Saturday, 4 June 2022

অন্ধকার জয়িতা ভট্টাচার্য


অন্ধকার    
জয়িতা ভট্টাচার্য

বেশ ফুরফুরে লাগছে। আশপাশের মানুষগুলো ঘামছে।অথচ আমার শীত করছে খুব।বেশ মজার ব্যাপার।গঙ্গায় জোয়ার এসেছে।পানা জড়ো হয়ে ভেসে যাচ্ছে,যেন সত্যবানের ডিঙা।আরো অনেক কিছু ভেসে ভেসে যাচ্ছে।একপাশে একটা বাঁধানো মঞ্চ ।আগুন  জ্বলছে দাউ দাউ। আর তিনটে ইলেক্ট্রিক চুল্লি।আশ্চর্য! পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এই প্রথম শ্মশানে এলাম।এর মধ্যে অনেকেই মারা গেছে কিন্তু আমার কেমন একটা অস্বস্তি হতো।আমার ছোটো ভাই  আশু এসেছে।এসেছে ছেলেও।একটা আধভাঙা ঘাটে বসে আছি।অনেক দূরে ডিঙি নৌকা।ওপারে কালচে গাছের সারি।লাল হয়ে  গেছে জল।সূর্য ডুবছে।এই তাহলে গল্পটা।
....একবার বাড়ি যেতে হবে ভাবতেই, বাড়ি।মা বসে আছে খাটে পা ছড়িয়ে শূন্য  দৃষ্টে জানলার দিকে তাকিয়ে।আমি মাঠ থেকে খেলে ফিরবো।আমার জীর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্থ এই মা নয়।আমার শিশুকালের মা।যার ফর্সা কপালে লাল টিপ আর জলজ ছাপা শাড়িতে রূপসী মা। পাশের ঘরে চোখ মুছতে মুছতে  আমার যাবতীয় ইনভেস্টমেন্ট, টাকা পয়সা গুছিয়ে রাখছে আমার বউ অনিমা।কিন্তু তার মুখটা অস্পষ্ট শুধু হাত দুটো। আমার বউয়ের শুধু দুটো হাত ছিল এতকাল বুঝিনি। 
কাল রাতে চায়ের কাপ টা নামাতেই হেঁচকি।বুকে একটা কালকেউটের ছোবল।মরে গেছি বুঝতেই বেশ ঘাবড়ে গেলাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে থাকা বেশি সুবিধাজনক ।
আয়নায় একটা কুৎসিত মুখ।অনিমেষ মিত্তিরের।কিন্তু আমি তো সুদর্শন।অফিসে অনেক কারচুপি।খাটের নীচে ট্রাঙ্কে লুকোনো কয়েক লক্ষ টাকা।আরো অনেক খারাপ কাজও করেছি।আসলে মরে যাব একথা তো ভাবিনি।জানলার পাশে বিরাট জারুল গাছটা যা বলছে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি।
সাঁ করে চলে আসি শ্মশানে ।অনিমেষ লোকটাকে দেখছি।মানে নিজেকে আরকি। চয়ন আমার ছেলে ঘড়ি দেখছে।দেখতে পাচ্ছি কারশেডের ধারে ওর বন্ধুরা অপেক্ষা করছে।
মরে গেলে প্রচুর সুবিধে।আগে জানতুম না চয়ন সমাজবিরোধী।চয়ন যে পার্টির হয়ে কাজ করছে তারা ওকে ঠিক একমাস পর খুন করবে।
অতীত ভবিষ্যত দেখতে পেলেও বদলাবার উপায় নেই।অনিমেষ ঢুকে গেলো চুল্লি তে।মুখাগ্নি র সময় যেন ছ্যাঁকা লাগল একটু।মনের ভুল।মন!!
জারুল গাছটা বেশ পছন্দ হয়েছে।একটা অন্ধকার কুণ্ডলী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
মাঠময় অন্ধকার জটলা।গাছ গাছালির পাশে বিরাট মাঠ।আগে এখানে ফুটবল খেলা হতো,মনিমেলা হতো।এখন কাশবন ,ঝোপ,সাপ খোপ।তবে কিনা হারায় না কিছুই শুধু বদল হয় আকার।আমিও ওই জটলায় এখন যাবো।কথা বলতে হয় না। এইসব অন্ধকার শেষে আবার নতুন অন্ধকার আসে।খারাপ ভাবনার কুণ্ডলী।একঘাট একমন হলে ভালো আধার হবে।তেমন আজকাল পাওয়া মুস্কিল।
মানুষের বুকের ভেতর সাদা কালো। আমরাই জিতে যাই হামেশা।কালোরা।
 নিত্য যুদ্ধ চলছে আলো আর আঁধারে।
এভাবেই থাকি।সবাই থাকে।জন্ম নেই 
মৃত্যুও নেই ।

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...