বহ্নি শিখা (উষা দত্ত)
শারদীয় মহানবমী। বাড়িতে পূজো হচ্ছে।
মিতার শ্বশুর বাড়ি। আগে হতো না।
বারোয়ারি হলেও প্রতি বছরই তাদের বাড়িতেই হয়। মিলন উৎসবহিসেবে।
পাঁচ ভাই এর মধ্যে চার ভাইই বাড়ির বাইরে থাকে। চাকুরির কারনে। চার বোন সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। তাদেরও বাপের বাড়ি আসার সুযোগ নেই। সবার ভাটি এলাকায় বিয়ে হয়েছে। বাড়ি থেকে অনেক দূর,আসতে সারাদিন লেগে যায়। তাহেরপুর, দত্তখিলা কলমাকান্দা এসব এলাকায়। রাস্তাঘাট জঘন্য রকম খারাপ। তবু্ও তো বাপের আসতে সব মেয়েদের মন চায়।
বাবা গত অনেক দিন আগে। দাদারা আছে,মা আছে,ভাইপো,ভাই ঝিরা আছে দেখতে মন চায়। ভাই ঝিদেরও বিয়ে টিয়ে হয়ে তারা সংসারী। ওরা সবাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক। ছুটিছাটা পেলে বাড়িতে আসে। ওরাও অনেক দূরের বাসিন্দা। সূদুর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওদের ঘর-গৃহস্থালী। চাকুরী। সবাই এসেছে। গমগম করছে বাড়ি, সব প্রিয়মুখ।
আমি মিতা। যেতে পারিনি। শ্বাশুড়ি মা আমার কাছে থাকে,ওজন জনিত সমস্যা। কোত্থাও যাওয়া হয় না আমার। কোন ছেলে মেয়ে নেই।শ্বাশুড়ি মা -ই এখন সন্তানের মতো পুরো সময় ধরে থাকে। তাকে আগলে রাখতে হয়। সেবা যত্ন করতে হয়। স্বভাবতই মনটা ভালো নেই।
শ্বাশুড়ি মায়ের মন তো আরও খারাপ। তিনি পূজোয় যেতে পারলেন না। সবাই এসেছে দেখতে পারলেন না। কান্নাকাটি করে। সারাক্ষণ। বুঝিয়ে সমঝিয়ে রাখি।
এর মধ্যেই ননদ দুজন চলে এসেছে বাসায়। বাড়ি থেকে আমার বাসা দেড় ঘন্টা, ট্রেনে। ওরা এসে বলল,বৌদি দাদাকে নিয়ে তুমি আজ চলে যাও আমরা মা কে দেখব।
মনে মনে বলি, বেশতো ভালোই হলো। কতদিন ঘর থেকে বের হইনি। বিপুল আমার স্বামী। সে রিটায়ার্ড। দু বছর হলো। দেশে,দেশের বাইরে সে একাই ঘুরে বেড়ায়। আমাকে একা রেখে চলে যায়,নানা ছুতো ধরে। সে নিয়ে আমি ওকে যে কিছু বলি না তা নয়। ও কিছু বলে না।
অবশেষে আমরা রওনা হলাম। সেদিনই ফিরব বলে।
পৌঁছে গেলাম পূজোর আগেই। উপোষ রেখে যেতে পারিনি। জলের ঘাটতি হলে
শরীর খারাপ করে। বিপুল নাস্তিক।সে পূজো পার্বনের আয়োজনে মিলনে থাকলেও তাকে দু কথা মন্ত্র বলে অঞ্জলি দিতে দেখিনি। দেওয়াতেও পারিনি। সবটাই মনের ব্যাপার। বাকিটা তার ভেতরের গোপন ভক্তি বিশ্বাস।
আমি নাস্তিক ও নই আস্তিকও নই। মন চাইলে খেলি নয়তো নিজেই নিজের মতো কথা বলি। না ঘরকা না ঘাটকা।
ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বাড়ি। বড় রাস্তা পেরিয়ে ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ছোট গলির মতো রাস্তা। আমরা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছি।এটুকু পেরুলেই বিশাল পুকুর। সেই পুকুরের বাম পাশের পাড় ধরেই যেতে হয়। পাড়ের কোনায় বিশাল এক বেল গাছ। তারপর আম কাঠাল লিচু খেজুর সুপারি, সজনে গাছ শিল করই সেগুন গাছের সারির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি,বাড়ি থেকে সকলে একে একে সকলে বেরিয়ে আসছে। সবাই খুব খুশি।
বাইর বাড়িতে মন্দির। অনেকটা জায়গা জুড়ে আরতি এবং পূজোর নৈবেদ্য তৈরীর আঙিনা।বাঁশের বেড়া। এর দশ হাত দূরে পুকুর। যেতে যেতে কুশল বিনিময় করে মায়ের মন্দিরে প্রণাম করে বাড়িতে গেলাম। খুব ভাল্লাগছে আমার।
বাকিটা সময় কখন কিভাবে চলে গেলো টের পাইনি। এখন ফেরা পালা। বিকেল পাঁচটা বাজে। জা-এরা খুব পীড়াপীড়ি করছে থাকতে,আমারও ইচ্ছে কিন্তু,,,
বিপুল রাজি না,কারণ বোনেরা আসছে,
এতদিন পরে তাদের একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে। অগত্যা বিপুলের মন চেয়ে চলে এলাম। রাতে আর কিছু করিনি।
সকালে রান্না বান্না হলে ওরা খেয়ে চলে গেল।
__________________
মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ডাক্তার বাসায় এসে দেখে গেলেন। অনেকগুলো টেস্ট দিলেন,সব নরমাল।
মানসিক শান্তির জন্য ও কিছু দিলেন না।
শুধু জল খেতে বললেন বেশি করে। মা জল একটু কমই খেতেন। যা হোক,জোর করে খাওয়াই।ডায়াবেটিস, প্রেসার ছিল আগে থেকেই। সেগুলো যেমন চলছিল তেমনই চলবে।
কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে মা'র তান্ডব তত বাড়তে থাকে। ভরা শীতকাল। যেহেতু বসতে পারেন না ওজন জনিত কারনে।
সবটাই করে দিতে হয়। এমন কি পায়খানা প্রসাবও করার সময় কাছে থাকতে হয়।অথচ সেই কি না রাত হলে বিকট মানসিকতা নিয়ে জেগে থাকে।
একদিন হঠাৎ শব্দে গিয়ে দেখি পুরো উলঙ্গ হয়ে সারা ঘরময় ঘুরছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মাঝরাত। বিপুলকে ডেকে
তুললাম,বললাম,তুমি দাঁড়িয়ে থাক।আমার ভয় করছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম মা আপনি এই অবস্থা কেন? শীতের মধ্যে? কাপড় কোথায়। কম্বল কোথায়? আমি দেখছি সব কিছু গুছিয়ে জড় করে রেখেছে খাটের এক কোনায়।
মা বলে,ওরা আমাকে নিতে চায়। আমি বললাম কারা? মা বলে কারা তুমি জান না? আমারে খালি ঘোরায়। এই যে, দেখ ওরা দাঁড়ায়া আছে! তারা পাঁচ জন।
আমি বলি,কই? আমি তো কাউকে দেখি না। মা বলে, তুমি দেখ না? জান?ওরা আমারে মারে।
মা' য়ের কথা বলা, চোখে তাকানোর ভঙ্গি কোনটাই সুস্থ নয়। ভয়ে আমার সারা শরীর জমে আসছে। গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিতেও ভয় করছে।
সেদিন কোনমতে কাপড় না দিয়ে উপর থেকে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে ঘরে আগুন জ্বেলে রেখেছি। ছোট বেলা শুনতাম আগুন দেখে ওরা চলে যায়। টোটকা যা মনে এসছে তা দিয়ে জল ছড়া দিয়ে আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছি।
সেদিন চুপচাপ চলে গেছে। কিন্তু তারপরের ঘটনা আরো ভয়াবহ। টোটকায় কোন কাজ হয় না। আমি ভয় পেয়ে ননদকে আনালাম। ননদ টি মায়ের অবস্থা দেখে কেঁদে কেটে অস্থির,ও যে আরো বেশি ভয় পায়। কোনমতেই এসব সমস্যা যাচ্ছে না। পালা করে রাত জাগি।
কিন্তু দেখা যায় যে সময়টাতে একটু অন্যমনস্ক বা তন্দ্রার মতো হলে ঠিক সে সময়টাতে সে তার কাজ করে ।
ওদিনেরও এক ঘটনা। রাত তখন দুটো বাজে মাকে গুছিয়ে জলটল খাইয়ে একটু ঘুমিয়েছি। রাত তিনটা। একটু পরেই ননদ ডাকছে। গিয়ে দেখলাম মা খাটের নীচে।
আমি যেন সচক্ষে ভূত দেখতে পাচ্ছি।ওই ঘরের সব এলোমেলো। যেন তান্ডব বয়ে গেছে। রাতেই ঘরের সব জিনিষ পত্র বের করে মা কে নীচে ঘুমানোর জায়গা করে দিই। কিন্তু সে নীচে ঘুমুবে না। কিছুতেই না।
আমি জিজ্ঞেস করি মা, এতো বড় বিছানা আপনি কি করে পড়ে গেলেন?
মা বলে ওরা সাতজন কোমর জলে খাড়ায়া আমারে টেনে নামালো। আমি বলি, আপনি ব্যথা পাননি? মা বলে না,ব্যথা পাইনি।আমি এতো না,না করলাম কে শুনে কার কথা আমাকে নামিয়েই ছাড়লো।
পরদিন খাট খুলে বাইরে রেখে দিল বিপুল।
ঘরে বিছানা ছাড়া কিছু নেই।
রাত হলেই যত ঝামেলা। দিন হলে মা এমন ঘুমায় যে মুখে খাবার নিয়েও ঘুমিয়ে পড়ে।
কয়েকদিন আগে ভর দুপুরে আমি রান্না চাপিয়েছি, হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলো,দৌড়ে গেলাম,বললাম, কি হয়েছে মা? বলে,একটা লোমশ হাত আমার মাথায় বুলাইতেছে। নানান কথা বলে,চলে আসি।
কোন বিরাম নেই। আমি যেন ভূতের সাথে পাল্লা দিয়ে দিন যাপন করছি।এখন দিনের বেলাতেও ঘরে আগুন ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে রাখি। কত শুনেছি তারা নাকি আগুন দেখে ভয় পায়। কিন্তু কোথায় কী?
এখন সমস্যা দাড়ালো অন্য। আমাকে একদম পছন্দ করছে না। দেখতেই পারে না। এমন সব কথা বকা বকি করে যা এযাবৎ শুনিনি,মা'র মুখে। তার ছেলে মেয়েরা শুনে লজ্জায় আমার সামনে আসে না। মাকে বুঝায়, তুমি এসব কি করছ? কি বলছ? মা বলে আমি জানিনা তো। আমি কি করি, কি বলি।
যতসব পুরনো আলাপ,করবে, সব বলবে,খুট খুট করে। যে আসে সবাইকে চেনে, আলাপ করে,হাসি ঠাট্টাও করে।
আমরা ভেবেছি মাথায় কোন সমস্যা। না,তাও নয়।অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো সব নরমাল। কারোর সাথে কথা বললে খুব ভেবে চিন্তে কথা বলেন। অনেক সময় জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলেন।
কিন্তু একটু আড়াল হলেই ঝরঝরে। খুব স্পষ্ট ভাষায় চণ্ডালিনী বকা ঝকা। একা তার কাছে যেতে সাহস হয় না।
রহস্যের কিনারা মিললো তখনই যখন জানতে পারলাম সারারাত ধরেই তিনি বসার জন্য চেষ্টা করতেন।
অথচ তিনি বসতেই পারেন না। হিপের কাছে ভেঙে গেলে যথার্থ চিকিৎসায় তিনি হাঁটতে পারতেন ওয়াকার নিয়ে। দিনরাত নক্সী কাঁথা সেলাতেন। বসে থেকে থেকে ওজন এতটাই বেড়ে যায় যে বসে থাকার ক্ষমতা হারিয়েছেন। কোন কথা শোনেন নি।
এখন তিনি ভাবেন বড় ছেলেটা বলেছিল,মা আমার জন্য একটা নক্সী কাঁথা সেলাই করে দাও। মনের গোপন ইচ্ছে, যে করেই হোক বসতে হবে।
________________
No comments:
Post a Comment