Monday, 6 June 2022

ভ্যালেন্টাইন ডে----অদিতি ঘটক


ভ্যালেন্টাইন ডে
----অদিতি ঘটক

"আমি যে কি বলে তোকে কৃতজ্ঞতা জানাবো ভেবে পাচ্ছি না। আমি তো মরমে মরে ছিলাম এই ভেবে যে, আমাদের সেই ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বটা এইভাবে নষ্ট হয়ে গেল বলে। তুই যে এত..দি..ন পর আমায় ডেকে কথা বলতে চাইলি আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দিলি তার জন্য তোকে ধন্যবাদ জানবার ভাষা নেই।
        অয়ন, আমি সত্যি বলছিরে, উষশীকে তোর থেকে কেড়ে নেবার অভিপ্রায় আমার কোনোদিনই ছিল না। আমি জানতামও না তুই ওকে ভালোবাসিস।
 তুই তো জানিস আমি উষশীকে টিউশনি পড়াই। আরো পাঁচজনকে যেমন পড়াই, তেমনই। টিউশনি পড়িয়েই তো আমার হাত খরচা ওঠে। তুই তো জানিস, আমাদের অবস্থা। পকেটমানি দেওয়ার মত ক্ষমতা বাবার আর কবে ছিল। বরাবর নিজেই টিউশনি করে আর স্কলারশীপের টাকায় পড়াশোনা এবং অন্যান্য সমস্ত প্রয়োজন মিটিয়েছি। তুই তো সব জানিস। তোর কাছে তো কোনো কিছুই লুকনো নেই। আমাদের বন্ধুত্ব তো কোনোদিন তেমন ছিল না রে। তুই তো এটাও জানিস, উষশীর মা নেই। জানিসই তো ও কেমন চাপা স্বভাবের মেয়ে। ওর সুবিধা অসুবিধার কথা কোনোদিনও মুখ ফুটে বলে না।       কলেজ ফেরত পড়াবার জন্য উষশীদের বাড়ি যেতেই সেদিন উষশীর শয্যাশায়ী বাবা আমার হাত চেপে ধরে উষশীর সব দায় দায়িত্ব আমায় সঁপে দিয়ে গেলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও কম হতচকিত হয়নি কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটার কথাও ফেলতে পারিনি রে---
বিশ্বাস কর, তবুও আমি উষশীকে আলাদা ভাবে জিগ্গেস করে ছিলাম। ওর আপত্তি আছে কিনা। স্বল্পভাষী উষশী দুদিকে মাথা নেড়ে না বলে তার সম্মতি জানিয়েছিল।
◆◆
 অয়ন ! মেল ট্রেন আসছে, লাইনের ধার থেকে সরে আয়। এবার তো আমার দিকে ফের। মুখ ঘুরিয়ে অন্তত একবার তাকা আমার দিকে। 
  আমি হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি-- যদি কোনো শাস্তি দিতে চাস আমি মাথা পেতে---  কথা শেষ হবার আগেই মেল ট্রেনটা স্টেশন কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কিছু বোঝার আগেই অয়ন ঝাঁপিয়ে পড়ল, রুদ্রেশও দৌড়ল অয়নকে বাঁচাতে-- কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। অয়ন লাইনের তলায়, রুদ্রেশ ট্রেনের গতির টানে নীচে। লাইনের পাশে একদম প্লাটফর্মের ধার ঘেঁষে পড়ে।
◆◆
এই চিত্রনাট্য যখন অভিনীত হচ্ছে তখন দুই বন্ধুকে অনুসরণ করে আসা আরও দুই বিশেষ বন্ধু উষশী ও  ঋষিতা হাতধরাধরি করে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে সব দেখছে--

 দুই বাল্যবন্ধুর থ্যাতলানো দেহ দেখে আর উষশীর মুখের অদ্ভুত প্রশান্তি দেখে ঋষিতার উষশীকে ধরে থাকা উষ্ণ মুঠোটা শীতল, শিথিল হয়ে খসে পড়ে। ঋষিতা স্টেশনের উল্টো দিকে দৌড়তে থাকে। 
 উষশীকে সে যতই ভালোবাসুক তবুও এই নৃশংস, অভিশপ্ত ভালোবাসা সে চায় না। এই নিষ্ঠুর প্রাপ্তি থেকে ঋষিতা অনেক দূরে পালাতে চায়। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেও বেশিদূর এগোতে পারেনা। এক ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়ে। কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন ওকে লাইনের উপর জোর টেনে আনে। অসম শক্তির লড়াই এ সে হেরে যায়। আর সেই সময়ই একটা থ্রু ট্রেন.... উষশীও এই এখানেই...। 

বলুন ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপনের এটা উপযুক্ত জায়গা কিনা। দেখুন রেল লাইনটা কেমন মুঠো মুঠো লাল রক্ত গোলাপ এ  সেজে---
◆◆
কি করছিলেন কি? মরবার শখ হয়েছে? দেখছেন না থ্রু ট্রেন। হাতটা ধরে টেনে না আনলে তো একেবারে..
--- না, মানে, চিঠি, আমন্ত্রণপত্র, এটা তো পরিত্যাক্ত স্টেশন, রক্তগোলাপ, ভ্যালেন্টাইন ডে ...
পরিত্যাক্ত! রক্তগোলাপ, ভ্যালেন্টাইন ডে! হাহাহা... এইবার আপনি...! হাহাহা.....
★★★★★★★★★★★★★★★★
 

***অদিতি ঘটক
 চুঁচুড়া
হুগলি

Sunday, 5 June 2022

নায়িকা-- শিখা মালিক


নায়িকা
শিখা মালিক 

নদী  থেকে কিছু টা দুরে দুর্গ টা অনেক পুরানো অনেক  লতাপাতা ঘেরা,কোথাও আবার দেওয়ালে গায়ে গায়ে বট গাছের চারা। অনেকটা মাঠ পেরিয়ে খেলতে আসে ন্যাপলা বুধো গবা হরি।
দুর্গের  ভিতর  অনেক ফলের গাছ ফল পেকে পড়ে থাকে কেউ কুড়ায় না।গবার দাদু বলে ওখানে  ভূত আছে তাই কেউ যায় না। গবারা চুপি চুপি দুপুর বেলা চলে আসে ,অনেক আম পড়ে আছে ওরা কুড়ায় আর খায় গবা বলে ন্যাপলা চল কে যেন গেট বন্ধ করছে ।ন্যাপলা বলে এখানে  কে আবার বন্ধ করবে   আবার একটা অদ্ভূত  শব্দ দুর্গের  ভিতর তখন ওরা ভয় পেয়ে দৌড়ে  পালিয়ে  আসে।
কদিন পড়ে গবারা দেখলো বড় বড় গাড়ি  এসেছে দুর্গ টার সামনে ,গবা বলে ও হরি দেখ  লাঠি লাগানো ওগুলো কি রে! হরি ফোকলা দাঁতে আম খেতে খেতে বলে ও তো ক্যামেরা ।একটা সুন্দর দেখতে মেয়ে মাথায় টুপি চোখে কালো চশমা হাঁটু পর্যন্ত  জামা পরে  গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে ন্যাপলাদের সামনে,ওদের জিজ্ঞাসা  করে -"তোদের কোথায়  বাড়ি"?।ন্যাপলা বলে উই মাঠ পেরিয়ে ,কিন্তু  তোমরা কি করতে এয়েচো গো? সুন্দরী  বলে - সিনেমার শুটিং  করতে ।গবা তখন বলে ওঠে ও দিদিমনি ওখানে ভূত আছে ।নায়িকা বলে আমরা ভূতের সিনেমা করতেই এসেছি,ন্যাপলা নাচতে থাকে কি মজা কি মজা সিনেমা হবে, সন্ধ্যা  হয় ছেলেরা গাঁয়ে ফিরে আসে দুর্গে তখন শুটিং  শুরু  হয়  ওরা যখন মেকাপ নিচ্ছিল তখন কয়েকজন মেয়ের হাসির শব্দ  শুনতে পায় ,সবাই খোঁজাখুঁজি করে কিন্তু  ওখানে সেরম কাউকে দেখতে পাওয়া যায় না ওরা শুটিংয়ে মন দেয় দোতলার জানালায় সাদা শাড়ি পরে খোলা চুলে নায়িকা গান গাইছে নীচে  বাগানে দাঁড়িয়ে  বিভোর হয়ে দেখছে রাজা বেশে এক অভিনেতা । আচমকা সব লাইট নিভে যায় একটা বিকট চিৎকার  কেউ যেন নায়িকাকে ধাক্কা  দিয়ে নীচে ফেলে দিল।রাতের অন্ধকারে  সব গাড়ি  অচেতন নায়িকাকে নিয়ে শহরে চলে গেল।দুর্গের  পাশে ক্যাম্পের সামনে একটা ব্যানার সাদা শাড়ি পরে খোলা চুলে নায়িকা হাসছে দেখে ন্যাপলারা শুধুই  কাঁদছে।

Saturday, 4 June 2022

ভূতের গল্প-- বহ্নি শিখা (উষা দত্ত)


ভূতের গল্প-- 
বহ্নি শিখা (উষা দত্ত)

শারদীয় মহানবমী। বাড়িতে পূজো হচ্ছে।
মিতার শ্বশুর বাড়ি। আগে হতো না।
বারোয়ারি হলেও প্রতি বছরই তাদের বাড়িতেই হয়। মিলন উৎসবহিসেবে। 
পাঁচ ভাই এর মধ্যে চার ভাইই বাড়ির বাইরে থাকে। চাকুরির কারনে। চার বোন সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। তাদেরও বাপের বাড়ি আসার সুযোগ নেই। সবার ভাটি এলাকায় বিয়ে হয়েছে। বাড়ি থেকে অনেক দূর,আসতে সারাদিন লেগে যায়। তাহেরপুর, দত্তখিলা কলমাকান্দা এসব এলাকায়। রাস্তাঘাট জঘন্য রকম খারাপ। তবু্ও তো বাপের আসতে সব মেয়েদের মন চায়। 
বাবা গত অনেক দিন আগে। দাদারা আছে,মা আছে,ভাইপো,ভাই ঝিরা আছে দেখতে মন চায়। ভাই ঝিদেরও বিয়ে টিয়ে হয়ে তারা সংসারী। ওরা সবাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক। ছুটিছাটা পেলে বাড়িতে আসে। ওরাও অনেক দূরের বাসিন্দা। সূদুর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওদের ঘর-গৃহস্থালী। চাকুরী। সবাই এসেছে। গমগম করছে বাড়ি, সব প্রিয়মুখ। 
আমি মিতা। যেতে পারিনি। শ্বাশুড়ি মা আমার কাছে থাকে,ওজন জনিত সমস্যা। কোত্থাও যাওয়া হয় না আমার। কোন ছেলে মেয়ে নেই।শ্বাশুড়ি মা -ই এখন সন্তানের মতো পুরো সময় ধরে থাকে। তাকে আগলে রাখতে হয়। সেবা যত্ন করতে হয়। স্বভাবতই মনটা ভালো নেই।
শ্বাশুড়ি মায়ের মন তো আরও খারাপ। তিনি পূজোয় যেতে পারলেন না। সবাই এসেছে দেখতে পারলেন না। কান্নাকাটি করে। সারাক্ষণ। বুঝিয়ে সমঝিয়ে রাখি।
এর মধ্যেই ননদ দুজন চলে এসেছে বাসায়। বাড়ি থেকে আমার বাসা দেড় ঘন্টা, ট্রেনে। ওরা এসে বলল,বৌদি দাদাকে নিয়ে তুমি আজ চলে যাও আমরা মা কে দেখব।
মনে মনে বলি, বেশতো ভালোই হলো। কতদিন ঘর থেকে বের হইনি। বিপুল আমার স্বামী। সে রিটায়ার্ড। দু বছর হলো। দেশে,দেশের বাইরে সে একাই ঘুরে বেড়ায়। আমাকে একা রেখে চলে যায়,নানা ছুতো ধরে। সে নিয়ে আমি ওকে যে কিছু বলি না তা নয়। ও কিছু বলে না।
অবশেষে আমরা রওনা হলাম। সেদিনই ফিরব বলে।
পৌঁছে গেলাম পূজোর আগেই। উপোষ  রেখে যেতে পারিনি। জলের ঘাটতি হলে
শরীর খারাপ করে। বিপুল নাস্তিক।সে পূজো পার্বনের আয়োজনে মিলনে থাকলেও তাকে দু কথা মন্ত্র বলে অঞ্জলি দিতে দেখিনি। দেওয়াতেও পারিনি। সবটাই মনের ব্যাপার। বাকিটা তার ভেতরের গোপন ভক্তি বিশ্বাস। 

 আমি নাস্তিক ও নই আস্তিকও নই। মন চাইলে খেলি নয়তো নিজেই নিজের মতো কথা বলি। না ঘরকা না ঘাটকা।
ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই  পৌঁছে গেলাম বাড়ি। বড় রাস্তা পেরিয়ে ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ছোট গলির মতো রাস্তা। আমরা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছি।এটুকু পেরুলেই বিশাল পুকুর। সেই পুকুরের বাম পাশের পাড় ধরেই যেতে হয়। পাড়ের কোনায় বিশাল এক বেল গাছ। তারপর আম কাঠাল লিচু খেজুর সুপারি, সজনে গাছ শিল করই সেগুন গাছের সারির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি,বাড়ি থেকে সকলে একে একে সকলে বেরিয়ে আসছে। সবাই খুব খুশি।
বাইর বাড়িতে মন্দির। অনেকটা জায়গা জুড়ে আরতি এবং পূজোর নৈবেদ্য তৈরীর আঙিনা।বাঁশের বেড়া। এর দশ হাত দূরে পুকুর। যেতে যেতে  কুশল বিনিময় করে মায়ের মন্দিরে প্রণাম করে বাড়িতে গেলাম। খুব ভাল্লাগছে আমার। 
বাকিটা সময় কখন কিভাবে চলে গেলো টের পাইনি। এখন ফেরা পালা। বিকেল পাঁচটা বাজে। জা-এরা খুব পীড়াপীড়ি করছে থাকতে,আমারও ইচ্ছে কিন্তু,,,  
বিপুল রাজি না,কারণ বোনেরা আসছে,
এতদিন পরে তাদের একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে। অগত্যা বিপুলের মন চেয়ে চলে এলাম। রাতে আর কিছু করিনি। 
সকালে রান্না বান্না হলে ওরা খেয়ে চলে গেল।
__________________

মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ডাক্তার বাসায় এসে দেখে গেলেন। অনেকগুলো টেস্ট দিলেন,সব নরমাল।

মানসিক শান্তির জন্য ও কিছু দিলেন না।
শুধু জল খেতে বললেন বেশি করে। মা জল একটু কমই খেতেন। যা হোক,জোর করে খাওয়াই।ডায়াবেটিস, প্রেসার ছিল আগে থেকেই। সেগুলো যেমন চলছিল তেমনই চলবে।

কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে মা'র তান্ডব তত বাড়তে থাকে। ভরা শীতকাল। যেহেতু বসতে পারেন না ওজন জনিত কারনে।
সবটাই করে দিতে হয়। এমন কি পায়খানা প্রসাবও করার সময় কাছে থাকতে হয়।অথচ সেই কি না রাত হলে বিকট মানসিকতা নিয়ে জেগে থাকে। 

একদিন হঠাৎ শব্দে গিয়ে দেখি পুরো উলঙ্গ হয়ে সারা ঘরময় ঘুরছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মাঝরাত। বিপুলকে ডেকে 
তুললাম,বললাম,তুমি দাঁড়িয়ে থাক।আমার ভয় করছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম মা আপনি এই অবস্থা কেন? শীতের মধ্যে? কাপড় কোথায়। কম্বল কোথায়? আমি দেখছি সব কিছু গুছিয়ে জড় করে রেখেছে খাটের এক কোনায়।
মা বলে,ওরা আমাকে নিতে চায়। আমি বললাম কারা? মা বলে কারা তুমি জান না?  আমারে খালি ঘোরায়। এই যে, দেখ ওরা দাঁড়ায়া আছে! তারা পাঁচ জন। 

আমি বলি,কই?  আমি তো কাউকে দেখি না। মা বলে, তুমি দেখ না? জান?ওরা  আমারে মারে। 

মা' য়ের কথা বলা, চোখে তাকানোর ভঙ্গি কোনটাই সুস্থ নয়। ভয়ে আমার সারা শরীর জমে আসছে। গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিতেও ভয় করছে। 

সেদিন কোনমতে কাপড় না দিয়ে উপর থেকে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে ঘরে আগুন জ্বেলে রেখেছি। ছোট বেলা শুনতাম আগুন দেখে ওরা চলে যায়। টোটকা যা মনে এসছে তা দিয়ে জল ছড়া দিয়ে আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছি।
সেদিন চুপচাপ চলে গেছে। কিন্তু তারপরের ঘটনা আরো ভয়াবহ। টোটকায় কোন কাজ হয় না। আমি ভয় পেয়ে ননদকে আনালাম। ননদ টি মায়ের অবস্থা দেখে কেঁদে কেটে অস্থির,ও যে  আরো বেশি ভয় পায়।  কোনমতেই  এসব সমস্যা যাচ্ছে না। পালা করে রাত জাগি।
কিন্তু দেখা যায় যে সময়টাতে একটু অন্যমনস্ক বা তন্দ্রার মতো হলে ঠিক সে সময়টাতে সে তার কাজ করে ।

ওদিনেরও এক ঘটনা। রাত তখন দুটো বাজে মাকে গুছিয়ে জলটল খাইয়ে একটু ঘুমিয়েছি।  রাত তিনটা। একটু পরেই ননদ ডাকছে। গিয়ে দেখলাম মা খাটের নীচে।

 আমি যেন সচক্ষে ভূত দেখতে পাচ্ছি।ওই ঘরের সব এলোমেলো।  যেন তান্ডব বয়ে গেছে। রাতেই ঘরের সব জিনিষ পত্র বের করে মা কে  নীচে ঘুমানোর জায়গা করে দিই। কিন্তু সে নীচে ঘুমুবে না। কিছুতেই না। 

আমি জিজ্ঞেস করি মা, এতো বড় বিছানা আপনি কি করে পড়ে গেলেন?
মা বলে ওরা সাতজন কোমর জলে খাড়ায়া  আমারে টেনে নামালো। আমি বলি, আপনি ব্যথা পাননি? মা বলে না,ব্যথা পাইনি।আমি এতো না,না করলাম কে শুনে কার কথা আমাকে নামিয়েই ছাড়লো।

পরদিন খাট খুলে বাইরে রেখে দিল বিপুল।
ঘরে বিছানা ছাড়া কিছু নেই। 
রাত হলেই যত ঝামেলা। দিন হলে মা এমন ঘুমায় যে মুখে খাবার নিয়েও ঘুমিয়ে পড়ে।
কয়েকদিন আগে ভর দুপুরে আমি রান্না চাপিয়েছি, হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলো,দৌড়ে গেলাম,বললাম, কি হয়েছে মা? বলে,একটা লোমশ হাত আমার মাথায় বুলাইতেছে। নানান কথা বলে,চলে আসি।

কোন বিরাম নেই। আমি যেন ভূতের সাথে পাল্লা দিয়ে দিন যাপন করছি।এখন দিনের বেলাতেও ঘরে আগুন ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে রাখি। কত শুনেছি তারা নাকি আগুন দেখে ভয় পায়। কিন্তু কোথায় কী?

এখন সমস্যা দাড়ালো অন্য। আমাকে একদম পছন্দ করছে না। দেখতেই পারে না। এমন সব কথা বকা বকি করে যা এযাবৎ শুনিনি,মা'র মুখে। তার ছেলে মেয়েরা শুনে লজ্জায় আমার সামনে আসে না। মাকে বুঝায়, তুমি এসব কি করছ? কি বলছ? মা বলে আমি জানিনা তো। আমি কি করি, কি বলি।

 যতসব পুরনো আলাপ,করবে, সব বলবে,খুট খুট করে। যে আসে সবাইকে চেনে, আলাপ করে,হাসি ঠাট্টাও করে।

 আমরা ভেবেছি মাথায় কোন সমস্যা। না,তাও নয়।অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো সব নরমাল। কারোর সাথে কথা বললে খুব ভেবে চিন্তে কথা বলেন। অনেক সময় জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলেন।

 কিন্তু একটু আড়াল হলেই ঝরঝরে। খুব স্পষ্ট ভাষায় চণ্ডালিনী বকা ঝকা। একা তার কাছে যেতে সাহস হয় না।
রহস্যের কিনারা মিললো তখনই যখন জানতে পারলাম সারারাত  ধরেই তিনি বসার জন্য চেষ্টা করতেন। 

অথচ তিনি বসতেই পারেন না। হিপের কাছে ভেঙে গেলে যথার্থ চিকিৎসায় তিনি হাঁটতে পারতেন ওয়াকার নিয়ে। দিনরাত নক্সী কাঁথা সেলাতেন। বসে থেকে থেকে ওজন এতটাই বেড়ে যায় যে বসে থাকার ক্ষমতা হারিয়েছেন। কোন কথা শোনেন নি।

এখন তিনি ভাবেন বড় ছেলেটা বলেছিল,মা আমার জন্য একটা নক্সী কাঁথা সেলাই করে দাও। মনের গোপন ইচ্ছে, যে করেই হোক বসতে হবে।
________________

পুনরাবৃত্তি--প্রেরণা বড়াল


পুনরাবৃত্তি
--প্রেরণা বড়াল 

সঞ্জয়দের ঘর থেকে সমরদের ঘর বাই কার ঘন্টা চারেকের রাস্তা। 
প্রায় দশটা নাগাদ বেরিয়েছে। ঘরে ফিরতে কমপক্ষে দেড়টা- দুটো বেজে যাবে সমরের । তার থেকে বেশি ও হতেপারে।সেই সকাল থেকে হসপিটাল, মর্গ,শ্মশান,এই সব করতেই এতো টা দেরী। বেশ ক্লান্ত সমর।
কি আর করা যায়। বন্ধুকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া, ওর পাশে থাকা টা তো প্রয়োজন। সঞ্জয়ের বোন শুধু সুন্দর নয়, অপূর্ব সুন্দরী ছিল।  আর সেই সংগে ছিল প্রচণ্ড সাহসী ও অহংকারী। তার অন্ত এতো ভয়ংকর হবে ভাবাই যায় না। মুখটা এসিডে পুড়ে - এমনি বীভৎস দেখাচ্ছিল তা বর্ণনার অতীত। গালের মাংস যেন খসে পড়ছে। নাকের হাড় পর্যন্ত ঝলসে গেছে। চোখের সাদা অংশ টুকু ছাড়া কিছু ছিল না। মুখের ঠোঁট ছাড়া দাঁত গুলি- না, আর ভাবতে পারছে না সমর। 
হঠাৎ সমরের মনে হল কেউ গাড়ি থামাতে বলছে। একটু এগোতেই- হা,ঠিক দেখেছে সে।
গাড়ি থামাতেই একটি মেয়ে লিফট চাইলে। 
"মন্দ নয়, এতক্ষণে জার্নিতে জান এল।" মনে মনে ভাবল সমর ।
সমর- "ওকে  আসুন। এতো রাতে--এই সুনসান জায়গায়--চারদিকে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল।পোকামাকড় আর হিংস্র জানোয়ারের সাথে সাথে মানুষের ভয় ও কিছু কম নয় ।একা বেরিয়ছেন, ভয় হচ্ছে না"?
নিরুত্তর। 
সমর আগে বলতে লাগল-  একটু ভয় থাকা ভালো----আপনার ই মতো একটা সাহসী মেয়ের শেষ কাজ করে ফিরছি।কতো ভালো-- সুন্দর মেয়ে, তার মর্মান্তিক মৃত্যু হল। জানেন তো, এসিডে মুখটা পুড়ে এমনই কুৎসিত আর ভয়ংকর  হয়েছে,যা কি বর্ণনা করা সম্ভব নয় । 
মেয়েটি বলল, "এইরকম?"...
ঘেউ--ঘেউ ---ঘেঊ---
সমর সম্বিত ফিরে পেল।দেখল কারের দরজাটা খোলা। সেই দিকে  তাকিয়ে তিন চারটে কুকুর সমানে ডেকে চলেছে। দরজা টা বন্ধ করতে গিয়ে অনুভব হল, শরীরটা যেন পাথর,নাড়াতে পারছে না। পা  ব্রেকে আটকে গেছে। বহু কষ্টে কারের দরজা টা বন্ধ করে, গাড়ি স্টার্ট করল সমর।

উচ্ছিষ্ট ও জাগ্রত....শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।


উচ্ছিষ্ট ও জাগ্রত
....শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।

বিবাহের প্রথম রাতের রাগিণী হয়ত বিবাহসভার উদযাপনের সুরে যেমন চিরদিন একই সুরে বাজেনা, তাও তার উদযাপনের কাঙ্ক্ষিত আসরে  লোকে এসে  আনন্দ -ফুর্তি করে।

দুটো ভালমন্দ খেতে পাওয়া যায়  বলে তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির সেই অদম‍্য প্রবৃত্তি আসলে   ওদের ঠিক উস্কে দেয়।

যদিও আবার নিজেদের ডেরায়  ফিরে যাওয়ার আগে তারা ওই নবদম্পতিকে তাদের আগামী দিনগুলোর জন‍্য  শুভেচ্ছা জানাতেও তারা কিন্তু ভোলে না।   আর যে মানুষগুলোর নিজের বিবাহিত জীবনে অযথা  ঘূণ ধরে গিয়ে এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে অথবা যাদের আর তা থেকে আর নতুন করে কিছু খুঁজে বের করার উদ‍্যম বা স্থৈর্য‍্য কোনওটাই নেই,  তারাও কিন্তু একজন নবদম্পতির মিলন অনুষ্ঠানে আসে।

সেখানে এসে তারা তৃপ্তির একমুঠো অন্ন আর সমগ্র বৈভব প্রদর্শনের আগুনে নিজেদের মৃত ও বাসি হয়ে আসা মাংসগুলোকে একটু  যেন সেঁকে নিয়ে আবার  নতুন করে বেঁচে থাকার পথে  পা রাখতে চাওয়ার এ এক অবধারিত নিয়ম। যদিও সেই যৌথজীবনের সার্থকতায় তাদের আর কোন ভূমিকা আর না থাকলেও তবুও তারা  সেখানে আসে!

আসলে একটা চকচকে ও আকর্ষণীয়  উপহারের দানসামগ্রীর বিনিময়ে অন্তত উদরপূরণের ঔদার্য‍্যকে তারা ছোট করতে পারেনা বলেই হয়ত আসে।
.........

সেরকমই একটা আনন্দমূখর বিয়েবাড়ির বাইরে একটা সমবেত জনসমষ্টির কোলাহল হঠাৎ  ভেসে আসে। অতঃপর তার টানে টানে বিয়েবাড়ির ভিড়ও একটু একটু করে ঐ গোলমালের দিকে কৌতূহলী চোখে চাইতে থাকে।  সবাই দেখে যে আসরের উচ্ছিষ্ট খাবার যেখানে ফেলে দিয়ে জড়ো করা হয়েছে সেখানেই এই গন্ডগোলের সূত্রপাত।

.........

শ‍্যাম মাস্টার নামে এক খোঁড়া ও ভবঘুরে মানুষের সাথে সামনের ফুটপাতে থাকা আরোও কয়েকজনের সাথে বচসা লাগার উপক্রম।
এই শ‍্যাম মাস্টার আগে কাছের স্কুলে ভূগোল পড়াত। সে কাজে যথেষ্ট নামডাক ছিল তার। তবে সেবার হাইওয়ের ধারে  দুর্গাপুজোর সময় একটা লরির সাথে মাস্টারের সাইকেলের ধাক্কা লাগে। মাথায় চোট লেগে তখন প্রায় মৃত মাস্টারকে লোকজন ধরাধরি করে  সামনের সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় যমে মানুষে দিন দশেক টানাটানির পরে মাস্টার বেঁচে ফিরলেও,  পুরোপরি সুস্থ হয়ে উঠতে আর পারেনি কোনওদিন।

তার  তিনকূলে কেউ ছিলনা যে একটু যত্নআত্তি করবে। সেই হাসপাতালে যা চিকিৎসা হবার হলেও মাস্টারের ওই  ইস্কুলের চাকরীটা আর তারপর বেশীদিন রইল না।
.....
মস্তিষ্ক তথা স্বরযন্ত্রের অঘোষিত ষড়যন্ত্রে কথা বলাটাও ক্রমশ অস্ফূট থেকে অস্ফূটতর ধ্বনিসারে পর্যবসিত হওয়ায় জীবিকার প্রচন্ড সম‍স‍্যায় শুরু হল এবারে এক ভবঘুরে বৃত্তি। ততদিনে ছাত্র ছাত্রীরা, এমনকি তাদের বাবা -মা'রাও মাস্টারকে এড়িয়ে চলতে লেগেছে।

ব্রজ পালাকারের মা যতদিন পেরেছে মাতৃস্নেহে আপনভোলা মাস্টারকে ডেকে দু'বেলা খাবার দিত বলে মাস্টারের অপ্রয়োজনীয় পরাণটুকু শেষমেশ রয়ে গেল।
......

" এ‍্যাই ছোঁড়া....... ওরে ওই তো অরোরা বোরিওলিস রাতের আকাশে....!" অস্ফূট স্বরে শ‍্যাম মাস্টার  এসব ভাঙা গলায় বলতে বলতে ওখানে কারুর ফেলে দেওয়া দু-তিনটে লুচির টুকরো আর পায়েসের কিয়দংশ একটা দোনায়   তুলে পাশ্ববর্তী  আর একজন অবশিষ্টজীবি কানা লোচনের অতি কষ্টে সংগৃহীত কিছুটা খাদ‍্যাংশ  তড়িৎগতিতে ছিনিয়ে নিতেই  এবারে কানা লোচন তারস্বরে ও অসহায় গলায় হাঁউমাউ করে ওঠে।

সেই কলহযাপনে এলাকাল নামকরা খিস্তিবাজ ও নানা রোগে জীর্ণ ও ভিখিরিদের মুরুব্বী গুছের 'বুঁদির মা' তার কাংস‍্যবিনন্দিত  গলার জোরে আরও জনা পাঁচেক লোক জুটিয়ে এনে অর্ধোন্মাদ ও ক্ষুধার্ত ভবঘুরে শ‍্যাম মাস্টারকে তার  এই অপরাধটুকুর জন‍্য  যথেচ্ছ পীড়নের জন‍্য উস্কিয়ে দেয়।

অবশেষে তাদের সবার কাছে অকথ‍্য প্রহার ও ক্ষুধার পীড়নে মৃতপ্রায় শ‍্যাম মাস্টারকে যতক্ষণে বিয়েবাড়ির লোকজনেরা  বেরিয়ে এসে ওদের হাত থেকে শেষমেশ উদ্ধার করে ততক্ষণে প্রহারের দাপটে রুগ্নদেহী মাস্টার প্রায় মৃতপ্রায়।
.....

সামান‍্য এই খাদ‍্যাংশ যা আদতে উচ্ছিষ্ট ও বাতিল হয়ে গেছে, সেই ভুক্তাবশেষটিও যে কোন কোন মানুষের কাছে পরম তৃপ্তির হতে পারে অথবা বিবাদ ও অধিকারের বিষয় হতে পারে তা বোধহয় মানুষের সামাজিকতা  বলেই  সম্ভব। গোলমালের জেরে পাড়ার দু-একটি কুকুর কেমন যেন বিস্ময়ে মৌনতাকে অবলম্বন করে দরিদ্র মানুষগুলির এই  কান্ডকারখানা দেখতে থাকে।

এত মার খেয়েও রক্তাক্ত শরীরে মাস্টার ম্লান হাসি হেসে শেষবার বলে ওঠে, -

" খিদ‍ে পেলে সবাই দেখচি নিজের দেশের  মানচিত্তির ভেঙে খেতে শুরু করেচে ....কি ক্ষিদে...এ..এ! বাপ্ রে বাপ্!"

এই কথাটুকুর পর তার মুখে অস্ফূট বাক‍্যাংশ  বা আরও কিছু গোঙানি একসময় থেমে আসলেও তার পরণের শতছিন্ন পাজামার একটা  পকেটে তখনও একটা চ‍্যাপটানো মরা শালিকের বাচ্চার দেহ উঁকি মারছিল।

......

মাস্টার কথাটা খুব ভুল বলেনি কিন্তু! প্রচন্ড খিদের চোটে সে খানিক আগে একটা  মরা শালিক পাখিটির দেহাংশ  কোন দর্পীর পদতলে থেঁতলানো একটা স্বাদু রাধাবল্লভীর টুকরো ভেবেই হয়তো কুড়িয়ে নিয়েছিল পরে খেয়ে নেবে বলে।

আজ আদিগন্ত বিশ্বে ক্ষুধা ও তার জন‍্য সংগ্রাম ও বঞ্চনার ধারাপতনের ইতিহাসটি যেন  ক্রমশ আদিম ভূত্বকের সন্নিবিষ্ট সব জমানো সম্পদের পরে দেশ ও জনপদের চেনা মানচিত্রের বহিরাকৃতিকেও ক্রমসংকোচনের  ঘোরতর শাস্তি দিতে শুরু করেছে।

তবে গদ‍্যময় ক্ষুধার রাজ‍্যে শ‍্যাম মাস্টারের কৃত এই ভ্রান্তিটুকুও  আবহমান কালে  ঠিক একই ভাবে হয়ত জেগে থাকবে ; যেমন পূর্ণিমার চাঁদকেও ঝলসে যাওয়া রুটির অবয়বে কোনও কোনও  কবিরা  রাতের আকাশে এখনও চাইলে একবার অন্তত দেখতে পান।

............

17/04/2022

জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব- - উত্তম চক্রবর্তী


জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব
- - উত্তম চক্রবর্তী  

শোভা বাজারের গঙ্গার কাছেই কুমোরটুলিতে ছিল আমার মামা বাড়ি। ছোট বেলায় প্রত্যেক বছর দমদম সেভেন ট্যাঙ্ক থেকে মার সাথে সেখানে যেতাম দাদু মামা মামিদের বিজয়ার প্রণাম জানাতে। দিদিমা আমার জন্মের আগেই নাকি মারা গেছিলেন। দোতলা মামা বাড়িতে বড় ও মেজো মামা তাদের পরিবার নিয়ে থাকতেন সাথে অবিবাহিত ছোট মামা ও আমাদের সবার দাদু। দাদু ছিলেন প্রায় আশি বছরের বুড়ো, চোখে ভালো দেখতে পারতেন না, দুই চোখেই ছানি পড়ে সাদা সাদা হয়ে গেছিল। ঠিক মত দেখতে পেতেন না বলেই হয়ত দাদু খুব খিট খিটে ধরনের ছিলেন। এদিকে এই সুগার নিয়েই রোজ বিকেলে তার গলির মোড়ের মিষ্টির দোকানের গরম গরম রসগোল্লা খাওয়া চাই। নাহলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলতেন। ছোট মামার কাজ ছিল এক  হাঁড়ি রসগোল্লা এনে দাদুকে দিয়ে শান্ত করা। হাঁড়িতে না হলেও ডজন খানেক রসগোল্লা থাকতো। দাদু সেখান থেকে কাউকে একটাও মিষ্টি দিত না।

ছোট মামার বয়স তখন পঁচিশ হবে, রেলে চাকরী করেন। আমার বারো বছর বয়সে দাদু মারা যান। সেবার আমি বোন ও মা আমরা সবাই শ্রাদ্ধর পর বাড়ি ফিরেছিলাম। তখন থেকেই লক্ষ্য করতাম দাদুর ঘরে সন্ধ্যার পর আর কেউ যেত না। দরজাটা বন্ধ করে রাখা হত। ওখানে নাকি রোজ সন্ধ্যায় এখনো দাদু রসগোল্লা খাবার জন্য বায়না করেন আর ঘরের জিনিষ ভাংচুর করতে থাকেন বা আলমারিতে ও খাটের উপর জোরে জোরে লাঠির বাড়ি মেরে আওয়াজ করেন।

এক বছর বাদে বড় মামার বড় মেয়ের বিয়েতে আমরা দুদিন আগে থেকেই মামা বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। আমরা পাঁচ ছয়জন ভাই বোন দাদুর সেই ঘরে দিনের বেলায় ভয়ে ভয়ে গিয়ে দাদুর বিছানায় বসে ক্যারাম খেলতাম। কিন্তু মেজোমামা সন্ধ্যা ছ’টার পর ঘরের দরজায় তালা মেরে দিত। বিয়ের দিন মামা বাড়ির উঠোনে বিয়ে ও বরযাত্রীর বসার ব্যবস্থা আর দোতলার ছাতে প্যান্ডেল হয়েছিল খাওয়া দাওয়ার জন্য। মেঝমামা দাদুর ঘরের খাটের নিচে রসগোল্লা, লেডিকেনি দরবেশ দই এসব রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। দাদুর ঘরের পিছনে দিকে একটাই ভাঙ্গাচোরা জানালা বেশিরভাগ বন্ধ থাকত। ওপারে বাড়ির পিছনে মেথরদের যাবার সরু গলি ছিল। মেজোমামা ঐ ঘরের চাবি নিজের কাছেই রাখতেন, তাই বাচ্চাদের মিষ্টি চুরি করবার কোন সুযোগ ছিলনা।

রাতে যারা খাবার পরিবেশন করবে তাদের তিনজনকে সাথে নিয়ে গিয়ে মেজোমামা গেলেন দাদুর ঘরে মিষ্টি আনতে। তালা খুলে প্রথমে সামনের দিকে রাখা রসগোল্লা লেডিকেনি দরবেশ দইয়ের হাঁড়ি তাদের হাতে তুলে দিলেন। আবার ঘরে তালা মেরে চলে গেলেন ওপরে পরিবেশন দেখতে। এই ভাবে তিন ব্যাচে বরযাত্রী সহ দেড়শ জন খেয়ে নিয়েছে তখন। এখনো প্রায় সত্তর আশি জনের খাওয়া বাকি। হটাত মেজোমামার কেমন যেন সন্দেহ হল যে পিছন দিকে রাখা মিষ্টির বাসনে মিষ্টির পরিমাণ কম দেখলাম কেন ? ভয় পেয়ে গেলেন, সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে পারবেন তো ? বড়মামা জানতে পারলে তো ভীষণ রেগে যাবেন আর তার ভাইকে খুব বকাবকি করবেন। একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটে যাবে আজ।

মেজো মামা চতুর্থ ব্যাচ শুরু হতেই চুপি চুপি দাদুর ঘরের দিকে এগোলেন দেখতে যে দাদুর ভূত এসে আবার সব মিষ্টি চুরি করে খাচ্ছে না তো ? মামা চুপিসারে নিঃশব্দে ভয়ে  ভয়ে ঘরের তালা খুললেন আজ দাদুর ভূত দেখবেন ভেবে। ওমা, মেজো মামা অবাক হয়ে দেখেন দাদুর ঘরের পিছনের জানালা খোলা, ছোট মামা তার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকে মাথা নিচু করে রসগোল্লার পাত্র বের করে টপাটপ মুখে পুরছে। আর জানালার বাইরে ছোট মামার বন্ধুরা সব দাঁড়িয়ে আছে ভাগ পাবার জন্য। মেজো মামা অবাক হয়ে দেখলেন এই বিয়ে বাড়ির পরিবেশের ফাঁকেই মিষ্টি লোভী দাদুর এই ঘরে জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব চলছে যেন।

                     ---------শেষ---------

বড় পুকুরের পাড়ে--অঞ্জলি দে নন্দী, মম



বড় পুকুরের পাড়ে--
                                                                অঞ্জলি দে নন্দী, মম


চৈতন্যবাটী গ্রামের নন্দীদের বড় পুকুরের পাড়ে একটি বিরাট বহু পুরোনো নিম গাছ আছে। গ্রামের সবাই জানে যে ওই গাছে ভূত ও পেত্নী আছে। 

তবুও চোররা রাতে মাছ চুরি করতে যায়। গভীর রাতে তারা জাল ফেলে মাছ ধরে। খালুই ভরে। তারপরে, সকালে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করবে - এরকমই ওদের পরিকল্পনা রয়েছে। 

এক খালুই ভরে গেছে। এবার জাল থেকে মাছ পাড়ে ঝেড়ে তা দ্বিতীয় খালুইয়ে তুলে রাখছে। এমন সময় একদল ভূত ও পেত্নী তাদের ঘিরে ফেলল। ওরা শুনল, " হাউ মাউ খাউ, তোরা ছ'টা খালুই এনেছিস, সবগুলো মাছে ভর। তারপর চুপচাপ ওগুলি এখানেই রেখে চলে যাবি। না হলে সবার ঘাড় মটকাবো। হাউ মাউ খাউ...। "

এবার চোররা তাই করল। খালি জাল কাঁধে করে ভয়ে ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে গেল। 

পরের দিন সকালে নন্দীমশাই প্রাতকালে দাঁত মাজতে মাজতে মাজতে হেঁটে হেঁটে হেঁটে বড় পুকুরের পাড়ে এসে হাজির হলেন। অবাক কান্ড এ যে! উনি দেখলেন ছ'খালুই মাছ। তখন মোবাইলে ফোন করে তিনি তাঁর নাতী আশিসকে ওখানে আসতে বললেন। ব্যাপারটা শুনে আশিস তখন তাদের বাড়ির চাকরকে ও দারোয়ানকে বলল, " ছ'টা বড় থলে নিয়ে বড় পুকুরের পাড়ে চল!" এরপর ওরা সেখানে গেল। দাদু, নাতী ও দারোয়ান সব মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। খালুইগুলো ওখানেই পড়ে রইল। পুকুর পাড়ে ঝোপের আড়ালে চাকর লুকিয়ে রইল। দুপুরে সে দেখল যে জেলে পাড়ার তাদের চেনা ওই লোকগুলো খালুইগুলো নিয়ে কাঁধে তুলছে। সে তখন দৌড়ে গিয়ে চোরগুলিকে হাতেনাতে ধরল। ও ওদের বলল, " নন্দীবাবুর কাছে চল! না হলে খুব খারাপ হবে। " ওরা গেল। নন্দী মশাই ওদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, " তোরা মাছ ভর্তি খালুইগুলো ফেলে রেখে গিয়েছিলি কেনো? " ওরা তখন ঐ ভূত ও পেত্নীদের কথা বলল। এরপর উনি তাদের ছেড়ে দিলেন। 

এই রাতে নন্দী মশাই( দাদু), আশিস(দাদুর নাতী), আশিসের বাবা(দাদুর ছেলে), চাকর, দারোয়ান সবাই মিলে বড় পুকুরের পাড়ে বসে রইল। মাঝ রাতে ঐ ভূত ও পেত্নীর দল ওদের কাছে এলো। এক এক এক জন করে এসে বলল, " আমি আশিসের দাদুর বাবা। আমি আশিসের দাদুর বাবার বাবা। আমি আশিসের দাদুর মা। আমি আশিসের দাদুর মায়ের মা। আমি আশিসের দাদুর বড় পিসিমা। আমি আশিসের দাদুর বড় মাসীমা। আমি আশিসের দাদুর জেঠু। আমি আশিসের দাদুর জেঠিমা। আমি আশিসের দাদুর ছোট পিসিমা। আমি আশিসের দাদুর ছোট মাসীমা। আমরা বহু বছর ধরে এই নিম গাছের ডালে দিনের বেলায় থাকি। আর রাতে এই বড় পুকুরের পাড়ে ঘুরে বেড়াই। তোরা সবাই মিলে এইবার আমাদের প্রত্যেকের নামে গয়ায় গিয়ে পিন্ড দান কর! তাহলেই আমরা মুক্তি পেয়ে এই নিম গাছ ছেড়ে স্বর্গে যেতে পারব। আমাদের তোরা সকলে মিলে এবার উদ্ধার কর! " ওরা তাদের কথা শুনে রাতে বাড়ি এলো।

সকালে গয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সেখানে গিয়ে পিন্ড দান করে তারা ফের নিজেদের বাড়ি এল।

পরের রাতে আবার সেই বড় পুকুরের পাড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কেউই আর এল না। ওরা বুঝল যে সত্যই সব ভূত ও পেত্নীরা অর্থাৎ তাদের নিজের জনগণ সকলেই স্বর্গে চলে গেছেন, এই নিম গাছ ছেড়ে, চিরতরে। ওরা সারা রাত ওই বড় পুকুরের পাড়ে থেকে সকালে বাড়ি এল। 

তবে পুকুর পাহারা দেবার জন্য একজন পাহারাদার রাখলেন, নন্দী মশাই। সে বন্দুক নিয়ে সারা রাত নন্দীদের বড় পুকুরের মাছ পাহারা দেয়, এখন। কারণ, এখন তো আর ভূত ও পেত্নীরা তাদের পুকুরের মাছ পাহারা দেবার জন্য পাড়ের নিম গাছে নেই। তাই.........

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...