- - উত্তম চক্রবর্তী
শোভা বাজারের গঙ্গার কাছেই কুমোরটুলিতে ছিল আমার মামা বাড়ি। ছোট বেলায় প্রত্যেক বছর দমদম সেভেন ট্যাঙ্ক থেকে মার সাথে সেখানে যেতাম দাদু মামা মামিদের বিজয়ার প্রণাম জানাতে। দিদিমা আমার জন্মের আগেই নাকি মারা গেছিলেন। দোতলা মামা বাড়িতে বড় ও মেজো মামা তাদের পরিবার নিয়ে থাকতেন সাথে অবিবাহিত ছোট মামা ও আমাদের সবার দাদু। দাদু ছিলেন প্রায় আশি বছরের বুড়ো, চোখে ভালো দেখতে পারতেন না, দুই চোখেই ছানি পড়ে সাদা সাদা হয়ে গেছিল। ঠিক মত দেখতে পেতেন না বলেই হয়ত দাদু খুব খিট খিটে ধরনের ছিলেন। এদিকে এই সুগার নিয়েই রোজ বিকেলে তার গলির মোড়ের মিষ্টির দোকানের গরম গরম রসগোল্লা খাওয়া চাই। নাহলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলতেন। ছোট মামার কাজ ছিল এক হাঁড়ি রসগোল্লা এনে দাদুকে দিয়ে শান্ত করা। হাঁড়িতে না হলেও ডজন খানেক রসগোল্লা থাকতো। দাদু সেখান থেকে কাউকে একটাও মিষ্টি দিত না।
ছোট মামার বয়স তখন পঁচিশ হবে, রেলে চাকরী করেন। আমার বারো বছর বয়সে দাদু মারা যান। সেবার আমি বোন ও মা আমরা সবাই শ্রাদ্ধর পর বাড়ি ফিরেছিলাম। তখন থেকেই লক্ষ্য করতাম দাদুর ঘরে সন্ধ্যার পর আর কেউ যেত না। দরজাটা বন্ধ করে রাখা হত। ওখানে নাকি রোজ সন্ধ্যায় এখনো দাদু রসগোল্লা খাবার জন্য বায়না করেন আর ঘরের জিনিষ ভাংচুর করতে থাকেন বা আলমারিতে ও খাটের উপর জোরে জোরে লাঠির বাড়ি মেরে আওয়াজ করেন।
এক বছর বাদে বড় মামার বড় মেয়ের বিয়েতে আমরা দুদিন আগে থেকেই মামা বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। আমরা পাঁচ ছয়জন ভাই বোন দাদুর সেই ঘরে দিনের বেলায় ভয়ে ভয়ে গিয়ে দাদুর বিছানায় বসে ক্যারাম খেলতাম। কিন্তু মেজোমামা সন্ধ্যা ছ’টার পর ঘরের দরজায় তালা মেরে দিত। বিয়ের দিন মামা বাড়ির উঠোনে বিয়ে ও বরযাত্রীর বসার ব্যবস্থা আর দোতলার ছাতে প্যান্ডেল হয়েছিল খাওয়া দাওয়ার জন্য। মেঝমামা দাদুর ঘরের খাটের নিচে রসগোল্লা, লেডিকেনি দরবেশ দই এসব রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। দাদুর ঘরের পিছনে দিকে একটাই ভাঙ্গাচোরা জানালা বেশিরভাগ বন্ধ থাকত। ওপারে বাড়ির পিছনে মেথরদের যাবার সরু গলি ছিল। মেজোমামা ঐ ঘরের চাবি নিজের কাছেই রাখতেন, তাই বাচ্চাদের মিষ্টি চুরি করবার কোন সুযোগ ছিলনা।
রাতে যারা খাবার পরিবেশন করবে তাদের তিনজনকে সাথে নিয়ে গিয়ে মেজোমামা গেলেন দাদুর ঘরে মিষ্টি আনতে। তালা খুলে প্রথমে সামনের দিকে রাখা রসগোল্লা লেডিকেনি দরবেশ দইয়ের হাঁড়ি তাদের হাতে তুলে দিলেন। আবার ঘরে তালা মেরে চলে গেলেন ওপরে পরিবেশন দেখতে। এই ভাবে তিন ব্যাচে বরযাত্রী সহ দেড়শ জন খেয়ে নিয়েছে তখন। এখনো প্রায় সত্তর আশি জনের খাওয়া বাকি। হটাত মেজোমামার কেমন যেন সন্দেহ হল যে পিছন দিকে রাখা মিষ্টির বাসনে মিষ্টির পরিমাণ কম দেখলাম কেন ? ভয় পেয়ে গেলেন, সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে পারবেন তো ? বড়মামা জানতে পারলে তো ভীষণ রেগে যাবেন আর তার ভাইকে খুব বকাবকি করবেন। একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটে যাবে আজ।
মেজো মামা চতুর্থ ব্যাচ শুরু হতেই চুপি চুপি দাদুর ঘরের দিকে এগোলেন দেখতে যে দাদুর ভূত এসে আবার সব মিষ্টি চুরি করে খাচ্ছে না তো ? মামা চুপিসারে নিঃশব্দে ভয়ে ভয়ে ঘরের তালা খুললেন আজ দাদুর ভূত দেখবেন ভেবে। ওমা, মেজো মামা অবাক হয়ে দেখেন দাদুর ঘরের পিছনের জানালা খোলা, ছোট মামা তার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকে মাথা নিচু করে রসগোল্লার পাত্র বের করে টপাটপ মুখে পুরছে। আর জানালার বাইরে ছোট মামার বন্ধুরা সব দাঁড়িয়ে আছে ভাগ পাবার জন্য। মেজো মামা অবাক হয়ে দেখলেন এই বিয়ে বাড়ির পরিবেশের ফাঁকেই মিষ্টি লোভী দাদুর এই ঘরে জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব চলছে যেন।
---------শেষ---------
No comments:
Post a Comment