Saturday, 4 June 2022

উচ্ছিষ্ট ও জাগ্রত....শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।


উচ্ছিষ্ট ও জাগ্রত
....শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।

বিবাহের প্রথম রাতের রাগিণী হয়ত বিবাহসভার উদযাপনের সুরে যেমন চিরদিন একই সুরে বাজেনা, তাও তার উদযাপনের কাঙ্ক্ষিত আসরে  লোকে এসে  আনন্দ -ফুর্তি করে।

দুটো ভালমন্দ খেতে পাওয়া যায়  বলে তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির সেই অদম‍্য প্রবৃত্তি আসলে   ওদের ঠিক উস্কে দেয়।

যদিও আবার নিজেদের ডেরায়  ফিরে যাওয়ার আগে তারা ওই নবদম্পতিকে তাদের আগামী দিনগুলোর জন‍্য  শুভেচ্ছা জানাতেও তারা কিন্তু ভোলে না।   আর যে মানুষগুলোর নিজের বিবাহিত জীবনে অযথা  ঘূণ ধরে গিয়ে এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে অথবা যাদের আর তা থেকে আর নতুন করে কিছু খুঁজে বের করার উদ‍্যম বা স্থৈর্য‍্য কোনওটাই নেই,  তারাও কিন্তু একজন নবদম্পতির মিলন অনুষ্ঠানে আসে।

সেখানে এসে তারা তৃপ্তির একমুঠো অন্ন আর সমগ্র বৈভব প্রদর্শনের আগুনে নিজেদের মৃত ও বাসি হয়ে আসা মাংসগুলোকে একটু  যেন সেঁকে নিয়ে আবার  নতুন করে বেঁচে থাকার পথে  পা রাখতে চাওয়ার এ এক অবধারিত নিয়ম। যদিও সেই যৌথজীবনের সার্থকতায় তাদের আর কোন ভূমিকা আর না থাকলেও তবুও তারা  সেখানে আসে!

আসলে একটা চকচকে ও আকর্ষণীয়  উপহারের দানসামগ্রীর বিনিময়ে অন্তত উদরপূরণের ঔদার্য‍্যকে তারা ছোট করতে পারেনা বলেই হয়ত আসে।
.........

সেরকমই একটা আনন্দমূখর বিয়েবাড়ির বাইরে একটা সমবেত জনসমষ্টির কোলাহল হঠাৎ  ভেসে আসে। অতঃপর তার টানে টানে বিয়েবাড়ির ভিড়ও একটু একটু করে ঐ গোলমালের দিকে কৌতূহলী চোখে চাইতে থাকে।  সবাই দেখে যে আসরের উচ্ছিষ্ট খাবার যেখানে ফেলে দিয়ে জড়ো করা হয়েছে সেখানেই এই গন্ডগোলের সূত্রপাত।

.........

শ‍্যাম মাস্টার নামে এক খোঁড়া ও ভবঘুরে মানুষের সাথে সামনের ফুটপাতে থাকা আরোও কয়েকজনের সাথে বচসা লাগার উপক্রম।
এই শ‍্যাম মাস্টার আগে কাছের স্কুলে ভূগোল পড়াত। সে কাজে যথেষ্ট নামডাক ছিল তার। তবে সেবার হাইওয়ের ধারে  দুর্গাপুজোর সময় একটা লরির সাথে মাস্টারের সাইকেলের ধাক্কা লাগে। মাথায় চোট লেগে তখন প্রায় মৃত মাস্টারকে লোকজন ধরাধরি করে  সামনের সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় যমে মানুষে দিন দশেক টানাটানির পরে মাস্টার বেঁচে ফিরলেও,  পুরোপরি সুস্থ হয়ে উঠতে আর পারেনি কোনওদিন।

তার  তিনকূলে কেউ ছিলনা যে একটু যত্নআত্তি করবে। সেই হাসপাতালে যা চিকিৎসা হবার হলেও মাস্টারের ওই  ইস্কুলের চাকরীটা আর তারপর বেশীদিন রইল না।
.....
মস্তিষ্ক তথা স্বরযন্ত্রের অঘোষিত ষড়যন্ত্রে কথা বলাটাও ক্রমশ অস্ফূট থেকে অস্ফূটতর ধ্বনিসারে পর্যবসিত হওয়ায় জীবিকার প্রচন্ড সম‍স‍্যায় শুরু হল এবারে এক ভবঘুরে বৃত্তি। ততদিনে ছাত্র ছাত্রীরা, এমনকি তাদের বাবা -মা'রাও মাস্টারকে এড়িয়ে চলতে লেগেছে।

ব্রজ পালাকারের মা যতদিন পেরেছে মাতৃস্নেহে আপনভোলা মাস্টারকে ডেকে দু'বেলা খাবার দিত বলে মাস্টারের অপ্রয়োজনীয় পরাণটুকু শেষমেশ রয়ে গেল।
......

" এ‍্যাই ছোঁড়া....... ওরে ওই তো অরোরা বোরিওলিস রাতের আকাশে....!" অস্ফূট স্বরে শ‍্যাম মাস্টার  এসব ভাঙা গলায় বলতে বলতে ওখানে কারুর ফেলে দেওয়া দু-তিনটে লুচির টুকরো আর পায়েসের কিয়দংশ একটা দোনায়   তুলে পাশ্ববর্তী  আর একজন অবশিষ্টজীবি কানা লোচনের অতি কষ্টে সংগৃহীত কিছুটা খাদ‍্যাংশ  তড়িৎগতিতে ছিনিয়ে নিতেই  এবারে কানা লোচন তারস্বরে ও অসহায় গলায় হাঁউমাউ করে ওঠে।

সেই কলহযাপনে এলাকাল নামকরা খিস্তিবাজ ও নানা রোগে জীর্ণ ও ভিখিরিদের মুরুব্বী গুছের 'বুঁদির মা' তার কাংস‍্যবিনন্দিত  গলার জোরে আরও জনা পাঁচেক লোক জুটিয়ে এনে অর্ধোন্মাদ ও ক্ষুধার্ত ভবঘুরে শ‍্যাম মাস্টারকে তার  এই অপরাধটুকুর জন‍্য  যথেচ্ছ পীড়নের জন‍্য উস্কিয়ে দেয়।

অবশেষে তাদের সবার কাছে অকথ‍্য প্রহার ও ক্ষুধার পীড়নে মৃতপ্রায় শ‍্যাম মাস্টারকে যতক্ষণে বিয়েবাড়ির লোকজনেরা  বেরিয়ে এসে ওদের হাত থেকে শেষমেশ উদ্ধার করে ততক্ষণে প্রহারের দাপটে রুগ্নদেহী মাস্টার প্রায় মৃতপ্রায়।
.....

সামান‍্য এই খাদ‍্যাংশ যা আদতে উচ্ছিষ্ট ও বাতিল হয়ে গেছে, সেই ভুক্তাবশেষটিও যে কোন কোন মানুষের কাছে পরম তৃপ্তির হতে পারে অথবা বিবাদ ও অধিকারের বিষয় হতে পারে তা বোধহয় মানুষের সামাজিকতা  বলেই  সম্ভব। গোলমালের জেরে পাড়ার দু-একটি কুকুর কেমন যেন বিস্ময়ে মৌনতাকে অবলম্বন করে দরিদ্র মানুষগুলির এই  কান্ডকারখানা দেখতে থাকে।

এত মার খেয়েও রক্তাক্ত শরীরে মাস্টার ম্লান হাসি হেসে শেষবার বলে ওঠে, -

" খিদ‍ে পেলে সবাই দেখচি নিজের দেশের  মানচিত্তির ভেঙে খেতে শুরু করেচে ....কি ক্ষিদে...এ..এ! বাপ্ রে বাপ্!"

এই কথাটুকুর পর তার মুখে অস্ফূট বাক‍্যাংশ  বা আরও কিছু গোঙানি একসময় থেমে আসলেও তার পরণের শতছিন্ন পাজামার একটা  পকেটে তখনও একটা চ‍্যাপটানো মরা শালিকের বাচ্চার দেহ উঁকি মারছিল।

......

মাস্টার কথাটা খুব ভুল বলেনি কিন্তু! প্রচন্ড খিদের চোটে সে খানিক আগে একটা  মরা শালিক পাখিটির দেহাংশ  কোন দর্পীর পদতলে থেঁতলানো একটা স্বাদু রাধাবল্লভীর টুকরো ভেবেই হয়তো কুড়িয়ে নিয়েছিল পরে খেয়ে নেবে বলে।

আজ আদিগন্ত বিশ্বে ক্ষুধা ও তার জন‍্য সংগ্রাম ও বঞ্চনার ধারাপতনের ইতিহাসটি যেন  ক্রমশ আদিম ভূত্বকের সন্নিবিষ্ট সব জমানো সম্পদের পরে দেশ ও জনপদের চেনা মানচিত্রের বহিরাকৃতিকেও ক্রমসংকোচনের  ঘোরতর শাস্তি দিতে শুরু করেছে।

তবে গদ‍্যময় ক্ষুধার রাজ‍্যে শ‍্যাম মাস্টারের কৃত এই ভ্রান্তিটুকুও  আবহমান কালে  ঠিক একই ভাবে হয়ত জেগে থাকবে ; যেমন পূর্ণিমার চাঁদকেও ঝলসে যাওয়া রুটির অবয়বে কোনও কোনও  কবিরা  রাতের আকাশে এখনও চাইলে একবার অন্তত দেখতে পান।

............

17/04/2022

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...