Saturday, 4 June 2022

ধোকার ডালনা--কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)



ধোকার ডালনা--
                                                           কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)


        " আমার ভিতর ও বাহিরে

              ..... ...... তুমি

           ..... জুড়ে

        ...... ........ ....... .......   "


           গানটা সজলের ভীষণ ভীষণ প্রিয়। এই গানটাই সজলের নতুন সুরে নতুন নামে বাঁচার একটা ফ্রেশ অক্সিজেন।

ছোট থেকেই গানের পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা সজলের। বাড়িতে বাবা, কাকা, পিসিরা ঘটা করে গান বাজনা চর্চা করতেন। মাঝে মাঝে সঙ্গীতের আসর বসত বাড়িতে। অনেক গুণীজন সেখানে পায়ের ধূলো দিতেন। প্রচুর পরিষ্কার, প্রচুর সার্টিফিকেটে বাড়ির ভারী, গম্ভীর আলমারিগুলো ভর্তি। 
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে গানের লাইনে ক্যারিয়ার শুরু করুক। বাবা খুব ভাল গাইতেন। মন প্রাণ ঢেলে ছেলেকে গান শিখিয়েছেন। শহরের সেরা গায়ক, গায়িকাদের কাছে তালিম নেওয়া করিয়েছেন। 
বাবার কথা কোন কারণে রাখা হয়নি সজলের। চাকরি পাবার পর তাকে চলে যেতে হয় অবিভক্ত পশ্চিমদিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে। সেখানে নতুন চাকরিতে যোগদানের সুবাদে সংগীত সাধনায় একটু ছেদ পড়েছিল। তবে চর্চাটা সময়ের আদরে আবদারে ঠিক চলত। ছুটির দিন হলে তো কোন কথায় নেই। 
যদিও পরে পারমিতার সাহায্যে আবার নতুন করে হারমোনিয়াম হাতে তুললেও তা শেষে সুখকর হয়নি। একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকেই যায়। যার পরিণাম ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জমাট ধুলোর একটা পুরু আস্তরণ জীর্ণ হারমোনিয়ামের গায়ে জমতে জমতে শেষে সেটা ক্রমশঃ শ্রীহীন হয়ে ওঠে।

                    ******** *********  

অতীতটা আজকাল সজলকে বড্ড বেশী নাড়া দেয়। বাঘ যেমন নিজের পুরোনো ঘেয়ো জায়গাটা চেটে চেটে একটা আনন্দ পায়, ঠিক তেমনি সজল নিজের স্মৃতির আটলান্টিকে ডুবে ডুবে ডুব সাঁতার দিতে একটা আলাদা অনুভূতি উপলব্ধি করে। 
সজলের অফিসের পাশেই বিএড কলেজ। বিএড কলেজের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বেশ সমারোহ সহকারেই হয়। অনেক নামী, জ্ঞানী লোকের পা পড়ে সেখানে। মঞ্চ কাঁপানো প্রতিযোগিতাও চলে।জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে  সবাই অংশগ্রহণ করে। একটা উৎসবের মেজাজ।সকলে আনন্দে গা ভাসায়। 
একবার সেই রকম এক অনুষ্ঠানে সজল এসে উপস্থিত। একটু পরেই উদ্বোধনী সংগীত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হবে। কিন্তু যিনি উদ্বোধনী সংগীত গাইবেন তিনি অসুস্থ। উনার আবার আরো অনেক গানের অনুষ্ঠান রয়েছে। খবরটা শুনেই চারিদিকে শোরগোল পড়ে গেল। শুরু হল ছোটাছুটি। একটা অস্থিরতার মেঘ জমে উঠছে। মনে হচ্ছে মেঘ ছিঁড়ে পশ্চিমীঝঞ্ঝার  নিম্নচাপ  এখনই শুরু হবে। 
তবে সেই মেঘ বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় নি। মেঘের ভ্রুকুটি ঠেলে ঝলমলে রোদ্দুর উঠল। যখন সজল মাইক্রোফোনটা বলিষ্ঠ হাতে ধরে গলা ছাড়ল। 
সবাইকে অবাক করে দিয়ে সজল হারমোনিয়াম ধরে গান গাইল। শুধু তাই নয় পর পর নৃত্যনাট্য আর গীতিনাট্যতেই গলা মেলাল। পারমিতা দূর থেকে সবটাই দেখেছে আর আনন্দে চোখের জল ফেলেছে। বহু বছর পরে সজল মঞ্চে উঠল। আর নিজেকে নতুন করে মেলে ধরল।
আদিবাসী সুন্দরী মেয়ে পারমিতার প্রেমে পড়তে তাই সজলের বেশী সময় লাগেনি।প্রথমে বন্ধুত্ব পরে মন দেওয়া নেওয়া। যদিও সেই প্রেম বেশী দূর এগোয়নি। 
সজলের রক্ষণশীল বাবা সেটা মেনেও নেয়নি। সব শোনার পর উনি সজলকে ত্যাজ্য পুত্র করেন। যদিও বাবার সাথে দীর্ঘদিন ধরে একটা মনোমালিন্য চলছিল। সজলের বাবাকে নিয়ে নিজের কিছু সমস্যাও ছিল। 
যদিও পারমিতার দিক থেকে তেমন কোন বাঁধা আসেনি। পারমিতা সজলকে ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছিল। প্রতিদিন সজলের জন্য খাবার বানাত। সজলের অফিস আর পারমিতার কলেজ শেষ হলে ওরা দুজনে মীট করত। ছুটির দিনেও ওরা নিজেদের মতন করে কাটাত।

 ******* ***********

 সজলের সবচেয়ে প্রিয় ছিল পারমিতার হাতের তৈরী ধোকার ডালনা। এখন ওটা ভীষণ মিস করে সজল। কারণ ঐ পদ রাঁধার লোকটাও যে আর নেই। নেই মানে অনেক দূরে চলে গেছে। সজলকে একা ফেলে।  
রুদ্রর গানটা গাইতে  গাইতেই চোখের কোণ নোনা জলে ভরে উঠল। আর কদিন পরেই তো অবসর জীবন শুরু হবে। এই মেসটাও ছেড়ে দিতে হবে। এই মেসের আনাচে কানাচে পারুর পারফিউম,   ঘামের গন্ধ চোখের জল লুকিয়ে আছে। আজও তারা ফিস ফিস করে গল্প করে। 

                          ******* *********

কালিয়াগঞ্জ থেকে বদলি নিয়ে বিভিন্ন জেলাতে থাকলেও, বিভিন্ন জ্যামিতির রদ বদল হলেও ;  এখানকার মাটির টানে আবার কালিয়াগঞ্জে ফিরে আসে। জীবনের শেষ কটা দিন এখানে কাটাবে বলে। আর আসে পারমিতার টানে।
ওর স্মৃতি আজও পরম মমতায় হাতড়ে বেড়ায়। ওর চেনা ছন্দটা ফিরে ফিরে আসে।  
পারু  এখন কেমন আছে জানেনা। কোথায় আছে সেটাও অজানা। বহু বছর যোগাযোগ নেই। চিঠি লেখাও আর হয়ে ওঠেনি। কালের নিয়মে সব হারিয়েও  গেছে। তবে যতদূর জানে ও ভীষণ কষ্টে আছে।  ওর বিয়ে হলেও দুই  এক বছর  পরে ও স্বামীর ঘর থেকে ফিরে আসে। সংসারটাই আর করা হয়ে ওঠেনি।  পরে ওর স্বামীও একটা আলাদা সংসার পাতে। অন্য একজনকে ভালবেসে তার হাত ধরেই.


                    *********************


          দেখতে দেখতে সজলের চাকরি জীবনের আয়ুও শেষ হতে চলল। অবসরের পরেই ও  রায়গঞ্জের এই বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসে। এখানে ঠিক করেছে জীবনের বাকি দিন গুলো নতুন সুরে নতুন নামে কাটাবে। আর পারমিতার স্মৃতি আঁকড়ে বাঁচবে। 
ঘটনাচক্রে  পারমিতাও  সজলের এই বৃদ্ধাবাসে অনেক বছর ধরে আছে। স্বামীর সাথে সেপারেশন হবার পর থেকে ও এখানে ভালবেসে থেকে গেছে।  ও বালুরঘাটে চাকরি করে। ইচ্ছে করে পোস্টিংটা এখানে নিয়েছে।  উইক এণ্ডে আসে। আবার সোমবারে চলে যায়। ওর আর তিন বছর চাকরি আছে। ও জানেই  না সজল এই বৃদ্ধাবাসে এসে উঠেছে। বেশ কদিন হল। 
প্রতি রবিবার আশ্রমে দুপুরের মেনুতে ধোকার ডালনা হয়। আজ সজল বৃদ্ধাশ্রমের নতুন অতিথি হিসেবে খেতে বসেছে। ধোকার ডালনাতে মুখ দিতেই একটা শিহরণ। একটা আলাদা রোমাঞ্চ। কোথাও যেন একটা মিল। সেই পুরোনো চেনা ছন্দ। চেনা গন্ধ। দু চোখের কোণে অতি ক্ষীণ কালিন্দী নদীর যেন জোয়ার। জোয়ারে ভাসছে প্রেমের পানসি। 
পারমিতা যে এইভাবে ধরা দেবে সজল স্বপ্নেও ভাবেনি। যদিও পারু নেই। আজ ওর স্কুলে চাকরির পরীক্ষার ডিউটি পড়েছে।  ডিউটিতে ও গেছে।
সন্ধ্যের পরেই পারু ফিরল বটে তবে সজলকে চিনতে পারল না। কারণ পারুর স্মৃতি লোপ পেয়েছে। এক ভয়ঙ্কর এক্সিডেন্টে প্রাণে বাঁচলেও স্মৃতি চলে যায়।  যদিও অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করেছে। কোন রকমে ডাক্তারের পরামর্শে স্কুলের চাকরিটা করছে। ডাক্তারের বিশ্বাস এই চাকরিই ওর স্মৃতি ফেরাবে। 

তবু সজলের সান্ত্বনা পারু কাছেই আছে।


                        ******** **********

দেখতে দেখতে কটা বছর কেটে গেল। দুজনের চেহারার জ্যামিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। চামড়াতে ভাঁজ, মাথার কালো আফ্রিকাতে দু চারটে আঁকা বাঁকা রূপোলী রেখা। 


                   তিন বছর পরে ........


দুদিন আগেই পারু অবসর নিয়েছে। যদিও বাতের ব্যথায় কাবু। আজ আবার রবিবার। ধোকার ডালনা  রাঁধার দিন।
সজল নিজেই রান্না ঘরে চলে গেল। পুরানো ডায়েরী ঘেঁটে পারমিতার দেওয়া রেসিপিটা চট করে দেখে নিয়ে শুরু করল  ধোকার ডালনা রাঁধতে। ঠিক পারুর মতই রেঁধেছে। 
একটু পরেই সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে কিচেন থেকে। পারুর জিভে তার টুকরো টুকরো মৌতাত।  ওদিকে ও  জোর গলাতে গাইছে.....


                   " ....... .........

              পুষে রাখে যেমন ঝিনুক

                  খোলসের আবরণে........

               তেমনি তোমার নিবিড় চলা

                           হৃদয়ের নীল  .........

                                  ....... ....... .......   "

পারুর স্মৃতি একটু একটু করে ঘুমন্ত ভিসুভিয়াসের মতন জাগছে। 
সত্যিই নতুন সুরে নতুন নামে শুরু হল দুজনের পথ চলা। এই পথ চলা দুজন দুজনের হাত ধরে। একে অপরের কাঁধে কাঁধ রেখে। 



Address: 85, Kalibari Road, Nalta

                 Near Air Port Auto Stand

                 PO: Italgachha

                  Kolkata -28

                  North 24 Parganas


Mobile: 9073939997/9932958615(wh app)

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...