অগ্নিশ্বর সরকার
গত কয়েকদিন ধরেই রাতে একই স্বপ্ন দেখছে সুশীল। একটা বনের মধ্যে দিয়ে সদ্য কেনা সাইকেলটা নিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে বড় বড় গাছ। যতদূর সম্ভব পাইন গাছ। জায়গাটা দেখে কেমন পাহাড়ি এলাকা বলে মনে হয়। এলোমেলো সাইকেল চালাতে চালতে ধাক্কা খেল একটা বড় অশ্বত্থ গাছে। সাইকেল থেকে পড়ল বা সুশীল। গাছের সাথে সাইকেলটা আঠার মতো আটকে গেছে। গাছটাতে অদ্ভুত ধরণের কয়েকটা তিনকোনা আর গোলাকৃতি ছবি আঁকা আছে। হঠাৎ হুড়মুড় গড়ে গাছগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করল। সামনের অশ্বত্থ গাছটা পড়ল সুশীলের মাথায়। ঘুমটা ভেঙে যায় সুশীলের। রোজ ঠিক একই সময়ে। ঘড়ির কাঁটাগুলো জানান দেয় দুটো বাজে। তারপর থেকে আর ঘুম আসে না সুশীলের।
মধ্য কলকাতার আপাদমস্তক পলেস্তরাহীন একটা বাড়িতে একাই থাকে। পারিবারিক বাড়ি। বাবা-মা মারা গেছে অনেকদিন আগেই। বছর তিনেক হল, পুরসভাতে অস্থায়ী সাফাই কর্মী হিসাবে যোগদান করেছে। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। আজ অফিসে সুপারভাইজার রত্নাদি-কে স্বপ্নের কথাটা বলেছিল।
রত্নাদি শুনেই বলল, ‘রাতে খাওয়াটা ঠিকঠাক হচ্ছে না। তার ওপর নতুন সাইকেল কিনেছিস, সব মিলিয়ে একই স্বপ্নটা দেখছিস। দু’দিন পরেই রবিবার, তুই কোথাও থেকে ঘুরে আয়। রোজ এক রুটিন ফলো করতে করতে একঘেয়ে হয়ে গেছে। আর ওই স্বপ্নটার কোথা ভুলে যা।’
আজ পুরসভার কাজ শেষ করে নিউ মার্কেটে ঢুকল সুশীল। ইচ্ছে করেই সাইকেলটা অফিসেই জমা রেখে এসেছে। ইতস্তত এদিক ওদিক ঘুরে রাস্তার পাশের একটা দোকান থেকে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে বাস ধরে বাড়ির দিকে এগোল। আজ অন্য কোনো চিন্তা নয়। একটু ভাতে সিদ্ধ ভাত খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে। কাল বাদ পরশু রবিবার, কোন্নগরে ছোট মাসির বাড়ি যাবে। সত্যিই তো, অনেকদিন কারোর বাড়ি যাওয়া হয়নি।
সেদিন রাতে খুব ভালো করে ঘুম হল। মাঝরাতে ঘুম ভাঙেও নি। তাহলে বুঝি একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছিল জীবন! পরদিন রত্নাদির সাথে দেখা হতে সুশীল গত রাতের কথা বলল।
‘আমি তোকে কাল-ই বলেছিলাম। তুই একটু ঘুরে আয়। আর রোজ এখান থেকে বেরিয়ে একটু আড্ডা দে। বাড়িতে টিভি নেই তো? সামনের মাসের মাইনে পেলে একটা টিভি কেন তো।’ হাসিমুখে বলল রত্নাদি।
আজ সাইকেলটা নিয়ে পৌরসভা থেকে বেরোল সুশীল। আজ বাড়ি ফেরার আগে একটু বাবুঘাটে বসে তারপর বাড়ি যাবে। গঙ্গার এলোমেলো হাওয়ায় মনটা হালকা হয়ে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পর সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল সুশীল। বাড়ি ফিরে আগেরদিনের মতো ভাতে সিদ্ধ ভাত খেয়ে শুয়ে পড়ল। আজ আবারও সেই একই স্বপ্ন। সেই দুটোর সময় ঘুম ভেঙে গেল। তাহলে কি ওই সাইকেলটা স্বপ্নটাকে বয়ে এনেছে?
*
দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে মামাতোভাই রাকেশের সাথে ঘুরতে বেরোল সুশীল।
‘দাদা শকুন্তলা কালীবাড়ি যাবি?’ জিজ্ঞেস করল রাকেশ।
‘চল। অনেকদিন যাওয়া হয়নি।’ উত্তর দিল সুশীল।
দু’ভাইয়ে চলল শকুন্তলা কালীবাড়ির উদ্দেশ্যে। সেখানে পুজো দিয়ে বেরোনোর সময়ই ঘটনাটা ঘটল।
‘বেরোস না মায়ের থান থেকে। বাঁচবি না’রে। তোকে ঠিক খুঁজে বের করেছে। এবার তোর পালা।’ একটা কর্কশ চিৎকার ছুটে এলো মন্দিরের বাইরে থেকে।
আচমকা চিৎকারে হকচকিয়ে গেছে দর্শনার্থীরা। সবাই এদিক ওদিক চাইছে।
আবারও বাইরের থামের আড়াল থেকে আওয়াজ ভেসে এলো, ‘কী ভাবছিস, মায়ের সাথে দেখা করে গেলেই বাঁচবি? মরবি। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবি, আগে যেমন মরেছিলিস। ওই সাইকেলই গলা টিপে তোকে মারবে। ’
সুশীল এবার নিশ্চিত, এই কথা তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা। বেরিয়ে দেখল একটা পাগল বসে আছে। মাথায় বড় বড় জটা। অর্ধছিন্ন পোশাক।
আবারও লোকটা জোরে বলল, ‘আজই পারলে গঙ্গায় ভাসিয়ে দে। কালকের অমাবস্যায় তোর গলায় প্যাঁচ দিয়ে মারবে।’
সুশীলের ভয়ে মুখচোখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। দাদাকে দেখে রাকেশও ঘাবড়ে গেছে।
‘কী হয়েছে রে দাদা?’ ভীতসন্ত্রস্ত গলায় সুশীলকে জিজ্ঞেস করল রাকেশ।
‘ও কি বলবে, আমি বলছি শোন। বোস এখানে।’ আদেশের ভঙ্গিমায় বলল পাগলটা।
‘ও আগের জন্মে সাইকেল অ্যাক্সিডেন্টে মরেছে। দেহের সৎকার হয়নি তখন। সাইকেল ছেলে বেরোতে পারেনি এই ছোঁড়া। কাল অমাবস্যা। আগে ওই আপদকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দে। অমাবস্যায় ও তোকে নিয়েই ছাড়বে। আবারও ও ঘুরে বেড়াবে। তোর প্রতিটা জন্মেই তোকেই খুঁজে বেড়াবে, যতদিন না পর্যন্ত ওর তৃপ্তি হচ্ছে। সেই সাইকেল তোর দাদা বাড়িতে জুটিয়েছে। বলা ভালো, জূটে গেছে।’
রাকেশের চোখেমুখে এখনো ধোঁয়াশা। ওদিকে দাদার মুখ-চোখ পুরো সাদা।
কাঁপা গলায় সুশীল বলল, ‘আমি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল কিনেছি ক’দিন আগে..’
‘কিনেছিস কী রে? ও তোকে খুঁজে চলে এসেছে। পারলে আজই গঙ্গায় দিয়ে আয়।’ বলল পাগলটা।
শেষের কথাগুলো শুনে আরও ঘাবড়ে গেল দু’ভাই। উঠে দাঁড়িয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো এগিয়ে চলল সুশীল। একটু জোরে হেঁটে দাদাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করল রাকেশ, ‘কী হয়েছে বলবি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সাইকেলটা কেনার পর থেকেই রাতে আমি একই স্বপ্ন দেখে চলেছি। আজ আমার কাছে পরিষ্কার। আমি চললাম কলকাতায়। আজই ওই অভিশপ্ত সাইকেলটাকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবো।’ কথাগুলো কোনোরকমে ভাইকে বলল সুশীল। বলেই আবারও উদ্ভ্রান্তের মতো এগিয়ে গেল ষ্টেশনের দিকে।
*
ঘড়ির কাঁটায় রাত আটটা। কলকাতার বাবুঘাট এখন সবে জমে উঠেছে। তার উপর আজ রবিবার। সাইকেলটা নিয়ে একপা একপা করে গঙ্গার দিকে নামতে শুরু করল সুশীল। গঙ্গায় সাইকেলটা থেকে দিতেই আশপাশের লোক হইহই করে উঠল। সাইকেলটার সাথে আটকে গিয়ে সুশীলও নেমে গেছে গঙ্গার গর্ভে। সাইকেলটা আঠার মতো আটকে রেখেছে সুশীলকে। অনেকে ছুটে এলেও শেষরক্ষা করা সম্ভব হয়নি। শেষ নিঃশ্বাস পড়ার আগে জলের তলায় সুশীল ওই পাগলটাকে সাইকেলের চালক রূপে দেখতে পেয়েছিল। হয়তো সে-ই ফাঁকি দিয়ে নিতে এসেছিল সুশীলকে। হয়তো ওই পাগলটাই ছিল পূর্ব জন্মের সুশীল, তাই কিছুক্ষণ আগে মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে পারেনি। হয়তো!!
No comments:
Post a Comment