Saturday, 4 June 2022

শ্মশানবন্ধু... কৌস্তুভ দে সরকার


শ্মশানবন্ধু... 
কৌস্তুভ দে সরকার

দুপুর আড়াইটায় খবর এল, জীতেন বাবু আর নেই। রমেশ তখন স্কুলে। রমেশের স্ত্রী সরলা আর জীতেন বাবুর স্ত্রী রীণা একই স্কুলে চাকরি করে। সেই সুবাদে জীতেন বাবুর সাথে রমেশের পরিচয়। রাস্তায় দেখা হলে হাসি বা কুশল বিনিময় হতই। জীতেন বাবু অনেকদিন তাকে বলেছেন, "সময় করে একদিন আসুন না আমাদের বাড়িতে...।" সময় আর হয়ে ওঠেনি রমেশের। কিন্তু আজ সেই লোকটির মৃত্যু সংবাদ ওর মনকে উতলা করে তুলেছে। ব্যবহার এত ভালো ছিল। তাঁর শেষবেলায় অন্তত শ্মশানবন্ধু না হলে দুঃখটা থেকেই যাবে। স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে তাই দ্রুত বাইক চালিয়ে রমেশ পৌছে যায় নিকুঞ্জধামে। এখানে এদিনই প্রথম এল সে। এর আগে শুনেছে, শ্মশান হলেও জায়গাটা সুন্দর। সত্যিই তাই। একটা চিরশান্তি বিরাজ করছে এখানে। একদিকে চুল্লি, আরেকদিকে শ্মশানবন্ধুদের বসার ব্যবস্থা, খড়িঘর, পাশেই কালিমন্দির, রাজা হরিশ্চন্দ্র-শৈব্যার থেকে শুরু করে বাবা লোকনাথ, শিব, দুর্গা, মা-সারদা কার মূর্তি নেই এখানে। একদা এলাকার প্রতাপশালী জমিদার নিকুঞ্জবিহারী রায়ের নামেই এই শ্মশান। জমিদাতাও নিকুঞ্জবাবুই। সেই আমল থেকেই পাথরের মূর্তিগুলি আজ অক্ষত, অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে। শ্মশান কমিটি এই এলাকাটিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নও রাখে। কালি মন্দিরের মাথায় মাইকের চোঙ বাধা আছে। সেখান থেকে অল্প ভলিউমে পরীক্ষিৎ বালার বাউল গানের সুর ভেসে আসছে, ''হাতির দাঁতের পালঙ্ক তোর রইলো খালি পড়ে...।" এইসব দেখেশুনে মোটামুটি ভালো লাগলেও পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে গিয়ে বসতেই মনটা আর একটু ভারি হয়ে গেল ওর। ওখানে জীতেন বাবুর শ্মশানবন্ধু হয়ে আসা দুই ভাই সুজিত আর স্বপন বসে বসে এই জীবন-মরণ-উত্থান-পতন এসব নিয়ে নানারকম গল্প করছিল। রমেশও ওদের সেই গল্পে একটুআধটু যোগ দিয়ে দু'চারটে ছোটখাটো মন্তব্যও করছিল। সবমিলিয়ে আজ যথেষ্টই শোকাচ্ছন্ন সে। এরই মাঝে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দ্যাখে নেয় - বেলা কত হল। মোবাইলের চার্জটা ঠিক আছে কিনা। 
ওদিকে জীতেন বাবুর দাহ সংস্কারের কাজ প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছে।পাড়ার ছেলেরা ততক্ষণে চিতা সাজিয়েও ফেলেছে। জীতেন বাবুর ছেলেকে পুরোহিত স্নান করিয়ে এনে নানারকম বিধি নিয়ম পালন করাতে ব্যস্ত। এরপরই মুখাগ্নি হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা আস্ত শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ভাবতেই খারাপ লাগছে তার। ওই তো জ্বলে উঠলো চিতাকাঠ। সবাই এখন আরো ব্যস্ত, ঠিকমতো পুড়ছে কিনা, শ্মশানবন্ধুদের নাম -ঠিকানা লিখে নেওয়া এইসব নিয়ে। রমেশ কিন্তু জীতেনবাবুর এই নীরবভাবে পুড়ে যাওয়ার অন্যতম নীরব সাক্ষী। হঠাৎ তার কি মনে হল, পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে জীতেন বাবুর এই পুড়ে যাবার দৃশ্যটা সে মোবাইল ক্যামেরাবন্দী করে নিল। একটা মানুষের এই চিরবিদায়ের দৃশ্য করুণ ও মর্মান্তিক হলেও থাকনা অক্ষত সেই স্মৃতি। আগুনটা একসময় নিভে গেলে, সব ছাই হয়ে গেলে, তখন তো আর এই মানুষটাকে আর দেখা যাবে না। কেউ যদি সেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে দেখতে চায় সেই ছবি আর কোথায় পাবে? তাই তার মোবাইল  এই চরম সত্যের তাই ভিডিও রেকর্ডিংও করে রাখলো সে। 
দাহ শেষে শ্মশান থেকে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফিরে আসে রমেশ। সরলা ততক্ষণে বাড়ির বাইরে গরম জল, গামছা, নিমপাতা, আগুন আর একটা দা রেডি করে রেখেছে। বাইরের কলে স্নান সেরে ভেজা জামাকাপড়ে একটু আগুন সেঁকে, দা-এ এক কামড় বসিয়ে, নিমপাতা চিবিয়ে ঘরে ঢোকার নিয়ম। সবই তো হল। কিন্তু মোবাইল ফোনটাতো আর ধোওয়া যায় না। যাকগে, খুঁতখুঁতে মন নিয়েই ঘরে ঢুকে পড়ে সে। সরলা ততক্ষণে একবার এঘরে এসে চা দিয়ে চলে গেছে। রাতের রান্নাবাড়ি করছে সে। আর একটু পড়েই হয়তো ডাক দেবে ডাইনিং-এ। ঘরের লাইট নিভিয়ে চুপচাপ ঘরে বসে কিসব ভাবছিল রমেশ।  হঠাৎ তার মনে হল, একটু ভিডিও ক্লিপিংসটা খুলে একটু দেখা যাক। ফটোজ অপশনে গিয়ে সেটি খুলে দেখতেই চমকে ওঠে সে। একি। দাউদাউ সেই আগুনের ভেতর থেকে যেন বারবার ভেসে উঠছে জীতেনবাবুর মুখ। তার মোবাইলের স্ক্রিন জুড়েই সেই মুখ যেন বলতে চাইছে, "সময় করে একবার আসুন না আমাদের বাড়িতে...।" ভয়ে দোতলার জানলা থেকে এক্কেবারে বাইরে নীচে মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় রমেশ।

No comments:

Post a Comment

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...