে পারবে না! আর দ্বিতীয় সাজাটি হলো তার এই ভূতনাথ নাম তাকে ত্যাগ করে অন্য নাম নিতে হবে!
পরদিনই আমি কোর্টে গিয়ে হলফনামা দিয়ে ভূতনাথ থেকে ভবতোষ হলাম, আর চিরকালের মতো ভূতের গল্প-কবিতা লেখা ছেড়ে দিলাম!!
_____________________
***গোবিন্দ মোদক।
রাধানগর, ডাক- ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।
পশ্চিমবঙ্গ, ডাকসূচক - 741103
WhatsApp/ফোন: 8653395807 / 7044404333
email id: modakgobinda001@gmail.comলেখক পরিচিতি :-
গোবিন্দ মোদক।
সম্পাদক: কথা কোলাজ সাহিত্য পত্রিকা।
পিতা: কানাই লাল মোদক।
মাতা: প্রতিভা রাণী মোদক।
লেখকের জন্ম: ৫-ই জানুয়ারি, ১৯৬৭
বাসস্থান: রাধানগর, কৃষ্ণনগর, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ। ডাক সূচক- 741103
মুঠোফোন নম্বর- 7044404333
শিক্ষাগত যোগ্যতা: M.Com (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)।
পেশা: প্রথম জীবনে অধ্যাপনা, পরবর্তীতে India Post (ডাক বিভাগ)-এ কর্মরত।
নেশা: লেখালিখি। বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র হওয়া সত্বেও ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি ঐকান্তিক অনুরাগে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম। ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা, উপন্যাস ইত্যাদি লিখলেও ছোটদের জন্য ছড়া-কবিতা ও গল্প লেখার মধ্যেই খুঁজে পান অধিকতর তৃপ্তি। প্রচারবিমুখ আত্মমগ্ন এই মানুষটি লেখালিখি ছাড়াও ভালোবাসেন: বই পড়া, গান শোনা, পত্রিকা সম্পাদনা, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, বেড়ানো, সাহিত্য বিষয়ক নির্ভেজাল আড্ডা, এলোমেলো ভাবনায় নিমগ্ন হওয়া।
প্রকাশিত গ্রন্থ: হারিয়ে গেছে ডাক-বাক্স, ধিতাং
ধিতাং বোলে, অদ্ভুত যতো ভূতের গল্প।
No comments:
Post a Comment