Saturday, 4 June 2022

শ্মশানবন্ধু... কৌস্তুভ দে সরকার


শ্মশানবন্ধু... 
কৌস্তুভ দে সরকার

দুপুর আড়াইটায় খবর এল, জীতেন বাবু আর নেই। রমেশ তখন স্কুলে। রমেশের স্ত্রী সরলা আর জীতেন বাবুর স্ত্রী রীণা একই স্কুলে চাকরি করে। সেই সুবাদে জীতেন বাবুর সাথে রমেশের পরিচয়। রাস্তায় দেখা হলে হাসি বা কুশল বিনিময় হতই। জীতেন বাবু অনেকদিন তাকে বলেছেন, "সময় করে একদিন আসুন না আমাদের বাড়িতে...।" সময় আর হয়ে ওঠেনি রমেশের। কিন্তু আজ সেই লোকটির মৃত্যু সংবাদ ওর মনকে উতলা করে তুলেছে। ব্যবহার এত ভালো ছিল। তাঁর শেষবেলায় অন্তত শ্মশানবন্ধু না হলে দুঃখটা থেকেই যাবে। স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে তাই দ্রুত বাইক চালিয়ে রমেশ পৌছে যায় নিকুঞ্জধামে। এখানে এদিনই প্রথম এল সে। এর আগে শুনেছে, শ্মশান হলেও জায়গাটা সুন্দর। সত্যিই তাই। একটা চিরশান্তি বিরাজ করছে এখানে। একদিকে চুল্লি, আরেকদিকে শ্মশানবন্ধুদের বসার ব্যবস্থা, খড়িঘর, পাশেই কালিমন্দির, রাজা হরিশ্চন্দ্র-শৈব্যার থেকে শুরু করে বাবা লোকনাথ, শিব, দুর্গা, মা-সারদা কার মূর্তি নেই এখানে। একদা এলাকার প্রতাপশালী জমিদার নিকুঞ্জবিহারী রায়ের নামেই এই শ্মশান। জমিদাতাও নিকুঞ্জবাবুই। সেই আমল থেকেই পাথরের মূর্তিগুলি আজ অক্ষত, অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে। শ্মশান কমিটি এই এলাকাটিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নও রাখে। কালি মন্দিরের মাথায় মাইকের চোঙ বাধা আছে। সেখান থেকে অল্প ভলিউমে পরীক্ষিৎ বালার বাউল গানের সুর ভেসে আসছে, ''হাতির দাঁতের পালঙ্ক তোর রইলো খালি পড়ে...।" এইসব দেখেশুনে মোটামুটি ভালো লাগলেও পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে গিয়ে বসতেই মনটা আর একটু ভারি হয়ে গেল ওর। ওখানে জীতেন বাবুর শ্মশানবন্ধু হয়ে আসা দুই ভাই সুজিত আর স্বপন বসে বসে এই জীবন-মরণ-উত্থান-পতন এসব নিয়ে নানারকম গল্প করছিল। রমেশও ওদের সেই গল্পে একটুআধটু যোগ দিয়ে দু'চারটে ছোটখাটো মন্তব্যও করছিল। সবমিলিয়ে আজ যথেষ্টই শোকাচ্ছন্ন সে। এরই মাঝে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দ্যাখে নেয় - বেলা কত হল। মোবাইলের চার্জটা ঠিক আছে কিনা। 
ওদিকে জীতেন বাবুর দাহ সংস্কারের কাজ প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছে।পাড়ার ছেলেরা ততক্ষণে চিতা সাজিয়েও ফেলেছে। জীতেন বাবুর ছেলেকে পুরোহিত স্নান করিয়ে এনে নানারকম বিধি নিয়ম পালন করাতে ব্যস্ত। এরপরই মুখাগ্নি হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা আস্ত শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ভাবতেই খারাপ লাগছে তার। ওই তো জ্বলে উঠলো চিতাকাঠ। সবাই এখন আরো ব্যস্ত, ঠিকমতো পুড়ছে কিনা, শ্মশানবন্ধুদের নাম -ঠিকানা লিখে নেওয়া এইসব নিয়ে। রমেশ কিন্তু জীতেনবাবুর এই নীরবভাবে পুড়ে যাওয়ার অন্যতম নীরব সাক্ষী। হঠাৎ তার কি মনে হল, পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে জীতেন বাবুর এই পুড়ে যাবার দৃশ্যটা সে মোবাইল ক্যামেরাবন্দী করে নিল। একটা মানুষের এই চিরবিদায়ের দৃশ্য করুণ ও মর্মান্তিক হলেও থাকনা অক্ষত সেই স্মৃতি। আগুনটা একসময় নিভে গেলে, সব ছাই হয়ে গেলে, তখন তো আর এই মানুষটাকে আর দেখা যাবে না। কেউ যদি সেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে দেখতে চায় সেই ছবি আর কোথায় পাবে? তাই তার মোবাইল  এই চরম সত্যের তাই ভিডিও রেকর্ডিংও করে রাখলো সে। 
দাহ শেষে শ্মশান থেকে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফিরে আসে রমেশ। সরলা ততক্ষণে বাড়ির বাইরে গরম জল, গামছা, নিমপাতা, আগুন আর একটা দা রেডি করে রেখেছে। বাইরের কলে স্নান সেরে ভেজা জামাকাপড়ে একটু আগুন সেঁকে, দা-এ এক কামড় বসিয়ে, নিমপাতা চিবিয়ে ঘরে ঢোকার নিয়ম। সবই তো হল। কিন্তু মোবাইল ফোনটাতো আর ধোওয়া যায় না। যাকগে, খুঁতখুঁতে মন নিয়েই ঘরে ঢুকে পড়ে সে। সরলা ততক্ষণে একবার এঘরে এসে চা দিয়ে চলে গেছে। রাতের রান্নাবাড়ি করছে সে। আর একটু পড়েই হয়তো ডাক দেবে ডাইনিং-এ। ঘরের লাইট নিভিয়ে চুপচাপ ঘরে বসে কিসব ভাবছিল রমেশ।  হঠাৎ তার মনে হল, একটু ভিডিও ক্লিপিংসটা খুলে একটু দেখা যাক। ফটোজ অপশনে গিয়ে সেটি খুলে দেখতেই চমকে ওঠে সে। একি। দাউদাউ সেই আগুনের ভেতর থেকে যেন বারবার ভেসে উঠছে জীতেনবাবুর মুখ। তার মোবাইলের স্ক্রিন জুড়েই সেই মুখ যেন বলতে চাইছে, "সময় করে একবার আসুন না আমাদের বাড়িতে...।" ভয়ে দোতলার জানলা থেকে এক্কেবারে বাইরে নীচে মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় রমেশ।

সেই রাত্রিতে -- ঊশ্রী মন্ডল


সেই রাত্রিতে
ঊশ্রী মন্ডল

আমি সাধারণ এক বাঙালি ঘরের মেয়ে ছিলাম- তারপর বৌ হলাম,স্বাধীনতা বলে কিছুই ছিলো না,বরাবর পরেই ইচ্ছেতেই বেঁচেছিলাম- এখনও বাঁচছি ; জীবনের অনেকটা দিন পার করে দিলাম | পানাগড়ে চাকরি নেই,ছেলে ও স্বামী দুজনেই কলকাতায় চলে গেছে চাকরি নিয়ে, ওখানেই  ঘরভাড়া করে থাকে, মাসে দুইবার ওদের কাছে যাই, আমি একা এখন এই ঘরের চৌকিদারি করি l 
       অফুরন্ত সময়,কী করি ; তাই লিখতে শুরু করে দিলাম, মনের ভিতর যা ঘোরাফেরা করছিলো , আমার অভিজ্ঞতা, আমার দেখা,শোনা সকল কিছুই l ফেসবুকের বন্ধুরা বলে, আমি নাকি মোটামুটি ভালোই লিখি, একটা নতুন ট্রেন্ড হয়েছে, গ্ৰুপ l ওখানে নিজের সৃষ্টি ছেড়ে দাও, নানান জন তোমার লেখা পড়বে, মন্তব্য করবে, আমিও খুশি খুশি মনে লিখতাম আর দিতাম l  
     এক গ্রূপের কর্মকর্তা বলে, ' সামান্য কিছু পয়সা নিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের লেখা ছাপাতে পারি, কেননা আমাদের কবিতাকে কেও ছাপার নেই l আমরা যখন থাকবো না তখন আমাদের একটা স্মৃতি তো থেকে যাবে' l মনে মনে লোভ হলো, সামান্যই তো পয়সা লাগবে, দি একটা কবিতা,120/- টাকা করেই তো দিতে হবে l স্বামীর ও ছেলের পকেট মেরে যা জোগাড় করতে পেরেছিলাম, তা দিয়ে দিলাম 1
       কবিতা ছাপা হওয়ার কারণে ,কাগজে কলমে কবি হলাম ; ওই গ্ৰুপের কর্মকর্তা বলল,'কলকাতায় আসুন, এসে বই নিয়ে যান' l ভীষণ আগ্রহ হলো, কেমন হয় কবি সম্মেলন,তাই ওদের সম্মতি জানিয়ে দিলাম l স্বামী ও ছেলেকে বললে,নাকচ করে দেবে তাই ওদের না জানিয়েই সাহিত্য সভায় উপস্থিত হলাম l
      অনুষ্ঠান শুরু হলো অনেক দেরিতে, বাঙালির অনুষ্ঠান তো,নিয়মানুবর্তিতা রক্তে নেই, আসলে আমরা বোধহয় ভীষণ আলসি l যাইহোক, অনুষ্ঠান শুরু তো হলো, থামতেই চায় না, বড়ো বড়ো বক্তৃতা অধৈর্য করে তুলছিলো, স্টেজে উঠলেই নিজেরা নিজেদের খুব পন্ডিত মনে করে l
ঘড়ির কাঁটা ঠিক টিক করে এগিয়ে চলেছে, যে উদ্দেশ্যে এসেছি তা সম্পাদন হচ্ছে না l লাজলজ্জা ছেড়ে পরিচিত কর্মকর্তাকে বললাম, 'এবার আমায় ফিরতে হবে, অনুমতি করুন' l জানি না উনি কী বুঝলেন, আমার প্রকাশিত(একটাই কবিতা তাতে ছিলো )কবিতার বই, একটা মেমেন্টো ও সার্টিফিকেট আর একটা খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন, আমি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম l

    কলকাতার রাস্তাঘাট ভালো চিনি না, একে ওকে জিজ্ঞাসা করে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম l ট্রেন আর আসে না, কী যে করি,  যদিও এই অঞ্চলেই স্বামী ও সন্তান আছে, তবুও যেতে পারছি না, যেটুকু স্বাধীনতা পেয়েছি তা নিমেষেই হারিয়ে যাবে,তাই চুপচাপ বসে পড়লাম ;এমন সময় একটা লোকাল ট্রেন এলো,চড়ে বসলাম l
ঝুকুর ঝুকুর করে চলছে আর প্রত্যেক স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে,অবশেষে বর্ধমানে এসে পৌছালাম l 
ঘড়ির কাঁটা পোনে একটায় ছুঁই ছুঁই, আর কোনো ট্রেন নেই, সব চলে গেছে ; রাতটা এখানেই কাটানোর জন্য তোড়জোড় করতে লাগলাম l এমন সময় শুনি তুফান আসছে,লেটে চলছিল l বাস্ উঠে বসলাম, ঝুক ঝুক না করে ঝকর ঝকর করে চলতে লাগলাম,বেশী দেরী লাগলো না, পানাগড়ে জলদি জলদি পৌঁছে গেলাম l
    নেমে দেখি,কেও কোথাও নেই, টিমটিমা আলোয় স্টেশনটাও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে l বাড়ি যেতে গেলে এখন পয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটতে হবে, রাত আড়াইটায় কোনো টোটোওয়ালাও বসে নেই l যদি সাহস করে হাঁটিও ঠিক পৌঁছে যাবো জানি , কিন্তু পাড়ার কুকুরগুলো ভীষণ বদমাস ভীষণ চিল্লামিল্লি করে, ঘিরে ধরে যেন কামড়ে দেবে ,সাহস হলো না, বসে গেলাম বেঞ্চিতে l

             এমন সময় দেখি শুকুর মিঞা যাচ্ছে, আমি ছুটে গিয়ে বললাম, ভাই আপনি কী বাড়ি ফিরছেন? সে কয়,হাঁ দিদি, তা আপনি এতো রাত্রে এখানে কেন? আমি আমার আপবিতি শুনিয়ে বললাম, আমি যদি আপনার সাথে চলি আপনার আপত্তি নেই তো, আসলে একা একা যেতে ভীষণ ভয় করছে, সাহস পাচ্ছি না l সে বলে, আমার কোনো আপত্তি নেই, কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হয়ে যাবে, চলেন l
       আমরা হাঁটা দিলাম, হাঁটতে হাঁটতে নানান গল্প জুড়ে দিয়েছি ; একসময় হটাৎ খেয়াল করলাম কবরখানার পাশে এসে গেছি l বললাম,' এদিকে এলেন কেন ভাই ', ও বলে,'এটাই শর্টকাট রাস্তা এদিক দিয়ে চলেন তাড়াতাড়ি আমাদের পাড়ায় পৌঁছে যাবো' , এই বলে কবরখানার গেট ঠেলে ভিতরের রাস্তা বরাবর হাঁটতে শুরু করে দিলো, আমি একটু ইতস্তত করে ওর পিছু নিলাম l

        কিছুদূর যাবার পর দেখি কয়েকজন লোক, মাটি খুঁড়ছে, হয়তো কেও মারা গেছে, তাকে কবর দেবে ; হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের পাশে এসে গেলাম, দেখলাম আমাদেই পাড়ার লোক সবাই l ঐ তো কালু, ও খুব রসিক, চোখেমুখে রসিকতা ছড়িয়ে থাকে, আজ দেখি,ও দুঃখী এবং বিমর্ষ l কালুকে জিজ্ঞাসা করলাম,' কে মারা গেলো রে ?' সে বলে, ' শুকুর মিঞা, মারা গেছে সেই দুপুরে, তাকেই কবর দেবো এখানে আমরা 'l
আমি বলি, ' আমাকে কী বুৰ্বক ভেবেছিস নাকি, এতটা রাস্তা ওর সাথেই তো এলাম,এই তো আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ' l আমার কথা শুনে সবাই চমকে উঠে বলে,' কোথায় '? পাশে দেখি শুকুর তো নেই,কোথায় গেলো?এতক্ষন তো তার সাথেই আসছিলাম, ভয়ে হাত পা হিম হয়ে গেলো, এতক্ষন কী ভূতের সাথে আসছিলাম ?
এবার যখন সামনের দিকে তাকাই দেখি কেও কোথাও নেই, এতক্ষন যারা মাটি খুঁড়ছিলো তারা গেলো কোথায় ? কয়েকটা শিয়াল আমাকে চমকিয়ে দিয়ে হুয়া হুয়া করে ডেকে উঠল, নির্জন কবরখানা আমাকে দেখে যেন ফ্যাকফেকিয়ে হেসে উঠলো l বুঝতে পারলাম আজ অনেকগুলো ভুতের পাল্লায় পড়েছি, প্রানপণে ছুট লাগালাম , পড়তে পড়তে মরতে মরতে অবশেষে বাড়ি এসে পৌছালাম l
সকালে উঠে পাশের বাড়ির ফাল্গুনীকে সব জানালাম, সে শুনে বলে, ' সে কী ? কী সর্বনাশ, জানো দিদি আজকে দুপুরে আমাদের পাড়ার কয়েকজন লোক ট্রেন থেকে নেমে লাইনের উপর দিয়ে আসছিলো, এমন সময় একটা সুপার ফাস্ট ট্রেন ওদের পিষে দিয়ে যায়, ওদের মধ্যে কালু আর শুকুর মিঞাও ছিলো l লাসগুলো এখনও আসেনি, মর্গে পোস্টমর্টেমের জন্য পরে আছে, ওদের বাড়ির লোকজন খুব কাঁদছিলো, আহারে! কতগুলো জোয়ান মানুষ একটু ভুলের জন্য চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলো l এজন্যেই ওভারব্রিজের উপর দিয়েই চলাচল করতে হয় l তুমি বোধহয় ওদেরই ভূত দেখেছিলে, খুব বাঁচান বেঁচেছো, এমন করে রাতবেরেতে বাইরে থেকোনা ' l
        আমি ভাবছি, আচ্ছা বদমাস তো কালু,বেটা নিজে যে মরেছে তা জানালো না, ভালো রসিক ও অভিনেতা বটে , মরার পরও রসিকতা যায় নি,আমার সাথে রসিকতা করে গেলো l মনে মনে ওর খুঁড়ে দণ্ডবৎ জানালাম l 
সেই দিন থেকে নাক কান মূলেছি, আর দূরবর্তী কোনো সাহিত্য সম্মেলনে যাবো না,আর যদিও যাই স্বামী ও সন্তানকে জানিয়েই যাবো l এই স্মৃতি আমূল বদলিয়ে দিয়েছে আমাকে,আজও আমায় ভয় দেখায় l

নীলা এসেছিল--ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়


নীলা এসেছিল--
ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়

বাইরে জ্যোৎস্না ছিল। ভেতরে অন্ধকার। নাইট ল্যাম্প ইচ্ছে করে জ্বালায় নি অপূর্ব। রাত এখন দুটো। মাঝে মাঝে আকাশ ঢেকে যাচ্ছিল মেঘে। ঘরের ভেতরে একেবারে ঠাসা অন্ধকার। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি।

-আমি নীলা। শুনতে পাচ্ছ?

ফিসফিসে কন্ঠস্বরে প্রথমটা উল্লসিত হলেও পরে চমকে উঠেছিল অপূর্ব। নীলা কী করে--  

-এতদিন পরে? কোথায় ছিলে নীলা? তুমি নাকি-

নীলা নাকি তার মামার বাড়িতে চলে গিয়েছিল।

-সে অনেক কথা। এখানে হবে না। চল বাইরে যাই। বীরুদের সেই স্থলপদ্ম গাছের নিচে যে শান বাঁধানো বেদিটা আছে। যার ওপর আমরা কথা বলতুম।

-এখন? এত রাতে? বৃষ্টি পড়ছে দেখছ কেমন?

আবার সেই খিলখিলে হাসি।

-বৃষ্টি তো ঝিরঝিরে। তুমি বড় ভালবাসতে এমন বৃষ্টিতে ভিজতে। বলতে বৃষ্টি নয় যেন এক ঝাঁক কবিতা। কত রাত আমরা এমন ভিজেছি বল তো?

-কিন্তু সে তো-

আবার খিলখিলে হাসি, তোমার বৌ তো এখন নেই? আর ভাবছ কেন? আমিই তো তোমার বৌ হতুম নাকি?

তা ঠিক। কিন্তু হয় নি। বিয়ের দিন শুভদৃষ্টির সময় চোখ থেকে পানপাতা সরাতে নীলার বদলে শীলাকে দেখে অপূর্বর চোখে লেগেছিল বিদ্যুতের ঝলক। মালাবদল ভুলে গিয়ে রগড়াচ্ছিল তার দুই চোখ।

-কিন্তু আজ এতদিন পরে-

 নীলা বলল, এস না বেরিয়ে পড়ি। সেই আগের মত-

বেরিয়ে পড়ল অপূর্ব। সত্যি ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা যেন তাদের আদর করছে এমন ভাল লাগল। অপূর্বর কেমন একটা মনে হচ্ছিল। বলল, বিয়ের দিন-

হ্যাঁ সেদিন। অপূর্বর আশীর্বাদও হয়ে গিয়েছিল শীলার সঙ্গে। শুভদৃষ্টির সময় কেবল জানতে পেরেছিল অপূর্ব। জেনে চমকে উঠেছিল। নীলার সৎ বোন ছিল শীলা।

নীলা শুধু বলল, আমার বোন শীলাও তো সুন্দরী।

অপূর্ব সুন্দরকে ভালবাসে নি। সে ভালবেসেছিল নীলাকে।  

-শীলা একদিন দেখে ফেলেছিল আমাদের। আমাকে বলল সেও ভালবাসে তোমাকে আর তোমার সঙ্গে বিয়ে না হলে সে সুইসাইড করবে। আর তাই-

-আর তাই তুমি ভয়ে পালিয়ে গেলে?

অপূর্ব বেশ বিরক্ত হল। অন্ধকারে সেটা টের পেল না নীলা। বলল, আমি চলে গেলুম মামার বাড়ি। শুধু সেই দিনের জন্যে। আর তোমার বাবা মাকে আমার বাবা মা শীলাকেই দেখিয়ে দিল আমার বদলে।

মনে পড়ে গেল অপূর্বর। মেয়ে দেখার দিনে তার বাবা মা বলেছিল মেয়ে দেখতে যেতে। সে বলেছিল, আমার আর দেখার কি আছে বল?

মা হেসে বলেছিল, ওর সঙ্গে মেয়ের যে প্রেম গো। আমি দেখি নি কিন্তু অপুর মুখে শুনেছি সে বেশ সুন্দরী।

-কিন্তু তুমি সেদিন-

-এত আস্তে আস্তে গেলে হবে নাকি? সে কথায় কান না দিয়ে নীলা তার হাত ধরে টানল।

-আরে এত রাতে আবার কোথায় যাব?

-দেখতেই পাবে।

অন্ধকারে ছায়ার মত একটা রিক্সা এসে হাজির। চালকের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। মাথায় আবার একটা পলিথিন বাঁধা। সে হয়ত ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা সহ্য করতে পারছে না।

-ওঠ। আমরা যাই।

-কোথায়?

-দেখতে পারে।

নীলার পাশে এসে বসল অপূর্ব। বেশ আনন্দ হচ্ছে। কতদিন পরে পেয়েছে এক রোমান্টিক ছোঁয়া।

নীলা এসেছে সেই স্থলপদ্ম গাছের গাছে। চাঁদের জ্যোৎস্না ঝরে পড়েছে তার ওপর। কেমন মায়াময় করে তুলেছে জায়গাটা।

নীলা রিক্সা থেকে নেমে সটান চলে গেল শান বাঁধানো বেদির কাছে। বলল, কই তুমি যে বললে অপূর্ব এখানেই আসবে?

অপূর্ব তখনও রিক্সায় বসেছিল। সে অবাক হয়ে ভাবছিল সে এত কাছে তবু নীলা কেন তার খোঁজ করছে? সে বলল, এই তো আমি তোমার সামনে নীলা।

বেশ জোরেই তো বলেছিল সে কিন্তু তার গলার আওয়াজ সে নিজেই শুনতে পেল না কেন? এতক্ষণ তার পাশে বসে রিক্সায় এল। এখন তার উপস্থিতিও টের পাচ্ছে না? নীলার কি এত ভুলো মন হয়ে গেল?

রিক্সাওলা সমীর বলল, আসবে। চুপ করে বসুন।

তার গলাটা কেমন ঘড়ঘড় করছে। কোথা থেকে সে একটা কোদাল বার করেছে। তারপর কোপাতে শুরু করেছে সামনের জমিটা। ভ্রূ কুঁচকেছে নীলার। মাটি খুঁড়ছে কেন সমীর?

সমীরের ঘড়ঘড়ে উত্তরটা শুনতে পেল না অপূর্ব।

এমন সময় আবার আকাশে মেঘ জমছে। চারিদিক মুহূর্তে একেবারে আলকাতরার পোঁচ লাগিয়ে দিল কে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা ঝর ঝর করে পড়তে লাগল।

-নীলা চলে এস রিক্সায়। বৃষ্টিটা বেশ বেড়েছে।

সে চেঁচাচ্ছে কিন্তু আওয়াজ ঢেকে যাচ্ছে বৃষ্টির তোড়ে। এদিকে গাঢ় আঁধারে কোথাও দেখা যাচ্ছে না নীলাকে। বৃষ্টির ছাট সহ্য করতে না পেরে সামনের পলিথিনের ঢাকনাটা নামিয়ে দিল অপূর্ব।

এ তো মহা ফাঁপরে পড়ল সে। নীলা না নিয়ে এলে সে তো দিব্বি উপভোগ করতে পারত এমন বৃষ্টিঝরা রাতটাকে মজা আর আনন্দে। যত সব পাগলামি।

প্রচন্ড হাওয়ার দাপটে সামনের পলিথিনের ঢাকনা এলোমেলো উড়তে লাগল। কড় কড় করে বাজ পড়ল একটা। নজর গেল সমীর যেখানে মাটি খুঁড়ছিল সেদিকে।

এমন সময় আবার জোরে বাজ পড়ল। গর্তটা কত গভীর তাই দেখছে অপূর্ব। তার গভীরে কে দাঁড়িয়ে আছে? ওপরে তোলার কাকুতি মিনতি করছে সমীরের কাছে। কিন্তু সমীর তাতে কান না দিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি ভরাট করেই যাচ্ছে।

একটা কঙ্কাল। বীভৎস করোটি আর সাদা হাড়।

শুধু পরণের পোশাক দেখে চিনতে পারছে নীলাকে সে। নাহলে-

ভোরে একগাদা বুটের আওয়াজের সঙ্গেই ডোরবেল। পুলিশ এসেছে তার বৌ শীলার খোঁজে। তার বাবা মা মানে অপূর্বর শ্বশুর আর শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অপূর্ব বলল, শীলা তো সেখানেই-

সেখানে পাওয়া যায় নি তাকে।

কতগুলো কুকুরে খুঁড়ে খুঁড়ে হাড়গুলো বার করেছে। নীলার হাড়। শীলা চেয়েছিল অপূর্বকে কিন্তু নীলা রাজি হয় নি। তার সৎ মা, সৎ বোন আর নিজের বাবা ষড়যন্ত্র করে তাকে খুন করেছিল।

গভীর রাতে সমীরকে দিয়ে ভুলিয়ে তাকে অপূর্বর সঙ্গে বিয়ে দেবার লোভ দেখিয়ে এই স্থলপদ্ম গাছের নিচে মাথায় লাঠি মেরে খুন করে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিল। সেও ছিল এমন এক বাদল ঝরা আবার চাঁদনি রাত।

মিশরের মমি--সান্ত্বনা চ্যাটার্জী


মিশরের মমি--
সান্ত্বনা চ্যাটার্জী

সকাল থেকে নাগাড়ে বৃস্টি পড়ছে, আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, মাঝে মাঝ, বিদ্যুৎ চমকে যাচ্ছে, কিছু পরেই সাকরেদ মেঘ ডাকা ডাকি করছে। আমরা রবিদার বাড়িতে আড্ডা মারছি। মাসীমা মুড়ি আর গরম গরম তেলে  ভাজা, চা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

আমি বললাম রবিদা, তুমি তো ভূপর্যটক, কত জায়গার গল্প করো, তুমি কখোনো মিশরে গেছ?, পিরামিড আর মমি দেখেছ!

অবশ্যই, ওখানে না গেলে কি চলে ! মিশর বা ইজিপ্ট তো পর্যটকদের স্বর্গ।এত প্রাচীন শহর, পিরামিড,মমি, না দেখলে কিসের পর্যটক।জানিস তো পৃথিবীর  সাত টি বিস্ময় এর মধ্যে  পিরামিড একটি । কায়রোর  প্রান্তে গিজাতে (Giza) সব থেকে বড় পিরামিড এখোনো আছে। আমি একাই গেছিলাম ইজিপ্ট, 
তখন সেপ্টেম্বর ।আমি কায়রো তে একটি হোটেলে উঠেছিলাম।ছোটো ঘরোয়া পরিবেশ। আমার পাশের ঘরে একটি ফ্রেঞ্চ মেয়ে ছিল ,আইলিন।

চুমকি বলে উঠল, কেমন দেখতে ছিল! মেয়েলি প্রশ্ন ।

ভীষন সুন্দর আর মিষ্টি স্বভাব, অনেক গল্প করতাম, আমার কাছে ভারতের কথা শুনতে চাইত, আমিও
ফ্রান্সের অনেক কথা জানতে চাইতাম।

কি ভাষায় কথা বলতে তোমরা  !
আইলিন ভাঙা ভাঙা ইংরাজী বলতো। আমিও তাই।বলেছিল,  আহরন বা আরন  নামে একটি ইজিপ্সিয়ান এর সংগে আলাপ হয়েছিল বছর দুই আগে, তখন ই তাদের মধ্যে একটা আকর্ষণ তৈরী হয়।ওদের ব্যাপারটা অনেকটা হিন্দি সিনেমার মতন। 

মানে দুজনের দুজনকে ভালো লাগে, মেলামেশা করে ক্রমশ বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিনত হয় ।দুজনেই বলে যে যদি দূরে গিয়েও ওদের ভালোবাসব বজায় থাকে তবেই বিয়ে করার কথা ভাববে।আইলিন তখন আর্ট কলেজে , দু বছর লাগবে আরো শেষ হতে।  


খোকন বলে, তার মানে দূরে  গিয়েও.....


হ্যাঁ তাই দুজনে ঠিক করেছিল তার পরেই দুজনে বিয়ে পাকা করবে। জানিস বোধ হয় ইজিপ্টের প্রধান ধর্ম ইসলাম। আইলিন খৃস্টান ছিল। মিশরের লোকেরা নাকি ভীষণ গোঁড়া। আহরন খুব কট্টর মুসলিম পরিবারের ছেলে, তাই সে জানত তার পরিবার হয়ত এ বিয়েতে মত দেবে না। আহরনের বিয়ে আগে থেকেই ঠিক করেছিল তার বাবা মা এক সুন্দরী স্বজাতীয় মেয়ের সংগে। সে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভেঙে নিজের মর্জি মতন বিয়ে করতে গেলে নিজের রোজগার বাজাতে হবে ।সে তখন ইজিপ্টের এক নাম করা সংস্থার হয়ে প্রাচীন স্থাপত্য খনন এবং গবেষনা কাজে লিপ্ত ছিল! তার কাজে কর্তৃপক্ষ খুব সন্তুষ্ট এবং দুবছরের জন্য একটি বিশেষ কাজে নিযুক্ত করে । আহরনচেয়েছিল সে কাজটি যথাযথ কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করে তবেই বিয়ে করবে।

ইজিপ্টের লোকেদের বিশ্বাস মানুষ আর পশু  মরে যাবার পরে আবার জন্মায়। তাই বড় লোকেরা অনেক টাকা রেখে যেতো তার শরীর মমি করবার জন্য। যাদের পয়সা কড় কম তারা বালির নিচে রেখে দিত মৃত দেহ। যখন আবার জন্মাবে তখন যেন পুরানো শরীরটা খুঁজে পায়।

প্রথম প্রথম দুজনার নেট এ অনেক কথা হোতো। ক্রমশই যোগাযোগ কম হয়ে এল ! কারন দুজনেই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত থাকত। আহরন জানিয়েছিল সে অত্যন্ত বিশেষ কাজে ব্যস্ত , এ কাজের সময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে কথা হবে। তা প্রায় মাস ছয়েক আগে। কিন্তু এখনো কোনো খবর পাচ্ছেন, তাই নিজেই এসেছে আহরনের খোঁজে।আইলিন বলল যদি আহরন বিয়ে করতে ইচ্ছুক না হয় তাহলে ফ্রান্স ফিরে যাবে।আইলিনেরকরুন মুখ আর চোখে জল দেখে আমার মনে হল তাকে আমার আহরন কে খোঁজার ব্যাপারে আমার সাহায্য করা উচিত।
সে যাই হোক  প্রথম দিন আমরা এখানকার প্রাচীন স্থাপত্য , পিরামিড, ধ্বংস স্তুপ এ সব নিয়ে অনেক ঘাঁটা ঘাঁটি করলাম।আইলিনে আর আহরন এর চ্যাট রেকর্ড সে যেই যাদের কাছে শেষে কাজ করত তাদের অফিসে গেলাম।তারা প্রথমত আমরা বিদেশী বলে কোনো কথাই বলতে চাইছিল না। শেষে অনেক অনুরোধ উপরোধ করার পর জানাল যে আহরন সেফ মুস্তাফা খুব একটা গুরুত্ব পূর্ন গবেষণায় নিয়োজিত
হয়েছিল কিন্তু  গত চার মাস যাবৎ কোনো খবর নেই।তার অধীনস্থ কর্মচারীরা প্রধানত মজদুর সবাই ফিরে এসেছে । ওদের কথামত অনেক বার সেখানে লোক পাঠান হয়েছিল কিন্তু আহরনের কোনো হদিশ
মেলেনি। আমরা পথ নির্দেশিকা নিয়ে এলাম ।

 পরের দিন আমরা তিন জনে হোটেলের কাছে একটা  অনেক পুরানো একটা  পিরামিডের  ধ্বংসাবশেষ দেখতে গেছিলাম।  শুনেছিলাম  এটি কখনোই কোনো পিরামিড ছিল না। যা ছিল তা একটি বহু পুরানো আধ ভাঙ্গা বাড়ি । শোনা যায় এটি এক নিষ্ঠুর ফারাওয়ের বাসস্থান , যেখানে তিনি বহু দাস দাসীকে অত্যাচার করতেন। তাদের হাত পা মোটা লোহার শিকল দিয়ে ফেলে রাখা হতো মৃত্যুর জন্য। স্থানীয় মানুষ বলে রাতের বেলায় এখানে ঝন ঝন করে শিকলের আওয়াজ হয়, আর মানুষের যন্ত্রনায় গোঙানির শব্দ পাওয়া যেত। 

ইদানীং তা বন্ধ হয়েছে, কারন পুলিশ এসে ভিতরে গিয়ে শিকল বাঁধা মানুষের কঙ্কাল পেয়ছে তাদের নিয়ম মাফিক সংস্কার ও করা হয়েছে। যাই হোক আমরা সূর্য অস্ত যাবার পরে সেখানে গেছিলাম। বেশ একটা গা ছমছমে পরিস্থিতি । 
আমাদের  সরকারী ছাড় পত্র দেখে ভিতরে যেতে দিল ।সেখানে সেদিন কিছু পেলাম না যাতে করে 
তার কোনো চিন্তা খুঁজে পাই।

মনমরা হয়ে সেদিন ফিরে এলাম।কিন্তু লক্ষ করলাম যে দুটো সন্দেহ জনক লোক আমাদের অনুসরণ করছে। ব্যাপারটা কি!

সেদিন রাতেই আমরা একটি গাড়ি ঠিক করে রেখে ছিলাম, বালির জন্য একটি ট্র্যাক্টর বা জীপ জাতীয় গাড়ি । এবার যে পিরামিড এর সন্ধানে গেলাম সেটি বেশ দূর হোটেল থেকে। এখানেও 
প্রবেশ দ্বারে এক দারোয়ান গোছের লোক টুলে বসেছিল। আমাদের ভিতরে যেতে তো দিল, কিন্তু বার বার সাবধান করে দিল যেন নিচে যাবার চেষ্টা না করি। কেন জানতে চাইলে বলল তোমাদের যা বলা হয়েছে  তাই করো।। 

ভিতরটা আরো ভূতুড়ে আলো অন্ধকার মতন। আমরা জানতাম এখানেই কাজ করত আহরন। মাটির তলার চেম্বার এই যাব আমরা কিন্তু সে কথা জানাই নি দারোয়ান কে।ঘোরানো সিঁড়ির দিয়ে অনেকটা নীচে নামতে হল।সেখানে বেশ কিছু বেদী দেখলাম। ও গুলো যে প্রাচীন কালের কিছু মমি সেটা বোঝা যাচ্ছিল ।মোট ছটি মমি দেখলাম, শেষ বেদীর কাছা কাছি গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমাদের দুজনের ই বুক ধক ধক করা শুরু করল। শেষের মমিটা বেদির কাঁচ ভেঙে উঠে বসেছে, চড় চড় করে তার গায়ের উপরের আস্তরণ টা মট মট করে ভেঙে যাচ্ছে   মৃত মমিটা পিছনে আবছা অন্ধকারে আর কেউ নয় আমাদের আহরন।

গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা এখান থেকে পালাও, না হলে তোমরা ও আমার মতন মমি হয়ে যাবে।এখানে যত জীবন্ত মানুষ নেমেছে তারা কেউ আর বেঁচে নেই। রাতের বেলা য় যেই আসবে মমির হাতে মরবে।

আমি আইলিনের হাত ধরে টেনে ছুটতে শুরু করলাম ঘোরানো সিঁড়ির কাছে এসে হেল্প হেল্প করে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে উঠবার যত চেষ্টা করি আইলিন কেবল বলছে, আহরন, আমরা ওকে কি করে ফেলে যেতে পারি।আহরন নিশ্চয় কোনো বিপদে আছে।চল রবি আমরা ফিরে যাই ওর কাছে। আমাদের চ্যাঁচামেচি তে দারোয়ান চলে এসেছে। হাতে আলো নিয়ে ভয়ানক রাগ করতে লাগল। তোমরা এতো নিচে কেন এসেছ, আর কি করে এলে, এখানে কোনো পর্যটক কে আসতে দেওয়া হয় না। তা আবার
একা একা স্থানীয় গাইড ছাড়া। 

আমার তখন কোনো কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা করার মতন অবস্থা ছিল না। আইলিন পাথরের মতন হয়ে গেছে। গাড়ি হোটেলে এলে আমি আইলিনকে নিয়ে ওদের রিসেপশানে বসে জল দিতে বললাম। ওখানেই লোকেরা খুব অতিথি বৎসল।  আমাদের জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছে। সব শোনার পরে বলল তোমাদের গাড়ি কোথায় আর তোমাদের বন্ধুর ছবি দেখাতে পারবে ?

আইলিন তার মোবাইলে আহরনের দুবছর আগের ছবি দেখালো। ছবি দেখে সবাই বলল তোমরা খুব ভাগ্যবান, নিচের ঘরে আজ পর্যন্ত যে গেছে আর ফেরেনি।যার ছবি দেখালে ওর নাম আহরন শেফ মুস্তাফা।।এখানে প্রাচীন পিরামিড নিয়ে গবেষনা করত।মাস ছয়েক আগে নিচে যায় গবেষনার কাজে, কিন্তু বেঁচে ফেরেনি।পরের দিন সকালে মৃতদেহ পাওয়া যায় ছ নম্বর বেদীর উপর।

আমরা দুজনেই বলে উঠলাম তা কি করে, আহরনের কাজের যায়গায় তো সেকথা জানায় নি।

আল্লার দিব্বি বলছি  সে মারা গেছে । অফিস থেকে কেন জানায় নি বলতে পারব না, হয়তো আপনাদের বিশ্বাস করে নি।।

আহরন আইলিন কে খুব ভালোবাসত নিশ্চয় তাই আপনাদের  দুজনকে দেখা দিতে  নিজের মৃত্যু স্থানে নিয়ে গেছিল। আপনি ছিলেন বলে আহরন দুজনকে নিয়ে গেছিল। সবাই তো বলে  সত্যিকারের ভালোবাসা প্রেমিক আলবিদা না বলে যেতে দেয় না।আপনি ম্যাডামের খেয়াল রাখুন, একটু সুস্থ হলে ফিরে যাবেন।।


সিগারেট--তাপসকিরণ রায়


সিগারেট--

                                                                  তাপসকিরণ রায় 

আমি তখন সবে মাত্র মান্ডলার না গ্রাম না শহর ধরণের একটা জাগায় সরকারি স্তরের চাকরিতে জয়েন করেছি। মান্ডলা মধ্যপ্রদেশের এক অরণ্য প্রধান জেলা। এখানে দিনে চহল-পহল লাগা থাকলেও সামান্য রাতেই নির্জনতায় ঘিরে যায়। একটু দূরে হলেও এখানকার চারপাশ জঙ্গলাকীর্ণ। এতটা ইন্টেরিয়রে যাবার ইচ্ছে না থাকলেও আর্থিক দিক বিবেচনা করে আমায় এখানে আসতেই হয়েছিল। ছোট একটা তৌশীল অফিসের চাকরি করি--আমার বাসস্থান থেকে আধ কিলোমিটার দূরে হবে। জাগাটা অনেকটা খাপছাড়া ধরনের। কোন রকম প্ল্যান ছাড়াই এখানের ঘর বাড়ি রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছে।

মোটামুটি পছন্দ মত ভাড়ায় একটা বাড়ি পেয়ে গিয়ে ছিলাম। ঘর থেকে প্রায় দু শ মিটার দূরত্বে হালকা বনের সীমানা শুরু হয়ে গেছে। পাশেই ছিল একটা ছোট নদী। গ্রীষ্মে হাঁটুজল, কোথাও কোথাও পায়ের পাতা ডোবা জল থেকে যায়। তবে বর্ষায় তার রূপ একেবারে পাল্টে যায়--ফুলে ফেঁপে কলকল ছলছল শব্দ করতে করতে সে সশব্দে বয়ে যায়। ঘর থেকে সামান্য কিছুটা এগোলেই নদীর পুল। স্থানীয় লোকেরা এ পুল একেবারেই ব্যবহার করে না। এই পুল নিয়েই স্থানীয়দের ভয় ভীতি জড়িয়ে আছে। কিসের ভয় বা ভয়ের কোন ঘটনার কথা কেউ বলতে পারে না।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,  আপনারা এ পুল দিয়ে যাতায়াত করেন না     কেন ?

তাদের উত্তর ছিল--আমরা বলতে পারবো না, তবে শুনেছি, এ পুলের বড় বদনাম আছে। অনেকে ভয় পেয়েছে--রাতে পুলের ওপর পা রাখলেই নাকি গা ভারী ভারী হয়ে যায়। শরীর ছমছম করে ওঠে। ব্যাস, স্থানীয় লোকের কাছ থেকে এই পর্যন্ত ভয়ের ইতিহাস শুনে ছিলাম। আমি আমার নিজের মন থেকে, ফুঁ, বলে অবিশ্বাসে  ভয় ভাবনা দূরে সরিয়ে দিয়ে ছিলাম।    

ঘর থেকে অফিসের দূরত্ব আধ কিলো মিটার থেকে একটু বেশী হবে। আমি কিন্তু নির্ভয় ছিলাম, দিব্বি পুল পার করে শর্টকাট পথ ধরে প্রতিদিন পৌঁছে যেতাম আমার অফিসে। পুলের বদনামের কথা বেমালুম ভুলেও গিয়ে ছিলাম । দিনের বেলায় রোজ যাই আসি—মনে মনে ভাবি--এতে ভয়ের আছেটা কি ? শুরুতে দু একজন আমায় সতর্ক বার্তা দিয়েছিল বটে, কিন্তু আমি ছিলাম ডোন্ট কেয়ার--

একদিন হঠাৎই অফিসে ইমার্জেন্সী কাজ এসে পড়ল। বস আমাকে নাইটেও কাজে আসতে হবে বললেন। এই প্রথম বার রাতে আমায় অফিস করতে যেতে হবে। ঘর থেকে বেরিয়ে অভ্যাস মত নদীর ধারে পুল পার করবো বলে এসে দাঁড়ালাম। না, মনে ভয় ছিল না। রোজই তো পারাপার করছি পুল, তবে আর ভয় কিসের ? রাত বলে ? মনে মনে ধুস, বলে পুলে পা রাখলাম। অন্য দিনের মত আমি রাতেও স্বাভাবিক পা ফেলে ফেলে পুল পার হচ্ছিলাম। আর কয়েক স্টেপ দিলেই পুল পার হয়ে যাব, ঠিক এমনি সময় আমি পেছন থেকে স্পষ্ট একটা ডাক শুনতে পেলাম, কেউ যেন বেশ গভীর আওয়াজ নিয়ে আমায় ডাক দিয়ে উঠলো, কি আশ্চর্য আমার নাম ধরেই কেউ যেন আমায় ডাক দিলো,  এই প্রদীপ, শোন--

আমি চকিত হলাম, মনে মনে ভেবে নিলাম, না, আমার নাম জানার মত এখানে কেউ আছে বলে ত আমার মনে পড়ছে না !

পেছন ফিরলাম, দেখলাম একটা মাঝ বয়সী লোকের চেহারা--এই আমার থেকে হাত আট দশ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার চেহারা তত স্পষ্ট নয়, বাইরের আলো আঁধার মাখানো, সাধারণ সাদামাটা পোশাক পরা। ওর হাত দুটির ওপর আমার নজর এলো, দেখলাম গাঢ় ছায়ার মত তার দুটি হাত। ঈষৎ হাত বাড়িয়ে সে আমায় বলল, এই, একটা সিগারেট দাও তো--

গলার আওয়াজ বেশ ভারী। তার হাত দুটি তার শরীরের তুলনায় বেশ লম্বা বলে মনে হচ্ছিল। আমি স্মোক করি না, তখনও কিছু ভাবতে পারছিলাম না, খানিক চুপ থেকে বললাম, আমার কাছে ত সিগারেট নেই--

লোকটা যেন হতাশ হয়ে পড়ল। অফিসে যাবার তাড়নায় হবে বোধহয় আমি  আবার অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। আর দু পা বাড়িয়ে পুল পার করতে যাচ্ছি, ঠিক সেই মুহূর্তে বেশ জোর গলায় পেছন থেকে লোকটা বলে উঠলো, প্রদীপ, কালকে মনে করে আমার জন্যে সিগারেট আনিস কিন্তু ! এবার আমি চমকে উঠলাম, ওর গলার আওয়াজে আমার বুকের মাঝখানটা যেন একবার কেঁপে উঠলো।  

--মনে করে অনবি, কালকে এমনি সময় পুলের ওপরে এসে আমায় দিয়ে যাস, কঠোর ও গম্ভীর সুরে লোকটা আবার বলে উঠল।

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম, এবার ভয়ে আমার মুখ থেকে কথা সরছিল না। দ্রুত পায়ে অফিসে গিয়ে পৌঁছলাম। অফিসে আমনের সঙ্গে ইতিমধ্যে আমার বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। তাকে সব কথা খুলে বললাম। সে বলল, ওই পুলের বদনামের কথা অনেকবার শুনেছি, তুই আর ওই পথে আসিস না।

পরদিন আমনকে আমার ঘরে ডাকলাম। ওকে জানিয়ে ছিলাম যে আজ রাতে আমি ওই লোকটার হাতে সিগারেট তুলে দেব। ও ভয়ে ভয়ে বলে ছিল, কি পাগলামি করছিস ? তবু আমার ইচ্ছা বেশ দৃঢ় ছিল। রাতে আমনকে পুল থেকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে আমি ধীরে ধীরে এসে পুলের ওপর চড়লাম। তখন মাঝ পুলে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে এপাশ ওপাশ মুখ ফিরিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি তবু মুখ তুলে বলে উঠলাম, আপনার সিগারেট এনেছি--আমি হাত বাড়িয়ে একটা নয়, গোটা এক প্যাকেট সিগারেট শূন্যে তুলে ধরলাম--

যেন দূর থেকে মহাকালের গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো, হ্যাঁ, প্রদীপ, এই যে আমি--কেউ আমার হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিলো বুঝতে পারলাম। পরক্ষণেই প্রকাণ্ড একটা কালো অবয়ব আমার সামনে ভেসে উঠলো, ছায়াটা আমার মাথার ওপর ঝুঁকে ছিল। আমি চমকে উঠলাম। হঠাৎ তার পায়ের দিকে আমার চোখ পড়ল। একি দেখছি আমি, লোকটার পায়ের পাতা পেছন দিকে কেন ? তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ে গেলো ভুতের পায়ের পাতা নাকি সামনের দিকে না থেকে পেছন দিকে হয়। তবে কি—ঠিক তক্ষণই আমার ভাবনাকে ছেদ করে লোকটার মুখ থেকে উচ্চারিত হল, থ্যাংকস--

তারপর আর কিছুই নেই। 

কুমিরডাঙা-- তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী


কুমিরডাঙা
তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

আজ বেশ কয়েকমাস পর ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরছে অনুপ। তবে অন্যবার ফেরার সময় মনে যে খুশির উত্তেজনাটা থাকে, এবারে সেরকমটা নেই। মাসখানেক আগে তার তিনজন বন্ধু সমর, প্রবাল আর রূপম এক বৃষ্টিবাদলার দিনে বজ্রাহত হয়ে মারা গেছে। মনটা খারাপ হয়ে আছে সেইসব ভেবে, বড়োই কাছের বন্ধু ছিল তারা। ছোটো থেকে একসাথে খেলাধুলো করতে করতে বড়ো হওয়া, গল্পগুজব, প্রত্যেকবার গ্রামে আসার পর একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া খুব করে মনে পড়ছিল ফিরতে ফিরতে। ট্রেন থেকে নেমে যেন আরো বেশি করে মনখারাপ লাগছে। বর্ষার দিনে তাস খেলে ফেরার পথেই এই বিপত্তি। অনুপকে বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাও করেছিল সে বাড়ি আসতে চায় কিনা, বন্ধুদের শেষ বিদায় জানানোর জন্য। কিন্তু ও নিজেই আসতে চায়নি, ওদের ওভাবে কিছুতেই দেখতে পারবে না সে।

হাঁটতে হাঁটতে ভাঙা বাড়িটার কাছে চলে এসেছে, রাস্তার পাশেই পড়ে। এখানেই তাস খেলতে এসেছিল ওরা, কতো ছোটবেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। আজ হঠাৎ করেই অনুপের মনে পড়ে যায় কানাইয়ের কথা। কানাই ওদের চাইতে তিন চার বছরের ছোটো ছিল, ওদের সাথেই খেলত। খুব ভালোবাসতো কুমিরডাঙা খেলতে। ছোটবেলায় ওরাও খেলত, কিন্তু বড়ো হতে হতে ক্রিকেট ফুটবলে ধীরে ধীরে ওরা হারিয়ে যেতে থাকে। কানাইয়ের কিন্তু এসবের পাশাপাশি সেই একইরকম ভালোবাসা রয়ে গিয়েছিল কুমিরডাঙার প্রতি।

একদিন অনুপের বাবা ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, "হ্যাঁরে, তোরা খেলতে গিয়ে কানাইকে নিস না কেন?"

"ধুর, ও খালি মেয়েদের মতো কুমিরডাঙা খেলবে। আমাদের ভালো লাগে না। আমার ফুটবল ক্রিকেট খেলি।" অনুপের অকপট জবাব।

"তা তোরা আগে তোদের খেলা খেলে নিয়ে ওর সাথে একটু খেলে নিবি কুমিরডাঙা।"

"না আমরা ওসব মেয়েছেলে খেলা খেলি না।"

একটা বিরাশি শিক্কার চড় এসে পড়ে অনুপের গালে।
"ছি ছি, মুখের এমন ভাষা! দূর হয়ে যা এক্ষুনি, বেরো।"

চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অনুপ। ভাঙা বাড়িটার এককোণে বসে কানাইয়ের উপর রাগে ফুঁসতে থাকে। ও-ই গিয়ে বাবাকে নালিশ করেছে। ক্লাস টেনে তারা পড়ে এখন, কুমিরডাঙা খেলবে!

বিকালে বন্ধুদের সাথে খেলার সময় যথারীতি কানাই এলো, অনুপ দেখেও দেখলো না ওকে। বেশ অনেকক্ষণ পর অনুপ এসে বললো, "কিরে কানাই, কুমিরডাঙা খেলবি?"

বাকি বন্ধুরা অবাক হয়ে যায়। যেখানে কুমিরডাঙা খেলার কথা শুনলে অনুপ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, সে-ই নিজে থেকে খেলবে বলছে!

কানাইয়ের চোখেমুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস, "তোমরা খেলবে আমার সঙ্গে? তোমরা তো আমাকে খেলতেই নাও না।"

"হ্যাঁ খেলবো, তবে নীচে নয়। ছাদে চল।"

বাড়িটা তিনতলা। পুরোনো দিনের বাড়ি, ছাদগুলো উঁচু উঁচু। সেই অর্থে বাড়িটার তিনতলার উচ্চতা বেশ ভালই বলা চলে। এদিক ওদিক ভাঙাচোরা, পলেস্তারা খসে পড়লেও সিঁড়িগুলো মোটামুটি অক্ষতই রয়েছে। সেইমতো ছাদে উঠে খেলতে থাকে ওরা। হঠাৎ করেই একধাক্কায় কানাইকে নীচে ফেলে দেয় অনুপ। হতভম্ব হয়ে যায় সমর, প্রবাল আর রূপম।

গভীর রাতে যখন কানাইয়ের মৃতদেহ সৎকারের জন্য গ্রামের শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো, অন্যান্যদের সঙ্গে অনুপের বাবাও কানাইয়ের শেষযাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন। অনুপ তখন নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা। কুমিরডাঙা খেলার ঝামেলা থেকে সে এখন চিরতরে মুক্ত। কানাইয়ের এহেন পরিণতির জন্য ওর বিশেষ কোনো দুঃখ হয়নি কখনও, সেই অর্থে কানাই ওর বন্ধু ছিল না। তবে এমনটা মন থেকে করতেও চায়নি ও, রাগের মাথায় করে ফেলেছে। বন্ধুদেরও বুঝিয়েছিল তেমনটা। তারাও ঘটনাটা কাউকে কোনদিনও জানায়নি।

পুরোনো অনেক কথা মনের মধ্যে ভিড় করে এসেছিল। সম্বিত ফিরতেই অবাক হয়ে যায় অনুপ। হেঁটেই চলেছে কখন থেকে, এতখানি রাস্তা পার হয়ে এলো। পাশে আবার সেই ভাঙ্গা বাড়িটাই এসে পড়েছে। গ্রামে এরকম অনেকগুলো বাড়ি ছিল বলে তো মনে পড়ছে না। রাস্তার আলোগুলো স্তিমিত হয়ে জ্বলছে। এতো অন্ধকারের রাতে সামনের বেশিদূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। রাতের শেষ ট্রেন ধরেছিল বলে লোকজনও নেই রাস্তায়।

শ্রান্ত পায়ে এগোতে থাকে অনুপ। বেশ খানিকটা যেতেই ভয় পেয়ে যায়। যাওয়ার পথে আবার সেই ভাঙ্গা বাড়িটা এসে পড়েছে যেটা একটু আগেই অতিক্রম করে এলো। এই নিয়ে মনে হয় চার পাঁচ বার বাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়া হয়ে গেলো ওর। কিন্তু আবার সেই ঘুরেফিরে আসছে, যেন এই বাড়ির চৌহদ্দি থেকে ও বেরোতে পারবে না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে দেখে জল শেষ। অসাবধানতাবশত হাত থেকে পড়ে যায় বোতলটা। অনুপ নীচু হয় সেটা কুড়োনোর জন্য।

হঠাৎই পেছন থেকে কেউ একজন এসে অনুপের গলাটা জড়িয়ে ধরে। কিশোরসুলভ স্বরে বলে ওঠে, "কতো বড়ো হয়ে গেছো অনুপদা। দেখো না, আমি সেই ছোটোটিই রয়ে গেলাম। আর বড়ো হতে পারলাম না। এসো না একটা খেলা খেলি!"

ভয়ার্ত অনুপ অনুভব করতে পারে তার গলার বাঁধন ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে। দম আটকে আসছে তার। পাশ থেকে ফিসফিস করে কানের কাছে কেউ যেন বলে ওঠে, "কুমির তোমার জলকে নেমেছি.."

(সমাপ্ত)

***লেখক পরিচিতি :
আমি তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী। ছোটো থেকে ভূতপ্রেত, রূপকথার রাজ্যে ছিল আমার অগাধ বিচরণ। বই ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। এছাড়া মজার গল্প, সামাজিক গল্প, রহস্য গল্পও বিশেষ প্রিয় ছিল। ছোটবেলাটা কেটে গেলো সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রচিত গল্পের ছায়ায় ছায়ায়। কিশোরী বেলার সঙ্গী হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবীরা। স্কুলে পড়াকালীন লেখালেখির দিকে গভীর আগ্রহের সঙ্গে ঝুঁকেছিলাম। ইচ্ছে ছিল অনেক গল্প লিখবো। তার সাথেই আবার ইচ্ছে হলো আঁকিয়ে হতে। সময়ের চাকা গড়গড়িয়ে শেষপর্যন্ত হয়ে গেলাম অঙ্কের দিদিমণি। অনেকদিন পর নতুন করে ফিরে এলাম লেখালেখির ভালোলাগার জগতে। সকলে ভালো থাকুন, এভাবেই পাশে থাকুন। শুভেচ্ছা রইলো।

হায়াত // বদরুদ্দোজা শেখু


হায়াত // বদরুদ্দোজা শেখু
----------------------------------------

এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট। টরন্টো থেকে লন্ডন ফ্রাঙ্কফুর্ট হ'য়ে দিল্লী।

অজন্তা বাহিওয়ালের বাবা গুরগাঁওয়ের পৈতৃক বাড়িতে দেহত্যাগ করেছে। সকাল ৯৹০০ টার সময় সে এস-টি-ডি কলে খবর পেয়েছে। বাবাকে শেষ দেখার জন্য তাকে গুরগাঁওয়ে যেতেই হবে। তাই সে মরিয়া  হ'য়ে  সকাল থেকে সবার আগের এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে টিকিট পাওয়ার জন্য হন্যে হ'য়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু ওই  ফ্লাইটে কোনো সীট খালি নাই। সে কেঁদে কেটে  বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সীর কাছে দরবার করলো। তার  অবস্থা বুঝালো। তারপরের  সরাসরি দিল্লী ফ্লাইট দু' দিন পরে। তাতে যেতে গেলে অনেক দেরী হ'য়ে যাবে। সে তার বাবাকে দেখতে পাবে না। আরো অনেক ফ্লাইট আছে, ঘুরে যাবে, সেগুলোরও একই অবস্থা। সে টরন্টোতে একটা বহুজাতিক সংস্থাতে বড়ো দায়িত্বে আছে। সে চেষ্টার ত্রুটি করতে ছাড়লো না।
সে সরাসরি এয়ারপোর্টে লাগেজ নিয়ে চ'লে এলো আর রিসেপশনে তার জরুরী প্রয়োজন বুঝিয়ে, সেদিনের এয়ার ইন্ডিয়ার  টরন্টো নিউ দিল্লী  ফ্লাইটে একটা টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করলো।
কিন্তু শিকে ছিঁড়লো না। রিসেপশন থেকে তাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললো , যদি কেউ নির্ধারিত সময়ে টার্ন-আপ না করে, তাহলে তার কেসটা সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করা হবে।
কিন্তু না ! রাত ৭৹০০ টার সময় পার হ'য়ে গেলে রিসেপশন জানালো, সরি ম্যাম ,, সবাই টার্ন-আপ করেছে। আর কোনো আশা নাই। আপনি  অন্য ফ্লাইটের চেষ্টা করুন।

যখন প্লেন ছেড়ে গেলো, সে লাউঞ্জে কান্নায় ভেঙে পড়লো। পাশে একজন সাদা জোব্বা পরা দেবদূতের মতো লোক ব'সেছিল, সে তার কান্না দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। কাছে এসে জানতে চাইলো, তার এমন কান্নার কারণ কি?
সমব্যথী লোকটাকে পেয়ে অজন্তা কাঁদতে কাঁদতে তাকে ঘটনাটা বললো।
দেবদূতের মতো লোকটি বললো, হতাশ হবেন না,মা। একটা দুয়ার বন্ধ হলেও আল্লাহ্ শত শত দুয়ার খুলে রেখেছেন। যা হয়েছে তা হয়তো আপনার ভালোর জন্যই হয়েছে। ওপরওয়ালার উপর বিশ্বাস রাখুন। সে লাউঞ্জে বসেই থাকলো।

মাঝরাতের পরে আচমকা ঘোষণা হলো, টরন্টো থেকে নিউ দিল্লীগামী বোয়িং এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি মাঝ আটলান্টিক মহাসাগরের উপর প্রচন্ড বিস্ফোরণে ভেঙে পড়েছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে,সব যাত্রী ও বিমানকর্মীরা মারা গেছেন।

অজন্তা কি ভুল শুনছে ? না, তার মাথা খারাপ হ'য়ে গেছে ! সে আবারো ঘোষণাটি মন দিয়ে শুনলো আর একটা ভয়াল বৈদ্যুতিক শিহরণ তার গোটা শরীরে খেলে গেলো !   নিয়তির নেহাৎ বদান্যতায় সে জানেপ্রাণে বেঁচে গেছে ! কিছুক্ষণ আগেও যে বিমানটিতে একটা সীট পাওয়ার জন্য সে এতো ঝুলোঝুলি করছিলো তা যেন হঠাৎ  আতঙ্ক আর সীমাহীন আনন্দের যুগপৎ প্রতিক্রিয়ায় বদল হ'য়ে গেলো। সে চেঁচিয়ে উঠলো, ও ভগবান ! তোমার অশেষ কৃপায় আমি বেঁচে গেছি ! বেঁচে আছি !
দেবদূতের মতো লোকটি প্রশ্ন করলো, এই বিমানটাতেই আপনার যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো ,না ?
অজন্তা পাগলের মতো তাকে জড়িয়ে ধ'রে বললো, বাবা, আপনার কথাই ফ'লে গেলো ! আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন ! শুকরিয়া ! কে কাকে শুকরিয়া জানাবে ?  দেবদূত লোকটি বললো, মা, উপরওয়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।হায়াত মউতের মালিক আল্লাহ্। আপনার হায়াত বেড়ে গেছে। অজন্তা ধপাস ক'রে ব'সে প'ড়ে ভাবতে লাগলো,সে এখনও বেঁচে আছে ! তার  আরো দরজা  খোলা আছে  !
দেবদূত লোকটি বললো, মা, আজ আপনি বাড়ি ফিরে যান। মন সুস্থ হলে যাবেন।লোকটি বোর্ডিং পাসের দিকে এগিয়ে চললো । অজন্তা অপসৃয়মান দেবদূতের পানে মূহ্যমান হ’য়ে তাকিয়ে রইলো


------------------------------
কবির নাম-- বদরুদ্দোজা শেখু 
ঠিকানা-- 18 নিরুপমা দেবী রোড ,  বাইলেন 12 ,
        শহর+পোঃ-  বহরমপুর ,   জেলা--মুর্শিদাবাদ, 
        PIN -742101
         পঃ বঙ্গ , ভারত ।  
        হো• অ্যাপ  নং +91 9609882748
       e-mail :  mdbadaruddoza@gmail.com
----------------------
* সাথে আমার ছবি পাঠালাম

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...