ঊশ্রী মন্ডল
আমি সাধারণ এক বাঙালি ঘরের মেয়ে ছিলাম- তারপর বৌ হলাম,স্বাধীনতা বলে কিছুই ছিলো না,বরাবর পরেই ইচ্ছেতেই বেঁচেছিলাম- এখনও বাঁচছি ; জীবনের অনেকটা দিন পার করে দিলাম | পানাগড়ে চাকরি নেই,ছেলে ও স্বামী দুজনেই কলকাতায় চলে গেছে চাকরি নিয়ে, ওখানেই ঘরভাড়া করে থাকে, মাসে দুইবার ওদের কাছে যাই, আমি একা এখন এই ঘরের চৌকিদারি করি l
অফুরন্ত সময়,কী করি ; তাই লিখতে শুরু করে দিলাম, মনের ভিতর যা ঘোরাফেরা করছিলো , আমার অভিজ্ঞতা, আমার দেখা,শোনা সকল কিছুই l ফেসবুকের বন্ধুরা বলে, আমি নাকি মোটামুটি ভালোই লিখি, একটা নতুন ট্রেন্ড হয়েছে, গ্ৰুপ l ওখানে নিজের সৃষ্টি ছেড়ে দাও, নানান জন তোমার লেখা পড়বে, মন্তব্য করবে, আমিও খুশি খুশি মনে লিখতাম আর দিতাম l
এক গ্রূপের কর্মকর্তা বলে, ' সামান্য কিছু পয়সা নিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের লেখা ছাপাতে পারি, কেননা আমাদের কবিতাকে কেও ছাপার নেই l আমরা যখন থাকবো না তখন আমাদের একটা স্মৃতি তো থেকে যাবে' l মনে মনে লোভ হলো, সামান্যই তো পয়সা লাগবে, দি একটা কবিতা,120/- টাকা করেই তো দিতে হবে l স্বামীর ও ছেলের পকেট মেরে যা জোগাড় করতে পেরেছিলাম, তা দিয়ে দিলাম 1
কবিতা ছাপা হওয়ার কারণে ,কাগজে কলমে কবি হলাম ; ওই গ্ৰুপের কর্মকর্তা বলল,'কলকাতায় আসুন, এসে বই নিয়ে যান' l ভীষণ আগ্রহ হলো, কেমন হয় কবি সম্মেলন,তাই ওদের সম্মতি জানিয়ে দিলাম l স্বামী ও ছেলেকে বললে,নাকচ করে দেবে তাই ওদের না জানিয়েই সাহিত্য সভায় উপস্থিত হলাম l
অনুষ্ঠান শুরু হলো অনেক দেরিতে, বাঙালির অনুষ্ঠান তো,নিয়মানুবর্তিতা রক্তে নেই, আসলে আমরা বোধহয় ভীষণ আলসি l যাইহোক, অনুষ্ঠান শুরু তো হলো, থামতেই চায় না, বড়ো বড়ো বক্তৃতা অধৈর্য করে তুলছিলো, স্টেজে উঠলেই নিজেরা নিজেদের খুব পন্ডিত মনে করে l
ঘড়ির কাঁটা ঠিক টিক করে এগিয়ে চলেছে, যে উদ্দেশ্যে এসেছি তা সম্পাদন হচ্ছে না l লাজলজ্জা ছেড়ে পরিচিত কর্মকর্তাকে বললাম, 'এবার আমায় ফিরতে হবে, অনুমতি করুন' l জানি না উনি কী বুঝলেন, আমার প্রকাশিত(একটাই কবিতা তাতে ছিলো )কবিতার বই, একটা মেমেন্টো ও সার্টিফিকেট আর একটা খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন, আমি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম l
কলকাতার রাস্তাঘাট ভালো চিনি না, একে ওকে জিজ্ঞাসা করে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম l ট্রেন আর আসে না, কী যে করি, যদিও এই অঞ্চলেই স্বামী ও সন্তান আছে, তবুও যেতে পারছি না, যেটুকু স্বাধীনতা পেয়েছি তা নিমেষেই হারিয়ে যাবে,তাই চুপচাপ বসে পড়লাম ;এমন সময় একটা লোকাল ট্রেন এলো,চড়ে বসলাম l
ঝুকুর ঝুকুর করে চলছে আর প্রত্যেক স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে,অবশেষে বর্ধমানে এসে পৌছালাম l
ঘড়ির কাঁটা পোনে একটায় ছুঁই ছুঁই, আর কোনো ট্রেন নেই, সব চলে গেছে ; রাতটা এখানেই কাটানোর জন্য তোড়জোড় করতে লাগলাম l এমন সময় শুনি তুফান আসছে,লেটে চলছিল l বাস্ উঠে বসলাম, ঝুক ঝুক না করে ঝকর ঝকর করে চলতে লাগলাম,বেশী দেরী লাগলো না, পানাগড়ে জলদি জলদি পৌঁছে গেলাম l
নেমে দেখি,কেও কোথাও নেই, টিমটিমা আলোয় স্টেশনটাও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে l বাড়ি যেতে গেলে এখন পয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটতে হবে, রাত আড়াইটায় কোনো টোটোওয়ালাও বসে নেই l যদি সাহস করে হাঁটিও ঠিক পৌঁছে যাবো জানি , কিন্তু পাড়ার কুকুরগুলো ভীষণ বদমাস ভীষণ চিল্লামিল্লি করে, ঘিরে ধরে যেন কামড়ে দেবে ,সাহস হলো না, বসে গেলাম বেঞ্চিতে l
এমন সময় দেখি শুকুর মিঞা যাচ্ছে, আমি ছুটে গিয়ে বললাম, ভাই আপনি কী বাড়ি ফিরছেন? সে কয়,হাঁ দিদি, তা আপনি এতো রাত্রে এখানে কেন? আমি আমার আপবিতি শুনিয়ে বললাম, আমি যদি আপনার সাথে চলি আপনার আপত্তি নেই তো, আসলে একা একা যেতে ভীষণ ভয় করছে, সাহস পাচ্ছি না l সে বলে, আমার কোনো আপত্তি নেই, কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হয়ে যাবে, চলেন l
আমরা হাঁটা দিলাম, হাঁটতে হাঁটতে নানান গল্প জুড়ে দিয়েছি ; একসময় হটাৎ খেয়াল করলাম কবরখানার পাশে এসে গেছি l বললাম,' এদিকে এলেন কেন ভাই ', ও বলে,'এটাই শর্টকাট রাস্তা এদিক দিয়ে চলেন তাড়াতাড়ি আমাদের পাড়ায় পৌঁছে যাবো' , এই বলে কবরখানার গেট ঠেলে ভিতরের রাস্তা বরাবর হাঁটতে শুরু করে দিলো, আমি একটু ইতস্তত করে ওর পিছু নিলাম l
কিছুদূর যাবার পর দেখি কয়েকজন লোক, মাটি খুঁড়ছে, হয়তো কেও মারা গেছে, তাকে কবর দেবে ; হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের পাশে এসে গেলাম, দেখলাম আমাদেই পাড়ার লোক সবাই l ঐ তো কালু, ও খুব রসিক, চোখেমুখে রসিকতা ছড়িয়ে থাকে, আজ দেখি,ও দুঃখী এবং বিমর্ষ l কালুকে জিজ্ঞাসা করলাম,' কে মারা গেলো রে ?' সে বলে, ' শুকুর মিঞা, মারা গেছে সেই দুপুরে, তাকেই কবর দেবো এখানে আমরা 'l
আমি বলি, ' আমাকে কী বুৰ্বক ভেবেছিস নাকি, এতটা রাস্তা ওর সাথেই তো এলাম,এই তো আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ' l আমার কথা শুনে সবাই চমকে উঠে বলে,' কোথায় '? পাশে দেখি শুকুর তো নেই,কোথায় গেলো?এতক্ষন তো তার সাথেই আসছিলাম, ভয়ে হাত পা হিম হয়ে গেলো, এতক্ষন কী ভূতের সাথে আসছিলাম ?
এবার যখন সামনের দিকে তাকাই দেখি কেও কোথাও নেই, এতক্ষন যারা মাটি খুঁড়ছিলো তারা গেলো কোথায় ? কয়েকটা শিয়াল আমাকে চমকিয়ে দিয়ে হুয়া হুয়া করে ডেকে উঠল, নির্জন কবরখানা আমাকে দেখে যেন ফ্যাকফেকিয়ে হেসে উঠলো l বুঝতে পারলাম আজ অনেকগুলো ভুতের পাল্লায় পড়েছি, প্রানপণে ছুট লাগালাম , পড়তে পড়তে মরতে মরতে অবশেষে বাড়ি এসে পৌছালাম l
সকালে উঠে পাশের বাড়ির ফাল্গুনীকে সব জানালাম, সে শুনে বলে, ' সে কী ? কী সর্বনাশ, জানো দিদি আজকে দুপুরে আমাদের পাড়ার কয়েকজন লোক ট্রেন থেকে নেমে লাইনের উপর দিয়ে আসছিলো, এমন সময় একটা সুপার ফাস্ট ট্রেন ওদের পিষে দিয়ে যায়, ওদের মধ্যে কালু আর শুকুর মিঞাও ছিলো l লাসগুলো এখনও আসেনি, মর্গে পোস্টমর্টেমের জন্য পরে আছে, ওদের বাড়ির লোকজন খুব কাঁদছিলো, আহারে! কতগুলো জোয়ান মানুষ একটু ভুলের জন্য চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলো l এজন্যেই ওভারব্রিজের উপর দিয়েই চলাচল করতে হয় l তুমি বোধহয় ওদেরই ভূত দেখেছিলে, খুব বাঁচান বেঁচেছো, এমন করে রাতবেরেতে বাইরে থেকোনা ' l
আমি ভাবছি, আচ্ছা বদমাস তো কালু,বেটা নিজে যে মরেছে তা জানালো না, ভালো রসিক ও অভিনেতা বটে , মরার পরও রসিকতা যায় নি,আমার সাথে রসিকতা করে গেলো l মনে মনে ওর খুঁড়ে দণ্ডবৎ জানালাম l
সেই দিন থেকে নাক কান মূলেছি, আর দূরবর্তী কোনো সাহিত্য সম্মেলনে যাবো না,আর যদিও যাই স্বামী ও সন্তানকে জানিয়েই যাবো l এই স্মৃতি আমূল বদলিয়ে দিয়েছে আমাকে,আজও আমায় ভয় দেখায় l
No comments:
Post a Comment