Tuesday, 7 June 2022

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত
সাবিত্রী দাস

আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর  একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। কুসুম পুর পার হয়ে গেলেও নাহয় কথা ছিল!  কুসুমপুর থেকে আরো মাইল দুয়েক যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে।
তখনো কুসুমপুর  গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ আসেনি,শুধু কুসুমপুর নয়, ধলাজুড়ি, আমডাঙা, কাজলাডাঙা, বীর হাটী এই গ্রামগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। দামোদর নদীর পাড়ে হাট বসতো সপ্তাহে দুদিন মঙ্গলবার আর শুক্রবার। কুসুমপুর , আশপাশের আরো চার পাঁচটা গ্রামের  লোকজন ঐ হাটেই যাবতীয় কেনাবেচা করতো।এ জন্য  হাটের দিন গুলোতে  কেনাবেচা সেরে আসতে আসতে কোন কোন দিন সন্ধ্যাও হয়ে যেত। হাট থেকে কুসুমপুরের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার মতো। হাট থেকে কুসুমপুরের পথে অনেক  ঝোপঝাড় খানাখন্দ ছিল। তখনকার দিনে গ্রামের রাস্তা আর কেমন হবে!  বীর হাটি  ছিল কুসুমপুর থেকে আরো দু মাইলের পথ। বীর হাটির পানু ঘোষ দুধ নিয়ে হাটে বেচতে যায়, সেদিন সব দুধ বিক্রি হতে হতে বেলা গড়িয়ে গেল।
কুসুমপুরের পথে বাঁশবাগানে তেনারা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন,অনেকেরই এ বিষয়ে  অভিজ্ঞতা আছে। একথা মনে পড়তেই  গা ছমছম করা একটা অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরলো। যাই হোক, যতই ভয় করুক বাড়ী তো ফিরতেই হবে।  সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ ,সন্ধ্যা নেমে আসার ঠিক আগের সময় মুখ আঁধারে বাঁশবাগানের কাছে  পৌঁছাতেই দেখে রাস্তায় লম্বালম্বি বাঁশগুলো পড়ে আছে। ভেতরে ভেতরে যতই ভয় ভয় করুক না কেন বাঁশগুলো না ডিঙোলে তো যাওয়াই যাবে না। যা হয় হোক ভেবে  যেই না বাঁশ পার হতে গেছে গোটা বাঁশঝাড় সাঁ সাঁ করে উঠে গেছে উপরে। পানু একটা পা বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে  তাকে শুদ্ধ নিয়েই বাঁশঝাড় ক্রমশ উপরে উঠতে থাকলো।বীভৎস একটা মুখ খ্যাক খ্যাক করে হাসছে, ঐ মুখটা তো হরুর! তিনবছর আগে এই বাঁশ বাগানেই গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। ভয়ে হাত পা শরীর কাঁপতে লাগলো , দুধের ফাঁকা ক্যান, হাট থেকে কিনে আনা জিনিস গুলো হাত থেকে ছিটকে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় পানু তো আঁ আঁ করতে করতে  ছিটকে পড়েছে রাস্তায় বলা বাহুল্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়েছে।পরের দিন সকালে যখন তার ঘুম ভাঙলো দেখে বাড়ীতে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে।

                ভাগ্য ভালো বলতে হবে, ভাগ্যিস তখন বীরহাটির  মধু ডাক্তার রোগী দেখে ফিরছিলেন। পানুকে রাস্তায় বেঁহুশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বোঝেন পানু ব্যাটা কিছু একটা দেখে ভয়ে বেঁহুশ হয়ে গেছে। নিজের গাড়ীতে তুলে নিয়ে পানুর বাড়ীতে পৌঁছে দেন।

জাম পুকুর--সন্ধ্যা রায়


জামপুকুর--সন্ধ্যা রায়

আমি এক সরকারি চাকুরে। এই গ্রামে নতুন এসেছি। আমার ঘরের চারদিকে বাগান, পাশেই একটা বড় বিশাল বাড়ি। বাড়িটা অনেক পুরনো, অনেকটা সাবেকি বাংলো টাইপের। আমার ঘর সোজা রাস্তাটা গিয়ে বড় রাস্তায় মিশেছে। আবার ওই বড় রাস্তাটা চলে গেছে শহরের দিকে। আমি ঘরের জালনার পাশে বসে সোজা রাস্তার ওপারে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। দূরের ঐ পাহাড়টা সবুজ গাছে ঘেরা। নীল আকাশ, বড় মনোরম এই দৃশ্য। হঠাৎ সামনে একটা বাচ্চা আর এক মহিলাকে ছুটে বেড়াতে দেখলাম। মনে হচ্ছে ওরা দুজনে খেলছে। ওরা দুজন মা ও ছেলে হবে। গ্রামের মহিলার মাথায় বড় ঘোমটা, তার মুখ দেখা যায় না। জালনা থেকে আমি ওদের খেলা দেখছিলাম। সকালটা বেশ ভালো কাটলো। আবার অফিসে বেরোলাম। জনা ছয়েক স্টাফ। প্রথম দিন সবার সঙ্গে মিলেমিশে গল্প করে সময় কাটলো। অফিস থেকে বেরোবার মুখে আমার বন্ধু, অর্কর ফোন এলো, সে বলল, রঙ্গন, ভাবলাম তোর অফিস আর তার পাশের গ্রামটা একবার দেখে আসবো--

রঙ্গন বলল, ভালই তো, আয়না আমি অফিসের সামনে একটা ছোট হোটেলে বসে চা খাচ্ছি। তারপর তুই এসে গেলে একসাথে রাতের খাবার খেয়ে দুজনে গ্রামে ফিরব । তুই আয়, রঙগন বলল আমি ততক্ষণ এখানেই আছি । 

অর্ক বলল, আচ্ছা রাখছি বাস আসছে আমি বাসে উঠছি । বলে অর্ক ফোনটা রেখে দিল ।

রঙ্গন মনে মনে ভাবতে লাগলো। এই হোটেলটা রাস্তার ওপরে বলে যত লরি বাস-ট্যাক্সি কার যাচ্ছে, ড্রাইভার যাত্রীদের অনেকেই এখানে চা নাস্তা করে নিচ্ছে । কেউ আবার দুপুরে আর রাতের খাবার খেয়ে যায় আমার ভালোই হয়েছে । ভাবছি এখানকার নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যাব । এরপর সিগারেটটা ধরিয়ে নিয়ে বসলাম। সামনে অস্তগামী সূর্য, এত সুন্দর দৃশ্য। এই দৃশ্য দেখার জন্য লোকেরা কোথায় না কোথায় যায়! আর আজ আমি চোখের সামনে এখানেই দেখতে পাচ্ছি । সুদূর প্রসারিত হলুদ সরষে খেতটা যেন দিগন্তে মিশে গেছে । আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের কোনটা অন্ধকারে ঢেকে রেখেছে । দুই পাহাড়ের মাঝে সূর্যটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। যেন কোন পটে আঁকা ছবি। কি মনোরম দৃশ্য। কালকে অর্ককেও  দেখাবো। সূর্য গেল সেই অতলে তলিয়ে, চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো। বেশকিছু গাড়ি আলো ছড়িয়ে দিয়ে নিমেষে চলে যাচ্ছে। আবার কেউ নামছে, উঠছে। এর ভেতরেই পৌঁছে গেল  অর্ক । খুশি হলাম ওকে দেখে, এই অন্ধকারে এত সময় একা বসেছিলাম । দুজনে মিলে চা খেলাম।

একটু পরেই দেখছি পেছন থেকে চাঁদের উদয় হলো চাঁদ টা দেখে মনে হচ্ছে মাত্র দু তিন দিন পরেই পূর্ণিমা হবে । অর্ক চাঁদের আলোতে চারপাশটা দেখে খুব খুশি হল। হোটেল থেকে আমরা রাতের খাবার খেয়ে রওনা দিলাম ঘরের দিকে । বিরাট খোলা মাঠ দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না অর্ক খুব আনন্দে গান ধরল   ------- ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে, কারো নজর লাগতে পারে  ।   গানের শেষে এসে পৌ্ছালাম ঘরের  সামনে । তখনই দারোয়ান এসে বলল --- বাবু তোমাকে কর্তামশাই ডেকেছে কথা আছে।  

রঙ্গন বলল কোথায় যাব? 

দারোয়ান বললো, ওই যে পাশের বাড়িটা, ওটাতে-- 

রঙ্গন বলল, ওখানে তো কোন আলো দেখি নি , ওর দরজায় সব সময় একটা বড় তালা ঝুলানো থাকে।  

লোকটা বলল, এখন যান, পাবেন, ঘর খোলা আছে । 

রঙ্গন বলল, ঠিক আছে, কাল যাব । 

আচ্ছা, বলে দারোয়ান চলে গেল । 

দুই বন্ধুতে অনেক গল্প গুজব হল তারপর ঘুমিয়ে পরল রাতে। হঠাৎ প্রচনড শব্দে ওদের ঘুম ভেঙে গেল । অর্ক বলল, একি এতো জোরে আওয়াজ ? একটু পরেই বাসনের জোরে আওয়াজ হল। রঙ্গন বলল, এতো বড় বাড়ি হয়ত অনেক লোকজন আছে । একটু পরেই জোরে জলের আওয়াজ হল যেন নদীতে বান এসেছে । 

রঙ্গন বলে উঠলো, বাইরে বর্ষা হচ্ছে না তো ? ওরা বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে দেখলো। ওরা চুপচাপ শুয়ে আছে, কোন কথা নেই। একটু পরে ওরা অনেক লোকজনের আওয়াজ শুনতে পেল। রঙ্গন ভাবল, ও দিনের বেলায় অনেকটা সময় ছিল না, তাই হয়ত লোকজন থাকার কথা জানতে পারেনি। ও জানে না দিনেও এমন হয় কি না। 

ভোরের দিকে ওদের চোখে ঘুম এল। সকালে উঠতেও দেরী হয়ে গেল। সকালে ওরা দেখল বাইরে রাতের বৃষ্টির নাম নিশানা নেই। রঙ্গন অফিসে যাওয়ার মুখে বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখল সেই তালাবন্ধ ঘর। এখানে কেউ থাকে না নাকি? রঙ্গনের মনে ভয়ের উদয় হল। ও ভাবল এখানে থাকবো না, গ্রামের ভেতরে গিয়ে কোন ঘর নিয়ে থাকব । দুই বন্ধু চুপচাপ ভাবতে ভাবতে হোটেলে পৌঁছাল। হোটেলবালাকে জিজ্ঞেস করল, ওই বড় পুরনো বাড়িতে কেউ থাকে না নাকি ? হোটেলওয়ালা বলল, ওখানে ত কেউ থাকে না, ওই বাড়ির পেছনে এক বড় গভীর জলাশয় আছে, নাম তার জামপুকুর। শুনেছি, ওই বাড়ির বড় কর্তার নাতি ওই জলে পড়ে যায় আর ওকে বাঁচাতে গিয়ে ওর ছেলে আর ছেলে বউ দুজনেই মারা যায়। পরে বুড়ো কর্তাও  মারা গেছে শুনেছিলাম। তারপর গ্রামের লোকেরা কেউ গরু চরাতে গেলে বা বাচ্চারা ভুলে চলে গেলে কেউ নাকি বেঁচে ফেরে না। গ্রামের লোকেরা গিয়ে দেখে জলে পড়ে মরে আছে। এ সব শুনে রঙ্গন অফিসে গেল। নিজের কাজ করে কাউকে কিছু না বলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় মতলব আটল এখানে আর সে থাকবে না । বলল, বুঝলি অর্ক এখানে থাকা চলবে না । চলে যাব । 

অর্ক বললো, ঠিক বলেছিস চল, আমার সঙ্গে চল। ব্যাগটা নিয়ে আসি আগে । সন্ধ্যায় গিয়ে দেখে বড় বাড়ীটা তালা খোলা। রঙ্গন বললো, একবার দেখা করে আসি। ওরা দুজনেই গেল। ওরা দেখল টেবিলে একটা হারিকেন জ্বলছে, ঘরটা স্যাঁতস্যাঁতে । সীতানাথ মুখুজ্যে মশায় বসে আছেন । রঙ্গনরা যেতেই ওদের বসতে বলল । অর্ক দাঁড়িয়েই ছিল। রঙ্গন পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিয়ে বলল, আমি আর থাকব না এখানে । আমার মন টিকছে না । সীতানাথ ইয়া বড় চোখ তুলে বলল, কেন সে কি? কি হয়েছে ? চিৎকার করলেন তিনি। 

অর্ক ওর চোখ দেখে ভয় পেয়ে গেল । ও উঠে দাঁড়ালো । তখন ভেতর থেকে ওই ঘোমটা দেওয়া বউটা আর ছোট ছেলেটা বেরিয়ে এলো । ওরা জোরে জোরে হাসতে থাকলো । রঙ্গনরা দেখল, বউটা ঘোমটা খুলে দাঁড়িয়ে, ও একটা কঙ্কাল। ছেলেটা আর সীতানাথ বাবুও তাই--ওরাও কঙ্কাল। হারিকেনের আলোয় রঙ্গন ও অর্ক দেখতে পেল, অন্ধকারে কুড়ি পঁচিশটা আরো কঙ্কাল এসে দাঁড়িয়ে। কঙ্কালরা অট্টহাসি হাসছে। ওই আওয়াজে আর ভয়ে রঙ্গন মূর্ছা গেল। ওকে টেনে নিয়ে বারান্দায় এসে  অর্ক চিৎকার করে উঠলো--হেল্প, হেল্প--কেউ কি আছেন ?

অন্ধকারে কেউ এলো না। হঠাৎ ওর মনে হল, ওর ব্যাগে জলের বোতলটা আছে। ও তাড়াতাড়ি জলের বোতলটা থেকে জল নিয়ে রঙ্গনের চোখে দিল । রঙ্গন তাড়াতাড়ি উঠে বসলো সম্বিৎ ফিরতেই দুজন প্রচন্ড দৌড়ে সোজা দোকানে এসে বসে পড়ল। 

রঙ্গন দোকানদারকে বলল, বাস কখন আসবে ? 

দোকানদার বলল, বাস ত এখনই বেরিয়ে গেল । আবার সেই ঘন্টা দুই পরে লাস্ট বাস কিন্তু আশ্চর্য একটু পরেই একটা বাস এলো! ওরা তড়িঘড়ি করেই সেই বাসে উঠে বসলো, দেখল, প্যাসেঞ্জারের সবাই ঠান্ডায় চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে।  অর্কর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, বুঝলি আমরা বড় বাঁচা বাঁচলাম । 

বাস অন্ধকারে ছুটে চলেছে। রাস্তায় লোক উঠছে - নামছে।  আর কিছু পরে ওদেরও নামতে হবে। হঠাৎ ওরা দেখতে পেল, ওদের মোড় এসে গেছে। রংগন দাঁড়িয়ে বললো, থামাও থামাও, সিঁথির মোড় এসে গেছে। আমরা নামব-- 

বাস থামল না, অর্ক চিত্কার করে উঠলো, থামাও থামাও রঙ্গনের চিৎকারে বাসের সবাই পেছনে ঘুরে তাকাতেই রঙ্গন আর অর্ক দেখলো সামনে বসে ওরা সবকটা কঙ্কাল! এবার ওরা চিৎকার করতে করতে বাসের দরজার কাছে এসে সজোরে ধাক্কা মারলো । এক মুহূর্তের জন্য বাস থামল আর দরজা খুলে গেল । অর্করা  দুজনে ভয়ে হাত ধরাধরি করে নামছে । দুজনে যেন কাঁপছে । নেমে ওরা সামনেই দেখল ওই ঘোমটা দেওয়া বউ আর তার ছেলেটা, কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে এমনি কঙ্কাল দেখে রঙ্গন আর অর্ক ভয়ে চিৎকার করে উঠল। মহিলা আর ছেলেটা বাসে উঠতেই অট্টহাসির আওয়াজে চার দিক যেন ভরে গেলো। বাসটা অন্ধকারে ছুটতে শুরু করল, আর মুহূর্তের মধ্যেই কোথাও মিলিয়ে গেল।  

সমাপ্ত

Monday, 6 June 2022

একটি রহস্যময় ঘটনা--শুভ্রব্রত রায়



একটি রহস্যময় ঘটনা--শুভ্রব্রত রায়

একদিন একটি রাত্রিতে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কারণ সেই সময় ছিল বর্ষাকাল। সারাদিন প্রবল বৃষ্টির হওয়ার পর যখন খানিকটা বৃষ্টির পরিমাণ ও ঝড় হাওয়ার দাপট কমল, তখন প্লাটফর্মে একটাও লোক নেই। প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক শুনশান। অর্ক বলে একটি ছেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে বাড়ি ফিরবে বলে। কারণ তার বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে। কিন্তু ট্রেন আসতে অনেক দেরী, তাই অর্ক প্লাটফর্মের একটি বেঞ্চে পা তুলে বসল, রাত্রি তখন প্রায় ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজে। তখন সে ভাবলো এই ঠান্ডা আবহাওয়াতে একটু চা পেলে ভালোই হতো, কথাটা ভাবা মাত্রই দেখল সে-খানিকটা দূরে একটি লোক চায়ের কাপ ও কেটলী হাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছ। তৎক্ষণাৎ অর্ক হাত নেড়ে লোকটিকে ডাকল। অর্ক বলল এক কাপ চা দিন। লোকটি বলল চা নেই বাবু কফি আছে। অর্ক শুনে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে ভাবলো "আরও ভালো"। এই ভেবে সে এক কাপ কফি কিনে খেতে লাগলো আর প্লাটফর্মেট পাইচারি করতে লাগলো।
  হঠাৎ খানিকটা দূরে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে একটা একটা কী যেন একটা পড়ে আছে। দূর থেকে বিদ্যুতের আলোতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তাই অর্ক একটু এগিয়ে গেল সেই দিকে। আর দেখল একটি মানুষ পড়ে আছে রেল লাইনের ধারে। সে ভাবল লোকটি হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। তখন প্রায় রাত্রি নটা বাজে।
ঠিক আর একটু বাদেই রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ ট্রেন আসবে। তাই অঘটনের আশঙ্কায় তার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাই তাকে সেই রেল লাইন থেকে তোলার জন্য অনেক ডাকাডাকি করতে লাগলো। কিন্তু অর্ক লোকটির কোনো সাড়া পেলনা, সাড়া না পেয়ে লোকটির ডান হাতটি ধরে সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল। এ কী! বরফের মতো ঠান্ডা তার হাত। কিন্তু তার শরীরের পোশাকটা তো ভদ্রলোকদের মতোই মনে হচ্ছে। আর একটি জিনিস তাকে অবাক করে দিল। লোকটির ডান হাতের তর্জনী যেন লাইনের পাশের ঝোপের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। সে অনেক চেষ্টা করে লোকেটির দুটি পা টেনে তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! তার তার ডান হাতের তর্জনী সেই ঝোপের দিকেই রয়েছে। 
সে তখন কৌতুহল বশত সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে করে ঝোপগুলি সরাতেই তার চোখে পড়ল একটি কালো ব্যাগ। সে আরও কৌতুহল হয়ে পড়ল ব্যাগটি তাড়াতাড়ি খোলার জন্য। ব্যাগটি খুলে সে দেখল পাঁচ লক্ষ টাকা। অর্ক তখন ভাবতে লাগলো এত টাকা নিয়ে লোকটি কোথায় যাচ্ছিল? তার পরিচয়টাই বা কী? এইভাবেই সে ব্যাগটি আরও ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখল কয়েকটি বিবাহের কার্ড রয়েছে। তাতে পাত্র-পাত্রীর পিতা ও মাতার নাম লেখা। তবে কী লোকটির ছেলের বা মেয়ের বিবাহ? সে কৌতূহল হয়ে কার্ডটি পড়ল এবং ঠিক করল সব জেনে লোকটিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এই ভেবেই অর্ক যেই পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটিকে দেখার জন্য যেখানে তাকে সে রেখেছিল। কিন্তু কোথায় কী? কেউ তো নেই! তন্ন তন্ন করে অর্ক খুঁজল চারপাশ। কিন্তু জড়াজীর্ণ লোকটিকে কোথাও দেখা গেল না।
এখন সে কী করবে সেটাই ভাবতে লাগলো হতভম্ব হয়ে। ভাবতে ভাবতে কার্ডে লেখা ঠিকানাতেই সে যাবে মনস্থির করল। প্রথমে সে পাত্রীর পিতার ঠিকানাতেই যাবে বলে ঠিক করল। কারণ, তার মনে হচ্ছিল সেখানেই তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সে পাবে।
রাত্রি অনেক হয়ে গিয়েছিল, সমস্ত ট্রেন চলে গিয়েছিল। তাই অর্ক ঠিক করে রাতটা এই করিমপুর প্লাটফর্মেই কাটিয়ে পরের দিন খুব ভোরের ট্রেনে সে রওনা দেবে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্য। সেইমত পরের দিন রাত পোহাতেই ভোর হতেই অর্ক তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য রওনা দিল। খোঁজ করতে করতে সে যখন সেই বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তখন কিছু লোক তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখছিল। কারণ, অর্ক সেই এলাকাতে আগে কখনও যায়নি।
বাড়ির সামনে আসতেই এক ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেসা করলেন-"আপনি কি বরপক্ষের কেউ?" অর্ক উত্তর দিতে উদ্যত হলে সেই ভদ্রলোকটি অর্ককে থামিয়ে দিয়ে বলল-"দেখুন, এখানে একটু অসুবিধা হয়ে গেছে। গত পরশুদিন থেকে ভুপেনবাবু নিখোঁজ, তিনি পরশুদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন কিছু নিমন্ত্রণপত্র বিলি করতে আর বরপনের টাকা যোগাড় করতে। কিন্তু দুটি রাত পেরিয়ে গেল, আজও তিনি ফেরেননি। সেক্ষেত্রে বিয়েটা যে কী করে হবে, তা বুঝতে পারছি না"।
এই কথা শুনেই অর্ক সেই কালো ব্যাগটা তার দিকে এগিয়ে দিল এবং বলল, -" দেখুন তো, এই ব্যাগটি ভুপেনবাবুর ব্যাগ কিনা? টাকা-পয়সা যা ছিল, তা-ই-আছে। ব্যাগটি হাতে পেয়ে ভুপেনবাবুর বাড়ির সদস্যদের উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে অর্ক তার পূর্বদিনের ঘটনার কথা আর বলতে পারল না।
সে শুধু বলল, ভুপেনবাবু আমাকে পাঠিয়েছেন এটি দিয়ে। আর, বলেছেন যে বিয়েটা যেন সুষ্ঠুভাবে হয়। উনি একটু বিশেষ কাজে আটকে পড়েছেন, তাই নিজে আসতে পারেননি। তিনি খুব শীঘ্রই বাড়িতে ফিরবেন"।
____________________________________________
 নাম শুভ্রব্রত রায়। তিনি কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। কবি ও সাহিত্যিক শুভ্রব্রত রায়ের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর গ্রামে ১২-ফেব্রুয়ারী ১৯৯৭ সালে। তিনি বাস্তবের উপরে কবিতা ও লেখালেখি করতে ভালোবাসেন, বিভিন্ন বই ও পত্রিকাতে কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে। পিতা পরমানন্দ রায় ও মাতা শ্যামলী রায়। শুভ্রব্রত রায় বিশ্ববঙ্গ বাংলা সাহিত্য একাডেমি অনুমোদিত বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তিনি বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছেন।
____________________________________________
নাম:- শুভ্রব্রত রায়
ঠিকানা:- গ্রাম + পোস্ট - মন্তেশ্বর
জেলা:- পূর্ব বর্ধমান
                   পিন:- ৭১৩১৪৫
মোবাইল নং:- ৬২৯৪৫২০৫৩৯
হোয়াটসঅ্যাপ নং:- ৬২৯৪৫২০৫৩৯

নিলয়ের মননে-- দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়


নিলয়ের মননে
দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়

নিলয় বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই অনেক সুখে আনন্দে দিন কাটিয়েছে, অভাবের চিহ্ন কোথাও নেই।প্রতি বছর দুবার করে বাইরে যাওয়া, বড়ো স্কুলে পড়াশোনা করা,নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে বিদেশে চাকরি নেওয়া।অনেকটা রূপকথার গল্পের কাহিনী মনে হয়।
সেবার ওরা আগ্রায় বেড়াতে গেছিল, ওখানে অনেক স্থাপত্য শিল্পের দৃষ্টান্ত রয়েছে,তাজমহল তো বিখ্যাত। ঘুরে ঘুরে যত নিলয় দেখে,তত প্রশ্নের পর প্রশ্ন তার মনে উঁকি দেয়, কিছুতেই দমন করতে পারে না।
মহলের মধ্যে কে আছে যে,কান্না শোনা যায়,কে যেন
কাঁদতে কাঁদতে বলে,জানো আমার গল্প, আমি এখানেই বন্দী আছি। সবাই আমাকে দেখতে আসে, কিন্তু আমার কান্না শুনতে পায় না, সবার এতো ভালো লাগে, কেন জানো,এর মধ্যে আমার অস্তিত্ব আছে বলে, আমার ভালোবাসার রক্ত গোলাপ সাদা উজ্জ্বল পাথরের গায়ে, জ্বলজ্বল করে জ্বলে!
অনেক টাকা খরচ করে বানানো সেরা মহলের,প্রতি দেওয়ালে দেওয়ালে আমার কান্না প্রতিধ্বনিত হয়, তাতে তোমরা রোমাঞ্চিত হও।
আর , বলো আশ্চর্য !
কি আছে, যা শুধু অনুভূত হয়।
নিলয় বিড়বিড় করে বললো ভূ , ভূত !
হা হা করে কে যেন, হেসে উঠলো,বললো দাঁড়াও,
আমি তাজমহল বানানোর মিস্ত্রি,এখান ছেড়ে আমিও যেতে পারিনি, কারণ এই মহল বানানোর পর আর কোনো কাজ করতে পারিনি,
ইচ্ছে ছিল, আরও কিছু কাজ করার ,সম্রাট,সে হুকুম দেননি,
তাই আমরা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছি !
কিসের প্রতিশোধ ? সম্রাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।
আর আপনি সেই সম্রাট !
আ- আমি মানে !
হা হা হা হা  ! 
ভূ - ভূত !
ওর মা বলে কিরে ভূত ভূত করছিস কেন? 
কোথায় ভূত ?
কোথাও কেউ নেই, ফালতু চিন্তা করা তোর স্বভাব হয়ে গেছে।
এর মধ্যে লালকেল্লা আগ্রার অনতিদূরে রয়েছে। নিলয় বাবা মায়ের সঙ্গে ওখানে আসে।
ওখানে এসেও একই সমস্যায় পড়তে হয়, যদিও "লালপাথর" "সিনেমার সঙ্গে এই জায়গার তেমন মিল নেই,
তবুও নিলয় ও সিনেমার স্মৃতি আবছা আলোয় ছায়া ছায়া দেখতে পায়, খুনের সময়,যে আর্ত চিৎকারে বলেছিল--- "অমরদা"  , কথাটা কেমন যেন গুলোতে থাকে,
ফতেপুর সিক্রিতে এসে, থমকে যায়। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে, আগে তো কখনও আসিনি , আবার যেন কে ছুটে চলে গেল, আবার সেই ডাক,অমরদা আআআ...
ওকে যেন খুব চেনা লাগে।
দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে,
তারপর কিছু মনে নেই !

যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখি বাড়িতে শুয়ে আছি, ঠাকুমা মাথার কাছে বসে আছে, ডাক্তার বললেন,হ্যালুসিনেসন 
আসতে আসতে পরিবর্তন হয়ে যাবে।
বিদেশে ভালো চাকরি করে, একটা বিয়ে দিয়ে দিন, ঠিক হয়ে যাবে।
বড়োলোকের একমাত্র মেয়ে,ডানা কাটা পরির মত সুন্দরি মেয়ে মিলির সঙ্গে বিয়ের ঠিক হয়ে যায়, তারপর
ঘোরাঘুরি সপিং মলে কেনাকাটা,আইনক্সে সিনেমা দেখা ,সি সি টুতে খাওয়া, জমিয়ে আড্ডা,মিলির মধ্যে ডুবে যায় নিলয়, তারপর ধূমধাম করে বিয়ে করে নাইজেরিয়া পৌঁছে যায়।

এখানের মনোরম পরিবেশে 
ছিমছাম বাংলো বাড়িতে মিলির সাজানো সংসার। উইকেন্ডে দুজনে ল্ং- ড্রাইভিংএ যায়, বেড়াতে যায়,
পার্টিতেও যায়।কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু মাঝে করোনার দাপট খুব বেড়ে গেলো, 
আক্রান্ত হয়ে মিলি মারা গেল।

সমস্যা আবার শুরু...
সারা বাংলোময় কে ঘুরে বেড়ায়, গান গায়, সকল হলেই জল পড়ার শব্দ হয়,
ছুটে ছুটে দেখতে গিয়ে কোথায় যেনো হারিয়ে যায়।
গা ছমছম করে,
অফিসে ছুটি নিয়ে নিলয় বাড়ি ফিরে আসে। ঠাকুমাকে 
সমস্যার কথা বলে।
ঠাকুমা নিলয়ের বাবা মা কে জানায়।
নিলয়ের বাবা মা আবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে,
এবারেও ডাক্তার আবার বিয়ে দিয়ে দিতে বলেন, আরও বলেন, আপনারা ওকে কখনও সময় দেননি, নিজেদের কাজে ব্যস্ত জীবন কাটিয়েছেন, ফলে ওর এটা দেখা দিয়েছে,
বাবা মা দুঃখী মনে গরীবের একটা মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলেন।কোনো ঘটা করলেন না।
সোমা গরীবের মেয়ে হলেও সুন্দরী,শিক্ষিতা।
তাই খুব সহজেই নিলয়ের সঙ্গে সিস্টার সুলভ আচরণে,
নিলয়কে বস করে ফেলে।
কিন্তু ওখানে পৌঁছে সোমারও
কেমন যেন গা ছমছম করছিল, পরদিন সকালে সেই জল পড়ার আওয়াজ, কাছে
যেতে যেতে,সব চুপচাপ।
সোমা এখানে একটা হাসপাতালে সিস্টারের কাজে যোগ দেয়।
সন্ধের সময় চা খেতে খেতে দুজনেই শুনতে পায় কে যেন
গান গাইছে
নিলয় বলে ওঠে মিলি, মিলি এসেছে,
তারপর সব চুপচাপ।
সোমা চিন্তায় পড়ে, সারারাত ঘুমোতে পারেনা,
ওদিকে নিলয় সোমাকে মিলি ভেবে,সোমার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে নিলয় সোমাকে প্রচন্ড বকাবকি শুরু করে, সোমা খাবার গুছিয়ে হাতের কাছে রেখে, নিজের কাজে চলে যায়।
সামনে থেকে সরে গিয়েও সোমা বেশ চিন্তিত থাকে।
ডাক্তারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে, জানতে পারে ওগুলো মনের ভুল।তাই শক্ত হয়ে সংসার করতে হবে।

নিলয়ের সঙ্গে সোমা মুখোমুখি হতে চায়না,তাই পেছনের দরজা দিয়ে চুপিচুপি ঢুকে, লুকিয়ে থাকে। 

দেখে নিলয় টেনসন করছে,
 বলছে আমাকে কেউ বোঝে না, সবাই নিজের কাজে ব্যাস্ত।
বাবা মা একবারও ভাবে না আমার ওপর দিয়ে কিরকম ঝড় গেল,
আবার কতো বছর পর দেশে ফিরতে পারবো, 
আদৌ কারো সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবো কিনা,

এ সোমা  আবার কোথায় চলে গেল, আমাকে না বলে।
আর ওকে কিছু বলবো না।
শেষে
ও আবার আমাকে ছেড়ে...
নাঃ, একটা ফোন করে দেখি।
সোমা ঠিক তখনই বলল, খেতে দিয়েছি।
নিলয় একটু অবাক হলো,
খেতে বসে আবার সেই গান শোনা যায়।
দুজনে দুজনকে চেপে ধরে,

তারপর আবার চুপচাপ!


***দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়
৬, হরিচরণ চ্যাটার্জী স্ট্রিট আড়িয়াদহ কোলকাতা--- ৭০০০৫৭
৭০০৩২৪০৯৫৭


ভ্যালেন্টাইন ডে----অদিতি ঘটক


ভ্যালেন্টাইন ডে
----অদিতি ঘটক

"আমি যে কি বলে তোকে কৃতজ্ঞতা জানাবো ভেবে পাচ্ছি না। আমি তো মরমে মরে ছিলাম এই ভেবে যে, আমাদের সেই ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বটা এইভাবে নষ্ট হয়ে গেল বলে। তুই যে এত..দি..ন পর আমায় ডেকে কথা বলতে চাইলি আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দিলি তার জন্য তোকে ধন্যবাদ জানবার ভাষা নেই।
        অয়ন, আমি সত্যি বলছিরে, উষশীকে তোর থেকে কেড়ে নেবার অভিপ্রায় আমার কোনোদিনই ছিল না। আমি জানতামও না তুই ওকে ভালোবাসিস।
 তুই তো জানিস আমি উষশীকে টিউশনি পড়াই। আরো পাঁচজনকে যেমন পড়াই, তেমনই। টিউশনি পড়িয়েই তো আমার হাত খরচা ওঠে। তুই তো জানিস, আমাদের অবস্থা। পকেটমানি দেওয়ার মত ক্ষমতা বাবার আর কবে ছিল। বরাবর নিজেই টিউশনি করে আর স্কলারশীপের টাকায় পড়াশোনা এবং অন্যান্য সমস্ত প্রয়োজন মিটিয়েছি। তুই তো সব জানিস। তোর কাছে তো কোনো কিছুই লুকনো নেই। আমাদের বন্ধুত্ব তো কোনোদিন তেমন ছিল না রে। তুই তো এটাও জানিস, উষশীর মা নেই। জানিসই তো ও কেমন চাপা স্বভাবের মেয়ে। ওর সুবিধা অসুবিধার কথা কোনোদিনও মুখ ফুটে বলে না।       কলেজ ফেরত পড়াবার জন্য উষশীদের বাড়ি যেতেই সেদিন উষশীর শয্যাশায়ী বাবা আমার হাত চেপে ধরে উষশীর সব দায় দায়িত্ব আমায় সঁপে দিয়ে গেলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও কম হতচকিত হয়নি কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটার কথাও ফেলতে পারিনি রে---
বিশ্বাস কর, তবুও আমি উষশীকে আলাদা ভাবে জিগ্গেস করে ছিলাম। ওর আপত্তি আছে কিনা। স্বল্পভাষী উষশী দুদিকে মাথা নেড়ে না বলে তার সম্মতি জানিয়েছিল।
◆◆
 অয়ন ! মেল ট্রেন আসছে, লাইনের ধার থেকে সরে আয়। এবার তো আমার দিকে ফের। মুখ ঘুরিয়ে অন্তত একবার তাকা আমার দিকে। 
  আমি হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি-- যদি কোনো শাস্তি দিতে চাস আমি মাথা পেতে---  কথা শেষ হবার আগেই মেল ট্রেনটা স্টেশন কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কিছু বোঝার আগেই অয়ন ঝাঁপিয়ে পড়ল, রুদ্রেশও দৌড়ল অয়নকে বাঁচাতে-- কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। অয়ন লাইনের তলায়, রুদ্রেশ ট্রেনের গতির টানে নীচে। লাইনের পাশে একদম প্লাটফর্মের ধার ঘেঁষে পড়ে।
◆◆
এই চিত্রনাট্য যখন অভিনীত হচ্ছে তখন দুই বন্ধুকে অনুসরণ করে আসা আরও দুই বিশেষ বন্ধু উষশী ও  ঋষিতা হাতধরাধরি করে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে সব দেখছে--

 দুই বাল্যবন্ধুর থ্যাতলানো দেহ দেখে আর উষশীর মুখের অদ্ভুত প্রশান্তি দেখে ঋষিতার উষশীকে ধরে থাকা উষ্ণ মুঠোটা শীতল, শিথিল হয়ে খসে পড়ে। ঋষিতা স্টেশনের উল্টো দিকে দৌড়তে থাকে। 
 উষশীকে সে যতই ভালোবাসুক তবুও এই নৃশংস, অভিশপ্ত ভালোবাসা সে চায় না। এই নিষ্ঠুর প্রাপ্তি থেকে ঋষিতা অনেক দূরে পালাতে চায়। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেও বেশিদূর এগোতে পারেনা। এক ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়ে। কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন ওকে লাইনের উপর জোর টেনে আনে। অসম শক্তির লড়াই এ সে হেরে যায়। আর সেই সময়ই একটা থ্রু ট্রেন.... উষশীও এই এখানেই...। 

বলুন ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপনের এটা উপযুক্ত জায়গা কিনা। দেখুন রেল লাইনটা কেমন মুঠো মুঠো লাল রক্ত গোলাপ এ  সেজে---
◆◆
কি করছিলেন কি? মরবার শখ হয়েছে? দেখছেন না থ্রু ট্রেন। হাতটা ধরে টেনে না আনলে তো একেবারে..
--- না, মানে, চিঠি, আমন্ত্রণপত্র, এটা তো পরিত্যাক্ত স্টেশন, রক্তগোলাপ, ভ্যালেন্টাইন ডে ...
পরিত্যাক্ত! রক্তগোলাপ, ভ্যালেন্টাইন ডে! হাহাহা... এইবার আপনি...! হাহাহা.....
★★★★★★★★★★★★★★★★
 

***অদিতি ঘটক
 চুঁচুড়া
হুগলি

Sunday, 5 June 2022

নায়িকা-- শিখা মালিক


নায়িকা
শিখা মালিক 

নদী  থেকে কিছু টা দুরে দুর্গ টা অনেক পুরানো অনেক  লতাপাতা ঘেরা,কোথাও আবার দেওয়ালে গায়ে গায়ে বট গাছের চারা। অনেকটা মাঠ পেরিয়ে খেলতে আসে ন্যাপলা বুধো গবা হরি।
দুর্গের  ভিতর  অনেক ফলের গাছ ফল পেকে পড়ে থাকে কেউ কুড়ায় না।গবার দাদু বলে ওখানে  ভূত আছে তাই কেউ যায় না। গবারা চুপি চুপি দুপুর বেলা চলে আসে ,অনেক আম পড়ে আছে ওরা কুড়ায় আর খায় গবা বলে ন্যাপলা চল কে যেন গেট বন্ধ করছে ।ন্যাপলা বলে এখানে  কে আবার বন্ধ করবে   আবার একটা অদ্ভূত  শব্দ দুর্গের  ভিতর তখন ওরা ভয় পেয়ে দৌড়ে  পালিয়ে  আসে।
কদিন পড়ে গবারা দেখলো বড় বড় গাড়ি  এসেছে দুর্গ টার সামনে ,গবা বলে ও হরি দেখ  লাঠি লাগানো ওগুলো কি রে! হরি ফোকলা দাঁতে আম খেতে খেতে বলে ও তো ক্যামেরা ।একটা সুন্দর দেখতে মেয়ে মাথায় টুপি চোখে কালো চশমা হাঁটু পর্যন্ত  জামা পরে  গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে ন্যাপলাদের সামনে,ওদের জিজ্ঞাসা  করে -"তোদের কোথায়  বাড়ি"?।ন্যাপলা বলে উই মাঠ পেরিয়ে ,কিন্তু  তোমরা কি করতে এয়েচো গো? সুন্দরী  বলে - সিনেমার শুটিং  করতে ।গবা তখন বলে ওঠে ও দিদিমনি ওখানে ভূত আছে ।নায়িকা বলে আমরা ভূতের সিনেমা করতেই এসেছি,ন্যাপলা নাচতে থাকে কি মজা কি মজা সিনেমা হবে, সন্ধ্যা  হয় ছেলেরা গাঁয়ে ফিরে আসে দুর্গে তখন শুটিং  শুরু  হয়  ওরা যখন মেকাপ নিচ্ছিল তখন কয়েকজন মেয়ের হাসির শব্দ  শুনতে পায় ,সবাই খোঁজাখুঁজি করে কিন্তু  ওখানে সেরম কাউকে দেখতে পাওয়া যায় না ওরা শুটিংয়ে মন দেয় দোতলার জানালায় সাদা শাড়ি পরে খোলা চুলে নায়িকা গান গাইছে নীচে  বাগানে দাঁড়িয়ে  বিভোর হয়ে দেখছে রাজা বেশে এক অভিনেতা । আচমকা সব লাইট নিভে যায় একটা বিকট চিৎকার  কেউ যেন নায়িকাকে ধাক্কা  দিয়ে নীচে ফেলে দিল।রাতের অন্ধকারে  সব গাড়ি  অচেতন নায়িকাকে নিয়ে শহরে চলে গেল।দুর্গের  পাশে ক্যাম্পের সামনে একটা ব্যানার সাদা শাড়ি পরে খোলা চুলে নায়িকা হাসছে দেখে ন্যাপলারা শুধুই  কাঁদছে।

Saturday, 4 June 2022

ভূতের গল্প-- বহ্নি শিখা (উষা দত্ত)


ভূতের গল্প-- 
বহ্নি শিখা (উষা দত্ত)

শারদীয় মহানবমী। বাড়িতে পূজো হচ্ছে।
মিতার শ্বশুর বাড়ি। আগে হতো না।
বারোয়ারি হলেও প্রতি বছরই তাদের বাড়িতেই হয়। মিলন উৎসবহিসেবে। 
পাঁচ ভাই এর মধ্যে চার ভাইই বাড়ির বাইরে থাকে। চাকুরির কারনে। চার বোন সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। তাদেরও বাপের বাড়ি আসার সুযোগ নেই। সবার ভাটি এলাকায় বিয়ে হয়েছে। বাড়ি থেকে অনেক দূর,আসতে সারাদিন লেগে যায়। তাহেরপুর, দত্তখিলা কলমাকান্দা এসব এলাকায়। রাস্তাঘাট জঘন্য রকম খারাপ। তবু্ও তো বাপের আসতে সব মেয়েদের মন চায়। 
বাবা গত অনেক দিন আগে। দাদারা আছে,মা আছে,ভাইপো,ভাই ঝিরা আছে দেখতে মন চায়। ভাই ঝিদেরও বিয়ে টিয়ে হয়ে তারা সংসারী। ওরা সবাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক। ছুটিছাটা পেলে বাড়িতে আসে। ওরাও অনেক দূরের বাসিন্দা। সূদুর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওদের ঘর-গৃহস্থালী। চাকুরী। সবাই এসেছে। গমগম করছে বাড়ি, সব প্রিয়মুখ। 
আমি মিতা। যেতে পারিনি। শ্বাশুড়ি মা আমার কাছে থাকে,ওজন জনিত সমস্যা। কোত্থাও যাওয়া হয় না আমার। কোন ছেলে মেয়ে নেই।শ্বাশুড়ি মা -ই এখন সন্তানের মতো পুরো সময় ধরে থাকে। তাকে আগলে রাখতে হয়। সেবা যত্ন করতে হয়। স্বভাবতই মনটা ভালো নেই।
শ্বাশুড়ি মায়ের মন তো আরও খারাপ। তিনি পূজোয় যেতে পারলেন না। সবাই এসেছে দেখতে পারলেন না। কান্নাকাটি করে। সারাক্ষণ। বুঝিয়ে সমঝিয়ে রাখি।
এর মধ্যেই ননদ দুজন চলে এসেছে বাসায়। বাড়ি থেকে আমার বাসা দেড় ঘন্টা, ট্রেনে। ওরা এসে বলল,বৌদি দাদাকে নিয়ে তুমি আজ চলে যাও আমরা মা কে দেখব।
মনে মনে বলি, বেশতো ভালোই হলো। কতদিন ঘর থেকে বের হইনি। বিপুল আমার স্বামী। সে রিটায়ার্ড। দু বছর হলো। দেশে,দেশের বাইরে সে একাই ঘুরে বেড়ায়। আমাকে একা রেখে চলে যায়,নানা ছুতো ধরে। সে নিয়ে আমি ওকে যে কিছু বলি না তা নয়। ও কিছু বলে না।
অবশেষে আমরা রওনা হলাম। সেদিনই ফিরব বলে।
পৌঁছে গেলাম পূজোর আগেই। উপোষ  রেখে যেতে পারিনি। জলের ঘাটতি হলে
শরীর খারাপ করে। বিপুল নাস্তিক।সে পূজো পার্বনের আয়োজনে মিলনে থাকলেও তাকে দু কথা মন্ত্র বলে অঞ্জলি দিতে দেখিনি। দেওয়াতেও পারিনি। সবটাই মনের ব্যাপার। বাকিটা তার ভেতরের গোপন ভক্তি বিশ্বাস। 

 আমি নাস্তিক ও নই আস্তিকও নই। মন চাইলে খেলি নয়তো নিজেই নিজের মতো কথা বলি। না ঘরকা না ঘাটকা।
ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই  পৌঁছে গেলাম বাড়ি। বড় রাস্তা পেরিয়ে ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ছোট গলির মতো রাস্তা। আমরা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছি।এটুকু পেরুলেই বিশাল পুকুর। সেই পুকুরের বাম পাশের পাড় ধরেই যেতে হয়। পাড়ের কোনায় বিশাল এক বেল গাছ। তারপর আম কাঠাল লিচু খেজুর সুপারি, সজনে গাছ শিল করই সেগুন গাছের সারির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি,বাড়ি থেকে সকলে একে একে সকলে বেরিয়ে আসছে। সবাই খুব খুশি।
বাইর বাড়িতে মন্দির। অনেকটা জায়গা জুড়ে আরতি এবং পূজোর নৈবেদ্য তৈরীর আঙিনা।বাঁশের বেড়া। এর দশ হাত দূরে পুকুর। যেতে যেতে  কুশল বিনিময় করে মায়ের মন্দিরে প্রণাম করে বাড়িতে গেলাম। খুব ভাল্লাগছে আমার। 
বাকিটা সময় কখন কিভাবে চলে গেলো টের পাইনি। এখন ফেরা পালা। বিকেল পাঁচটা বাজে। জা-এরা খুব পীড়াপীড়ি করছে থাকতে,আমারও ইচ্ছে কিন্তু,,,  
বিপুল রাজি না,কারণ বোনেরা আসছে,
এতদিন পরে তাদের একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে। অগত্যা বিপুলের মন চেয়ে চলে এলাম। রাতে আর কিছু করিনি। 
সকালে রান্না বান্না হলে ওরা খেয়ে চলে গেল।
__________________

মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ডাক্তার বাসায় এসে দেখে গেলেন। অনেকগুলো টেস্ট দিলেন,সব নরমাল।

মানসিক শান্তির জন্য ও কিছু দিলেন না।
শুধু জল খেতে বললেন বেশি করে। মা জল একটু কমই খেতেন। যা হোক,জোর করে খাওয়াই।ডায়াবেটিস, প্রেসার ছিল আগে থেকেই। সেগুলো যেমন চলছিল তেমনই চলবে।

কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে মা'র তান্ডব তত বাড়তে থাকে। ভরা শীতকাল। যেহেতু বসতে পারেন না ওজন জনিত কারনে।
সবটাই করে দিতে হয়। এমন কি পায়খানা প্রসাবও করার সময় কাছে থাকতে হয়।অথচ সেই কি না রাত হলে বিকট মানসিকতা নিয়ে জেগে থাকে। 

একদিন হঠাৎ শব্দে গিয়ে দেখি পুরো উলঙ্গ হয়ে সারা ঘরময় ঘুরছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মাঝরাত। বিপুলকে ডেকে 
তুললাম,বললাম,তুমি দাঁড়িয়ে থাক।আমার ভয় করছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম মা আপনি এই অবস্থা কেন? শীতের মধ্যে? কাপড় কোথায়। কম্বল কোথায়? আমি দেখছি সব কিছু গুছিয়ে জড় করে রেখেছে খাটের এক কোনায়।
মা বলে,ওরা আমাকে নিতে চায়। আমি বললাম কারা? মা বলে কারা তুমি জান না?  আমারে খালি ঘোরায়। এই যে, দেখ ওরা দাঁড়ায়া আছে! তারা পাঁচ জন। 

আমি বলি,কই?  আমি তো কাউকে দেখি না। মা বলে, তুমি দেখ না? জান?ওরা  আমারে মারে। 

মা' য়ের কথা বলা, চোখে তাকানোর ভঙ্গি কোনটাই সুস্থ নয়। ভয়ে আমার সারা শরীর জমে আসছে। গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিতেও ভয় করছে। 

সেদিন কোনমতে কাপড় না দিয়ে উপর থেকে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে ঘরে আগুন জ্বেলে রেখেছি। ছোট বেলা শুনতাম আগুন দেখে ওরা চলে যায়। টোটকা যা মনে এসছে তা দিয়ে জল ছড়া দিয়ে আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছি।
সেদিন চুপচাপ চলে গেছে। কিন্তু তারপরের ঘটনা আরো ভয়াবহ। টোটকায় কোন কাজ হয় না। আমি ভয় পেয়ে ননদকে আনালাম। ননদ টি মায়ের অবস্থা দেখে কেঁদে কেটে অস্থির,ও যে  আরো বেশি ভয় পায়।  কোনমতেই  এসব সমস্যা যাচ্ছে না। পালা করে রাত জাগি।
কিন্তু দেখা যায় যে সময়টাতে একটু অন্যমনস্ক বা তন্দ্রার মতো হলে ঠিক সে সময়টাতে সে তার কাজ করে ।

ওদিনেরও এক ঘটনা। রাত তখন দুটো বাজে মাকে গুছিয়ে জলটল খাইয়ে একটু ঘুমিয়েছি।  রাত তিনটা। একটু পরেই ননদ ডাকছে। গিয়ে দেখলাম মা খাটের নীচে।

 আমি যেন সচক্ষে ভূত দেখতে পাচ্ছি।ওই ঘরের সব এলোমেলো।  যেন তান্ডব বয়ে গেছে। রাতেই ঘরের সব জিনিষ পত্র বের করে মা কে  নীচে ঘুমানোর জায়গা করে দিই। কিন্তু সে নীচে ঘুমুবে না। কিছুতেই না। 

আমি জিজ্ঞেস করি মা, এতো বড় বিছানা আপনি কি করে পড়ে গেলেন?
মা বলে ওরা সাতজন কোমর জলে খাড়ায়া  আমারে টেনে নামালো। আমি বলি, আপনি ব্যথা পাননি? মা বলে না,ব্যথা পাইনি।আমি এতো না,না করলাম কে শুনে কার কথা আমাকে নামিয়েই ছাড়লো।

পরদিন খাট খুলে বাইরে রেখে দিল বিপুল।
ঘরে বিছানা ছাড়া কিছু নেই। 
রাত হলেই যত ঝামেলা। দিন হলে মা এমন ঘুমায় যে মুখে খাবার নিয়েও ঘুমিয়ে পড়ে।
কয়েকদিন আগে ভর দুপুরে আমি রান্না চাপিয়েছি, হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলো,দৌড়ে গেলাম,বললাম, কি হয়েছে মা? বলে,একটা লোমশ হাত আমার মাথায় বুলাইতেছে। নানান কথা বলে,চলে আসি।

কোন বিরাম নেই। আমি যেন ভূতের সাথে পাল্লা দিয়ে দিন যাপন করছি।এখন দিনের বেলাতেও ঘরে আগুন ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে রাখি। কত শুনেছি তারা নাকি আগুন দেখে ভয় পায়। কিন্তু কোথায় কী?

এখন সমস্যা দাড়ালো অন্য। আমাকে একদম পছন্দ করছে না। দেখতেই পারে না। এমন সব কথা বকা বকি করে যা এযাবৎ শুনিনি,মা'র মুখে। তার ছেলে মেয়েরা শুনে লজ্জায় আমার সামনে আসে না। মাকে বুঝায়, তুমি এসব কি করছ? কি বলছ? মা বলে আমি জানিনা তো। আমি কি করি, কি বলি।

 যতসব পুরনো আলাপ,করবে, সব বলবে,খুট খুট করে। যে আসে সবাইকে চেনে, আলাপ করে,হাসি ঠাট্টাও করে।

 আমরা ভেবেছি মাথায় কোন সমস্যা। না,তাও নয়।অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো সব নরমাল। কারোর সাথে কথা বললে খুব ভেবে চিন্তে কথা বলেন। অনেক সময় জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলেন।

 কিন্তু একটু আড়াল হলেই ঝরঝরে। খুব স্পষ্ট ভাষায় চণ্ডালিনী বকা ঝকা। একা তার কাছে যেতে সাহস হয় না।
রহস্যের কিনারা মিললো তখনই যখন জানতে পারলাম সারারাত  ধরেই তিনি বসার জন্য চেষ্টা করতেন। 

অথচ তিনি বসতেই পারেন না। হিপের কাছে ভেঙে গেলে যথার্থ চিকিৎসায় তিনি হাঁটতে পারতেন ওয়াকার নিয়ে। দিনরাত নক্সী কাঁথা সেলাতেন। বসে থেকে থেকে ওজন এতটাই বেড়ে যায় যে বসে থাকার ক্ষমতা হারিয়েছেন। কোন কথা শোনেন নি।

এখন তিনি ভাবেন বড় ছেলেটা বলেছিল,মা আমার জন্য একটা নক্সী কাঁথা সেলাই করে দাও। মনের গোপন ইচ্ছে, যে করেই হোক বসতে হবে।
________________

পুনরাবৃত্তি--প্রেরণা বড়াল


পুনরাবৃত্তি
--প্রেরণা বড়াল 

সঞ্জয়দের ঘর থেকে সমরদের ঘর বাই কার ঘন্টা চারেকের রাস্তা। 
প্রায় দশটা নাগাদ বেরিয়েছে। ঘরে ফিরতে কমপক্ষে দেড়টা- দুটো বেজে যাবে সমরের । তার থেকে বেশি ও হতেপারে।সেই সকাল থেকে হসপিটাল, মর্গ,শ্মশান,এই সব করতেই এতো টা দেরী। বেশ ক্লান্ত সমর।
কি আর করা যায়। বন্ধুকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া, ওর পাশে থাকা টা তো প্রয়োজন। সঞ্জয়ের বোন শুধু সুন্দর নয়, অপূর্ব সুন্দরী ছিল।  আর সেই সংগে ছিল প্রচণ্ড সাহসী ও অহংকারী। তার অন্ত এতো ভয়ংকর হবে ভাবাই যায় না। মুখটা এসিডে পুড়ে - এমনি বীভৎস দেখাচ্ছিল তা বর্ণনার অতীত। গালের মাংস যেন খসে পড়ছে। নাকের হাড় পর্যন্ত ঝলসে গেছে। চোখের সাদা অংশ টুকু ছাড়া কিছু ছিল না। মুখের ঠোঁট ছাড়া দাঁত গুলি- না, আর ভাবতে পারছে না সমর। 
হঠাৎ সমরের মনে হল কেউ গাড়ি থামাতে বলছে। একটু এগোতেই- হা,ঠিক দেখেছে সে।
গাড়ি থামাতেই একটি মেয়ে লিফট চাইলে। 
"মন্দ নয়, এতক্ষণে জার্নিতে জান এল।" মনে মনে ভাবল সমর ।
সমর- "ওকে  আসুন। এতো রাতে--এই সুনসান জায়গায়--চারদিকে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল।পোকামাকড় আর হিংস্র জানোয়ারের সাথে সাথে মানুষের ভয় ও কিছু কম নয় ।একা বেরিয়ছেন, ভয় হচ্ছে না"?
নিরুত্তর। 
সমর আগে বলতে লাগল-  একটু ভয় থাকা ভালো----আপনার ই মতো একটা সাহসী মেয়ের শেষ কাজ করে ফিরছি।কতো ভালো-- সুন্দর মেয়ে, তার মর্মান্তিক মৃত্যু হল। জানেন তো, এসিডে মুখটা পুড়ে এমনই কুৎসিত আর ভয়ংকর  হয়েছে,যা কি বর্ণনা করা সম্ভব নয় । 
মেয়েটি বলল, "এইরকম?"...
ঘেউ--ঘেউ ---ঘেঊ---
সমর সম্বিত ফিরে পেল।দেখল কারের দরজাটা খোলা। সেই দিকে  তাকিয়ে তিন চারটে কুকুর সমানে ডেকে চলেছে। দরজা টা বন্ধ করতে গিয়ে অনুভব হল, শরীরটা যেন পাথর,নাড়াতে পারছে না। পা  ব্রেকে আটকে গেছে। বহু কষ্টে কারের দরজা টা বন্ধ করে, গাড়ি স্টার্ট করল সমর।

উচ্ছিষ্ট ও জাগ্রত....শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।


উচ্ছিষ্ট ও জাগ্রত
....শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।

বিবাহের প্রথম রাতের রাগিণী হয়ত বিবাহসভার উদযাপনের সুরে যেমন চিরদিন একই সুরে বাজেনা, তাও তার উদযাপনের কাঙ্ক্ষিত আসরে  লোকে এসে  আনন্দ -ফুর্তি করে।

দুটো ভালমন্দ খেতে পাওয়া যায়  বলে তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির সেই অদম‍্য প্রবৃত্তি আসলে   ওদের ঠিক উস্কে দেয়।

যদিও আবার নিজেদের ডেরায়  ফিরে যাওয়ার আগে তারা ওই নবদম্পতিকে তাদের আগামী দিনগুলোর জন‍্য  শুভেচ্ছা জানাতেও তারা কিন্তু ভোলে না।   আর যে মানুষগুলোর নিজের বিবাহিত জীবনে অযথা  ঘূণ ধরে গিয়ে এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে অথবা যাদের আর তা থেকে আর নতুন করে কিছু খুঁজে বের করার উদ‍্যম বা স্থৈর্য‍্য কোনওটাই নেই,  তারাও কিন্তু একজন নবদম্পতির মিলন অনুষ্ঠানে আসে।

সেখানে এসে তারা তৃপ্তির একমুঠো অন্ন আর সমগ্র বৈভব প্রদর্শনের আগুনে নিজেদের মৃত ও বাসি হয়ে আসা মাংসগুলোকে একটু  যেন সেঁকে নিয়ে আবার  নতুন করে বেঁচে থাকার পথে  পা রাখতে চাওয়ার এ এক অবধারিত নিয়ম। যদিও সেই যৌথজীবনের সার্থকতায় তাদের আর কোন ভূমিকা আর না থাকলেও তবুও তারা  সেখানে আসে!

আসলে একটা চকচকে ও আকর্ষণীয়  উপহারের দানসামগ্রীর বিনিময়ে অন্তত উদরপূরণের ঔদার্য‍্যকে তারা ছোট করতে পারেনা বলেই হয়ত আসে।
.........

সেরকমই একটা আনন্দমূখর বিয়েবাড়ির বাইরে একটা সমবেত জনসমষ্টির কোলাহল হঠাৎ  ভেসে আসে। অতঃপর তার টানে টানে বিয়েবাড়ির ভিড়ও একটু একটু করে ঐ গোলমালের দিকে কৌতূহলী চোখে চাইতে থাকে।  সবাই দেখে যে আসরের উচ্ছিষ্ট খাবার যেখানে ফেলে দিয়ে জড়ো করা হয়েছে সেখানেই এই গন্ডগোলের সূত্রপাত।

.........

শ‍্যাম মাস্টার নামে এক খোঁড়া ও ভবঘুরে মানুষের সাথে সামনের ফুটপাতে থাকা আরোও কয়েকজনের সাথে বচসা লাগার উপক্রম।
এই শ‍্যাম মাস্টার আগে কাছের স্কুলে ভূগোল পড়াত। সে কাজে যথেষ্ট নামডাক ছিল তার। তবে সেবার হাইওয়ের ধারে  দুর্গাপুজোর সময় একটা লরির সাথে মাস্টারের সাইকেলের ধাক্কা লাগে। মাথায় চোট লেগে তখন প্রায় মৃত মাস্টারকে লোকজন ধরাধরি করে  সামনের সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় যমে মানুষে দিন দশেক টানাটানির পরে মাস্টার বেঁচে ফিরলেও,  পুরোপরি সুস্থ হয়ে উঠতে আর পারেনি কোনওদিন।

তার  তিনকূলে কেউ ছিলনা যে একটু যত্নআত্তি করবে। সেই হাসপাতালে যা চিকিৎসা হবার হলেও মাস্টারের ওই  ইস্কুলের চাকরীটা আর তারপর বেশীদিন রইল না।
.....
মস্তিষ্ক তথা স্বরযন্ত্রের অঘোষিত ষড়যন্ত্রে কথা বলাটাও ক্রমশ অস্ফূট থেকে অস্ফূটতর ধ্বনিসারে পর্যবসিত হওয়ায় জীবিকার প্রচন্ড সম‍স‍্যায় শুরু হল এবারে এক ভবঘুরে বৃত্তি। ততদিনে ছাত্র ছাত্রীরা, এমনকি তাদের বাবা -মা'রাও মাস্টারকে এড়িয়ে চলতে লেগেছে।

ব্রজ পালাকারের মা যতদিন পেরেছে মাতৃস্নেহে আপনভোলা মাস্টারকে ডেকে দু'বেলা খাবার দিত বলে মাস্টারের অপ্রয়োজনীয় পরাণটুকু শেষমেশ রয়ে গেল।
......

" এ‍্যাই ছোঁড়া....... ওরে ওই তো অরোরা বোরিওলিস রাতের আকাশে....!" অস্ফূট স্বরে শ‍্যাম মাস্টার  এসব ভাঙা গলায় বলতে বলতে ওখানে কারুর ফেলে দেওয়া দু-তিনটে লুচির টুকরো আর পায়েসের কিয়দংশ একটা দোনায়   তুলে পাশ্ববর্তী  আর একজন অবশিষ্টজীবি কানা লোচনের অতি কষ্টে সংগৃহীত কিছুটা খাদ‍্যাংশ  তড়িৎগতিতে ছিনিয়ে নিতেই  এবারে কানা লোচন তারস্বরে ও অসহায় গলায় হাঁউমাউ করে ওঠে।

সেই কলহযাপনে এলাকাল নামকরা খিস্তিবাজ ও নানা রোগে জীর্ণ ও ভিখিরিদের মুরুব্বী গুছের 'বুঁদির মা' তার কাংস‍্যবিনন্দিত  গলার জোরে আরও জনা পাঁচেক লোক জুটিয়ে এনে অর্ধোন্মাদ ও ক্ষুধার্ত ভবঘুরে শ‍্যাম মাস্টারকে তার  এই অপরাধটুকুর জন‍্য  যথেচ্ছ পীড়নের জন‍্য উস্কিয়ে দেয়।

অবশেষে তাদের সবার কাছে অকথ‍্য প্রহার ও ক্ষুধার পীড়নে মৃতপ্রায় শ‍্যাম মাস্টারকে যতক্ষণে বিয়েবাড়ির লোকজনেরা  বেরিয়ে এসে ওদের হাত থেকে শেষমেশ উদ্ধার করে ততক্ষণে প্রহারের দাপটে রুগ্নদেহী মাস্টার প্রায় মৃতপ্রায়।
.....

সামান‍্য এই খাদ‍্যাংশ যা আদতে উচ্ছিষ্ট ও বাতিল হয়ে গেছে, সেই ভুক্তাবশেষটিও যে কোন কোন মানুষের কাছে পরম তৃপ্তির হতে পারে অথবা বিবাদ ও অধিকারের বিষয় হতে পারে তা বোধহয় মানুষের সামাজিকতা  বলেই  সম্ভব। গোলমালের জেরে পাড়ার দু-একটি কুকুর কেমন যেন বিস্ময়ে মৌনতাকে অবলম্বন করে দরিদ্র মানুষগুলির এই  কান্ডকারখানা দেখতে থাকে।

এত মার খেয়েও রক্তাক্ত শরীরে মাস্টার ম্লান হাসি হেসে শেষবার বলে ওঠে, -

" খিদ‍ে পেলে সবাই দেখচি নিজের দেশের  মানচিত্তির ভেঙে খেতে শুরু করেচে ....কি ক্ষিদে...এ..এ! বাপ্ রে বাপ্!"

এই কথাটুকুর পর তার মুখে অস্ফূট বাক‍্যাংশ  বা আরও কিছু গোঙানি একসময় থেমে আসলেও তার পরণের শতছিন্ন পাজামার একটা  পকেটে তখনও একটা চ‍্যাপটানো মরা শালিকের বাচ্চার দেহ উঁকি মারছিল।

......

মাস্টার কথাটা খুব ভুল বলেনি কিন্তু! প্রচন্ড খিদের চোটে সে খানিক আগে একটা  মরা শালিক পাখিটির দেহাংশ  কোন দর্পীর পদতলে থেঁতলানো একটা স্বাদু রাধাবল্লভীর টুকরো ভেবেই হয়তো কুড়িয়ে নিয়েছিল পরে খেয়ে নেবে বলে।

আজ আদিগন্ত বিশ্বে ক্ষুধা ও তার জন‍্য সংগ্রাম ও বঞ্চনার ধারাপতনের ইতিহাসটি যেন  ক্রমশ আদিম ভূত্বকের সন্নিবিষ্ট সব জমানো সম্পদের পরে দেশ ও জনপদের চেনা মানচিত্রের বহিরাকৃতিকেও ক্রমসংকোচনের  ঘোরতর শাস্তি দিতে শুরু করেছে।

তবে গদ‍্যময় ক্ষুধার রাজ‍্যে শ‍্যাম মাস্টারের কৃত এই ভ্রান্তিটুকুও  আবহমান কালে  ঠিক একই ভাবে হয়ত জেগে থাকবে ; যেমন পূর্ণিমার চাঁদকেও ঝলসে যাওয়া রুটির অবয়বে কোনও কোনও  কবিরা  রাতের আকাশে এখনও চাইলে একবার অন্তত দেখতে পান।

............

17/04/2022

জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব- - উত্তম চক্রবর্তী


জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব
- - উত্তম চক্রবর্তী  

শোভা বাজারের গঙ্গার কাছেই কুমোরটুলিতে ছিল আমার মামা বাড়ি। ছোট বেলায় প্রত্যেক বছর দমদম সেভেন ট্যাঙ্ক থেকে মার সাথে সেখানে যেতাম দাদু মামা মামিদের বিজয়ার প্রণাম জানাতে। দিদিমা আমার জন্মের আগেই নাকি মারা গেছিলেন। দোতলা মামা বাড়িতে বড় ও মেজো মামা তাদের পরিবার নিয়ে থাকতেন সাথে অবিবাহিত ছোট মামা ও আমাদের সবার দাদু। দাদু ছিলেন প্রায় আশি বছরের বুড়ো, চোখে ভালো দেখতে পারতেন না, দুই চোখেই ছানি পড়ে সাদা সাদা হয়ে গেছিল। ঠিক মত দেখতে পেতেন না বলেই হয়ত দাদু খুব খিট খিটে ধরনের ছিলেন। এদিকে এই সুগার নিয়েই রোজ বিকেলে তার গলির মোড়ের মিষ্টির দোকানের গরম গরম রসগোল্লা খাওয়া চাই। নাহলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলতেন। ছোট মামার কাজ ছিল এক  হাঁড়ি রসগোল্লা এনে দাদুকে দিয়ে শান্ত করা। হাঁড়িতে না হলেও ডজন খানেক রসগোল্লা থাকতো। দাদু সেখান থেকে কাউকে একটাও মিষ্টি দিত না।

ছোট মামার বয়স তখন পঁচিশ হবে, রেলে চাকরী করেন। আমার বারো বছর বয়সে দাদু মারা যান। সেবার আমি বোন ও মা আমরা সবাই শ্রাদ্ধর পর বাড়ি ফিরেছিলাম। তখন থেকেই লক্ষ্য করতাম দাদুর ঘরে সন্ধ্যার পর আর কেউ যেত না। দরজাটা বন্ধ করে রাখা হত। ওখানে নাকি রোজ সন্ধ্যায় এখনো দাদু রসগোল্লা খাবার জন্য বায়না করেন আর ঘরের জিনিষ ভাংচুর করতে থাকেন বা আলমারিতে ও খাটের উপর জোরে জোরে লাঠির বাড়ি মেরে আওয়াজ করেন।

এক বছর বাদে বড় মামার বড় মেয়ের বিয়েতে আমরা দুদিন আগে থেকেই মামা বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। আমরা পাঁচ ছয়জন ভাই বোন দাদুর সেই ঘরে দিনের বেলায় ভয়ে ভয়ে গিয়ে দাদুর বিছানায় বসে ক্যারাম খেলতাম। কিন্তু মেজোমামা সন্ধ্যা ছ’টার পর ঘরের দরজায় তালা মেরে দিত। বিয়ের দিন মামা বাড়ির উঠোনে বিয়ে ও বরযাত্রীর বসার ব্যবস্থা আর দোতলার ছাতে প্যান্ডেল হয়েছিল খাওয়া দাওয়ার জন্য। মেঝমামা দাদুর ঘরের খাটের নিচে রসগোল্লা, লেডিকেনি দরবেশ দই এসব রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। দাদুর ঘরের পিছনে দিকে একটাই ভাঙ্গাচোরা জানালা বেশিরভাগ বন্ধ থাকত। ওপারে বাড়ির পিছনে মেথরদের যাবার সরু গলি ছিল। মেজোমামা ঐ ঘরের চাবি নিজের কাছেই রাখতেন, তাই বাচ্চাদের মিষ্টি চুরি করবার কোন সুযোগ ছিলনা।

রাতে যারা খাবার পরিবেশন করবে তাদের তিনজনকে সাথে নিয়ে গিয়ে মেজোমামা গেলেন দাদুর ঘরে মিষ্টি আনতে। তালা খুলে প্রথমে সামনের দিকে রাখা রসগোল্লা লেডিকেনি দরবেশ দইয়ের হাঁড়ি তাদের হাতে তুলে দিলেন। আবার ঘরে তালা মেরে চলে গেলেন ওপরে পরিবেশন দেখতে। এই ভাবে তিন ব্যাচে বরযাত্রী সহ দেড়শ জন খেয়ে নিয়েছে তখন। এখনো প্রায় সত্তর আশি জনের খাওয়া বাকি। হটাত মেজোমামার কেমন যেন সন্দেহ হল যে পিছন দিকে রাখা মিষ্টির বাসনে মিষ্টির পরিমাণ কম দেখলাম কেন ? ভয় পেয়ে গেলেন, সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে পারবেন তো ? বড়মামা জানতে পারলে তো ভীষণ রেগে যাবেন আর তার ভাইকে খুব বকাবকি করবেন। একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটে যাবে আজ।

মেজো মামা চতুর্থ ব্যাচ শুরু হতেই চুপি চুপি দাদুর ঘরের দিকে এগোলেন দেখতে যে দাদুর ভূত এসে আবার সব মিষ্টি চুরি করে খাচ্ছে না তো ? মামা চুপিসারে নিঃশব্দে ভয়ে  ভয়ে ঘরের তালা খুললেন আজ দাদুর ভূত দেখবেন ভেবে। ওমা, মেজো মামা অবাক হয়ে দেখেন দাদুর ঘরের পিছনের জানালা খোলা, ছোট মামা তার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকে মাথা নিচু করে রসগোল্লার পাত্র বের করে টপাটপ মুখে পুরছে। আর জানালার বাইরে ছোট মামার বন্ধুরা সব দাঁড়িয়ে আছে ভাগ পাবার জন্য। মেজো মামা অবাক হয়ে দেখলেন এই বিয়ে বাড়ির পরিবেশের ফাঁকেই মিষ্টি লোভী দাদুর এই ঘরে জ্যান্ত ভূতের তাণ্ডব চলছে যেন।

                     ---------শেষ---------

বড় পুকুরের পাড়ে--অঞ্জলি দে নন্দী, মম



বড় পুকুরের পাড়ে--
                                                                অঞ্জলি দে নন্দী, মম


চৈতন্যবাটী গ্রামের নন্দীদের বড় পুকুরের পাড়ে একটি বিরাট বহু পুরোনো নিম গাছ আছে। গ্রামের সবাই জানে যে ওই গাছে ভূত ও পেত্নী আছে। 

তবুও চোররা রাতে মাছ চুরি করতে যায়। গভীর রাতে তারা জাল ফেলে মাছ ধরে। খালুই ভরে। তারপরে, সকালে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করবে - এরকমই ওদের পরিকল্পনা রয়েছে। 

এক খালুই ভরে গেছে। এবার জাল থেকে মাছ পাড়ে ঝেড়ে তা দ্বিতীয় খালুইয়ে তুলে রাখছে। এমন সময় একদল ভূত ও পেত্নী তাদের ঘিরে ফেলল। ওরা শুনল, " হাউ মাউ খাউ, তোরা ছ'টা খালুই এনেছিস, সবগুলো মাছে ভর। তারপর চুপচাপ ওগুলি এখানেই রেখে চলে যাবি। না হলে সবার ঘাড় মটকাবো। হাউ মাউ খাউ...। "

এবার চোররা তাই করল। খালি জাল কাঁধে করে ভয়ে ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে গেল। 

পরের দিন সকালে নন্দীমশাই প্রাতকালে দাঁত মাজতে মাজতে মাজতে হেঁটে হেঁটে হেঁটে বড় পুকুরের পাড়ে এসে হাজির হলেন। অবাক কান্ড এ যে! উনি দেখলেন ছ'খালুই মাছ। তখন মোবাইলে ফোন করে তিনি তাঁর নাতী আশিসকে ওখানে আসতে বললেন। ব্যাপারটা শুনে আশিস তখন তাদের বাড়ির চাকরকে ও দারোয়ানকে বলল, " ছ'টা বড় থলে নিয়ে বড় পুকুরের পাড়ে চল!" এরপর ওরা সেখানে গেল। দাদু, নাতী ও দারোয়ান সব মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। খালুইগুলো ওখানেই পড়ে রইল। পুকুর পাড়ে ঝোপের আড়ালে চাকর লুকিয়ে রইল। দুপুরে সে দেখল যে জেলে পাড়ার তাদের চেনা ওই লোকগুলো খালুইগুলো নিয়ে কাঁধে তুলছে। সে তখন দৌড়ে গিয়ে চোরগুলিকে হাতেনাতে ধরল। ও ওদের বলল, " নন্দীবাবুর কাছে চল! না হলে খুব খারাপ হবে। " ওরা গেল। নন্দী মশাই ওদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, " তোরা মাছ ভর্তি খালুইগুলো ফেলে রেখে গিয়েছিলি কেনো? " ওরা তখন ঐ ভূত ও পেত্নীদের কথা বলল। এরপর উনি তাদের ছেড়ে দিলেন। 

এই রাতে নন্দী মশাই( দাদু), আশিস(দাদুর নাতী), আশিসের বাবা(দাদুর ছেলে), চাকর, দারোয়ান সবাই মিলে বড় পুকুরের পাড়ে বসে রইল। মাঝ রাতে ঐ ভূত ও পেত্নীর দল ওদের কাছে এলো। এক এক এক জন করে এসে বলল, " আমি আশিসের দাদুর বাবা। আমি আশিসের দাদুর বাবার বাবা। আমি আশিসের দাদুর মা। আমি আশিসের দাদুর মায়ের মা। আমি আশিসের দাদুর বড় পিসিমা। আমি আশিসের দাদুর বড় মাসীমা। আমি আশিসের দাদুর জেঠু। আমি আশিসের দাদুর জেঠিমা। আমি আশিসের দাদুর ছোট পিসিমা। আমি আশিসের দাদুর ছোট মাসীমা। আমরা বহু বছর ধরে এই নিম গাছের ডালে দিনের বেলায় থাকি। আর রাতে এই বড় পুকুরের পাড়ে ঘুরে বেড়াই। তোরা সবাই মিলে এইবার আমাদের প্রত্যেকের নামে গয়ায় গিয়ে পিন্ড দান কর! তাহলেই আমরা মুক্তি পেয়ে এই নিম গাছ ছেড়ে স্বর্গে যেতে পারব। আমাদের তোরা সকলে মিলে এবার উদ্ধার কর! " ওরা তাদের কথা শুনে রাতে বাড়ি এলো।

সকালে গয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সেখানে গিয়ে পিন্ড দান করে তারা ফের নিজেদের বাড়ি এল।

পরের রাতে আবার সেই বড় পুকুরের পাড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কেউই আর এল না। ওরা বুঝল যে সত্যই সব ভূত ও পেত্নীরা অর্থাৎ তাদের নিজের জনগণ সকলেই স্বর্গে চলে গেছেন, এই নিম গাছ ছেড়ে, চিরতরে। ওরা সারা রাত ওই বড় পুকুরের পাড়ে থেকে সকালে বাড়ি এল। 

তবে পুকুর পাহারা দেবার জন্য একজন পাহারাদার রাখলেন, নন্দী মশাই। সে বন্দুক নিয়ে সারা রাত নন্দীদের বড় পুকুরের মাছ পাহারা দেয়, এখন। কারণ, এখন তো আর ভূত ও পেত্নীরা তাদের পুকুরের মাছ পাহারা দেবার জন্য পাড়ের নিম গাছে নেই। তাই.........

ভুতপ্রেত কেনাবেচার ভূতহাট " -- প্রদীপ দে


   
 " ভুতপ্রেত কেনাবেচার ভূতহাট "
  প্রদীপ দে

পাঁঠার ঝোল আর রুটির ডিনার সারলাম আজ রাতে। খেয়েদেয়ে হজম করতে সামনের বাগানে পায়চারি মারতে শুরু করে দিলাম। কি ভালো না লাগছে! ফুরফুরে বাতাসটা আমার হাতের আঙুলের মাংসের গন্ধ মেখে আমায় জানান দিচ্ছে আমি কতই না বড় লোক! না হলে এই বাজারে কেউ দুবেলা পাঁঠার মাংস খায়? কিন্তু আমি খাই -- আমি হলাম গিয়ে বংশধর হালুই।

আমার বংশধরেরা একেবারে সোজা সহজ সরল ছিল না, উল্টে তারা মানুষ ছিল ভীষণই জটিল। সব সময়েই লোকের ক্ষতি করা,লোকের জমি জমা সম্পত্তি ভুলিয়ে ভালিয়ে অথবা বিপদে ধার কর্জ দিয়ে শেষে গায়েব করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এরকম করে জমিদারি রাখা এবং সম্পত্তি বাড়াতে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত।
আমিও যেন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি তাই আমার নামেই বংশধর লাগিয়ে আমাকে তাদের পালকযুক্ত করেছিল। সত্যি কথা বলতে ভয় নেই।আমি আমার গুনের বংশের কথা অকপটে স্বীকার করে নিলাম।

ভাবার সময় পেলুম না সামনেই জ্যাঠামশাই লাঠি হাতে জ্যাঠামি হাসি হেসে চলেছে। আমি অবাক। জ্যাঠার আগমনে। কোথা দিয়ে উদয় হলেন কে জানে? 
--  কিরে বংশ কেমন আছিস? সামনেই তো ভোট?

--  হ্যা হ্যা করে গাল ভর্তি হাসি এলো। শালা গুরুজন এসে গেল। তবুও --
--  তুমি এখন কোথা দিয়ে? মুক্তি হয়নি তোমার?

--  দূর শালা কেউ তো এখনো কিনলো না -- সবাই টিপে -টাপে চলে যায়। দাম দেয় না -সব কিপ্টের দল!

--  সে  আবার কি কথা?  ভূতকে কেউ কিনবে নাকি? মুক্তির সংগে তার যোগই বা কি?

--  হ্যাঁ রে তোর দেখছি এখনো বুদ্ধি হয়নি! আমাদের বংশধর হিসাবে তোকে মানায় না। দেখছিস না চারিদিকে কিরকম নেতা কেনা বেচা চলছে?

--  আরে তার সংগে ভূতের কেনা -বেচার কি সম্পর্ক?

--   আরে শোন ভোটে নেতার মত ভূত ও কেনাবেচাও চলে সমান তালে।

--  সেটা আবার কি?

--  দেখতে চাস?  চল আমার সংগে হাটে ---

জ্যাঠা মানেই ভূত। আর ভূতে ধরলে রক্ষা নেই। পিছু নিলাম, না পা দুটো ওঁর পিছনে এগিয়ে গেল, বুঝলাম না। কিছুটা যাওয়ার পর অন্ধকার একটি মাঠ পেলাম। সেখান থেকে কলরব নেকী সুরে গান আর ঢপাস ঢপাস ঢেপসি নাচের আওয়াজ পেলুম।অনেক ভিড় -- সকলের চোখে যেন টুনি বাতি চকমকিয়ে জ্বলছে।

জ্যাঠা বললে -- এটা ভূতহাট - ভূতমাঠ।

প্রথমদিকে ভয় পেলেও পরে আশস্ত হলাম - চেনা জন সবাইকে দেখে। আমার পূর্বপুরুষ প্রায় সকলেই আছে প্লাস আমার জানাশোনা মৃতরা!
আসল কথা বদমাশেরা সকলেই আছে যাদের কপালে, পাপকর্মের ফলে, এখনো মুক্তি জোটে নি

ভূতপ্রেত ছাড়া আমার মত অনেক লোক থলে হাতে বাজার করছে। কি বাজার?
-- সব ভূত প্রেত পেত্নী দক্ষ -দানব এই সব।
মানুষের মধ্যে আমিই একা যার হাতে থলে নেই।
মানে আমিই একমাত্র যে এই বাজারের হদিশ জানতাম না। 
যা হবার হয়েছে  যাকগে,-- এসেছি যখন একটঘুরে দেখি ---

অবাক কান্ড ---
তান্ত্রিকেরা বস্তা করে ভূত পেত্নী কিনেছে এবং বেশ কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করেই। একজন সাইকেলে ভূতে ভর্তি বস্তা বাঁধছিল, ধরলাম -- দাদা এগুলো কি কাজে লাগবে? ভয় লাগে না?

--  হা হা হা --- হেসে উঠলেন ক্রেতা -- না না দাদা ভূতে ভয় নাই -- ভূত ভাল। ওদের দিয়ে মানুষের অনেক উপকার হয়। তুক -তাক বশীকরণ আরো কত কি! আর মানুষ?   ছ্যা - ছ্যা মানুষ?  ওদের দিয়ে কোন কাজ হয় না, শুধু ক্ষতি করতে জানে।

আরো কিছু রাজনৈতিক দলের লোকজনদের দেখলাম -ভূত কিনছে।
জিজ্ঞাসা করলাম -- দাদা ভূত প্রেত কেন কিনছেন?

-- দাদা -সামনে ভোট। নেতার সঙ্গে সঙ্গে  ভূতও কিনে ষ্টক রাখতে হচ্ছে। ওরাই তো আমাদের শেষ অস্ত্র, শেষ ভবিষ্যৎ!

আমার দাদুকে একজন কিনলো। মৃত আত্মীয়রা দেদার দামে কয়েক মাসের চুক্তিতে বিকিয়ে গেল।

ভূতের ভূতুড়ে হাটে -- মৃতজনেরা মরার পর হা - পিত্তেস করে বসে থাকে নিজেদের দাম গুনে বিকিয়ে যাওয়ার আশায়!

আমি মানুষ হয়ে লজ্জায় ফিরে এলাম -- মানুষের  কোন দাম নেই দেখে -- আবার ভূতেদের না কিনে না উপকার করে, ওদের কোন কাজে না লাগতে পেরে। লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেল!
-----------------------------------------------


***পরিচিতি :
লেখক নেশায় লেখে। অবসর জীবন।  বয়স -৬৩ । বিবাহিত। নিজের লেখা বই আছে। অনেক পত্রিকায়  লেখা প্রকাশ পায়। বিদেশের পত্রিকায় লিখি।

প্রদীপ কুমার দে
বিরাটী আবাসন
এল আই জি -৯
এম বি রোড
নিমতা
কোলকাতা -৭০০০৪৯
মোবাইল -৮০১৭২৬৭৬২৬

PRADIP KUMAR DEY
Birati Housing Estate
LIG - 9
M.B.ROAD.
NIMTA
KOLKATA - 700 049
West Bengal
INDIA
Mobile - 8017267626 ( Whatsapp)

অলৌকিক উপস্থিতি--দীপঙ্কর চৌধুরী


অলৌকিক উপস্থিতি--
                                                                   দীপঙ্কর চৌধুরী

রথীন বিশ্বাস কর্মযোগের কারণে কলকাতার একটি শ্মশানের নিকট এক পুরনো তিনতলা পাকা বাড়িতে একাই বসবাস করত। সেখান থেকে তার অফিস কয়েক মাইল দূরে। প্রতিদিনই রথীন বাবু বাড়ি থেকে অফিস যাতায়াত করতেন। তবে রথীন বাবু যে বাড়িতে থাকতেন সেখানে একজন বৃদ্ধ চাকর রবীন খুড়ো তাঁর দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ওই রবীন খুড়োকে দেখতে একটু অদ্ভূত রকম ছিল। যেমন তাহার চোখ দুটো ছিল টকটকে লাল, চুলগুলো ধপধপে সাদা, দাড়িগুলো প্রচন্ড বড়ো দাবড়া দাবড়া ও হাত এবং পায়ের নখগুলো হিংস্র পশুর মতন। অফিসের কাজের চাপে রথীন বাবুকে প্রায়ই  মধ্যরাত্রিতে বাড়ি আসতে হতো। তবে যে পথ দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরতেন সেই পথটি ছিল ঘন অরণ্যে বেষ্টিত। বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে রথীনবাবু বৃদ্ধ চাকরের সঙ্গে গল্প গুজবে বসতেন। বৃদ্ধ চাকর রবীন খুড়ো রথীন বাবুকে বলতেন সেই বাড়ির নিকট যে শ্মশানটি রয়েছে, সেই শ্মশানটি তে একটি আত্মার উদ্ভব ঘটে ঠিক মধ্যরাত্রিতে। আর ঠিক ঐ দিনই যখন রাত্রি একটা বেজে তিরিশ মিনিট তৎক্ষণাৎ ওই সময় শ্মশানটি থেকে এক উচ্চ আর্তনাদ ভেসে আসছে। এবং তার কাছাকাছি তে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। হঠাৎ করে রথীন বাবুর নিদ্রা ভাঙ্গে। তিনি তার কক্ষের দক্ষিণ জানালা দিয়ে লক্ষ করেন এক অদ্ভূত আকারে একজন বৃদ্ধ ঘন সাদা পাঞ্জাবী পোশাকে ওই নির্জন স্থানে থেকে হাঁক দিচ্ছেন “রথীন তুমি কোথায়?" রথীনবাবু একেবারেই হতভম্ব। মুখশ্রীতে চিন্তিত ভাব ক্ষণিকে তার মাথা থেকে ঘাম ঝরে চলেছে অবিরত। হাত-পা কেঁপে চলেছে। কিন্তু রথীনবাবু অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। তাই তৎক্ষণাৎ তিনি দ্রুত বেগে গমন করেন ওই অদ্ভুত আকৃতির বৃদ্ধর নিকট। যখন তিনি সেই শ্মশানে পৌঁছালেন তখন দেখতে পেলেন ক্ষণিক পূর্বে যে লোকটি “রথীন তুমি কোথায়?" বলে আর্তনাদ করছিল সে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। যেনো, সে ছিল কোন এক আত্মা। আর তার উপস্থিতি ছিল আলৌকিক। পরদিন সকালে রথীনবাবুর যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন সেই চাকরটি তাকে বলল- গতকাল রাত্রে মনে হয় ওই শ্মশান থেকে কেউ আপনার নাম ধরে ডাকছিল যে- “রথীন তুমি কোথায়?" মনে হয় যেন ওই বৃদ্ধ চাকর তিনি উপস্থিত ছিলেন ঘটনা সময়ে। রথীনবাবু উত্তরে জবাব দিলেন- হ্যাঁ ছিল। তবে আমি যখন তার নিকট যাই তখন উনি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। কথাটি বলেই তিনি অফিসের পথে অগ্রসর হলেন। এবং অফিস যাওয়ার পথে তিনি পাশের বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারেন যে বাড়িতে রথীনবাবু বসবাস করেন সেই বাড়িতে নাকি কেউ থাকেনা। তবে গত চোদ্দ দিন পূর্বে একজন বৃদ্ধ মারা যান। তিনি অবশ্য সেই বাড়িতে চাকরের কর্মে কর্মরত ছিলেন। কথাটি শোনার পর রথীন বাবু আরও একবার হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তিনি একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়লেন। এবং সেদিন অফিস না গিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়ি এসে দেখলেন যে, এই বৃদ্ধ আর বাড়িতে নেই। রথীনবাবু বৃদ্ধকে চারিদিকে খুঁজলেন কিন্তু কোথাও তার দর্শন পেলেন না। তিনি ভাবলেন বৃদ্ধ হয়তো সত্যিই আর নেই। হয়তো বৃদ্ধ রবীন খুড়ো তার আত্মার শান্তির জন্য ওই বাড়ির প্রতি নিজের মায়া দূরীভূত করার জন্য ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন গত চোদ্দ দিন ধরে। এরপর রথীনবাবু মানসিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। এবং তিনি ভাবতে থাকেন ওই বুড়ো এতদিন তার নিকট ছিল কিন্তু কদাপি তার কোনোরূপ ক্ষতি পর্যন্তও করেনি। আবার তার নিকট সে সত্যিই একজন চাকরের মতন ছিল। বরং তার সর্বদা ভালোই চেয়েছিল। তাই রথীনবাবু বৃদ্ধ চাকর রবীন খুড়োর আত্মার শান্তির জন্য তাঁর শ্রাদ্ধ করলেন। এবং পরিশেষে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করলেন।

সম্পাদকীয়--


সম্পাদকীয়--

যদি প্রশ্ন করা যায় আমাদের মনের মধ্যে ভয়ের ব্যাপারটা কোথা থেকে এলো? আসলে মৃত্যুই তার প্রধান কারণ। মানুষ মরণশীল, জগতের সব প্রাণীর পরিণতি হল মৃত্যু । মানুষের কাছে মৃত্যু হল সবচেয়ে রহস্যময় । আমরা আছি, নেই, আজ আছি, কাল নেই আর এই মৃত্যুর পর মানুষের অবস্থান, পরিণতি কি ? আত্মার কি আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে ? মুনি ঋষিদের প্রজ্ঞা-জ্ঞান এ ব্যাপারে অনেক কিছু উজাগর করেছে। তাদের মতে, আত্মা অজর, অমর। মানুষ দেহ ত্যাগ করে, দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অমর আর এই আত্মাই নাকি নামান্তরে ভূত বলে পরিচিত। আর ভুতের অলৌকিক কিছু শক্তিও নাকি আছে। ওরা রূপ বদলায়, রূপান্তরিত হতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে পারে, দোষীকে শাস্তিও দিতে পারে। অনেক অলৌকিক শক্তির অধিকারী এরা-- ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সঙ্গে মানুষের জন্মান্তরবাদও একটা বড় রহস্য।

অলৌকিক প্যারানরমাল ব্যাপারটা বড় রহস্যের সঙ্গে সঙ্গে বড় রোমাঞ্চকরও বটে। অনেকে বলেন, ভয় থেকে ভুতের জন্ম। ব্যাপারটা অনেকাংশে সত্য। 

মানুষ যদি ভগবানকে বিশ্বাস করতে পারে তবে ভূতকে নয় কেন? হ্যাঁ ভূতের সংজ্ঞা অনেক রকম হতেই পারে-- অশুভ শক্তি, দেবতার পাশাপাশি অত্যাচারী রূপী আসুরিক শক্তি এগুলি সবই তো প্যারানরমাল বা অলৌকিকতা ধর্মী। তবে একটা কথা লক্ষ্য করার মত যারা ভূত বিশ্বাস করেন না তাদের অন্তরে ভূতের ভয় বেশী থাকে। 

আসলে ওই মৃত্যু রহস্যের মাঝেই এ সব মিরাকেল লুকিয়ে আছে। মৃত্যু জীবনের এক চিরন্তন সত্য, এ দিকটাকে কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না। 

আমাদের এবারের সংখ্যা, ভূত-ভৌতিক সংখ্যা। মানুষ মাত্রেই এ বিষয়টির ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপেক্ষাকৃত বেশি উৎসাহী।  কাল্পনিক স্বপ্নালু সে সঙ্গে ঘটনার মধ্যে অলৌকিক চমৎকারী কিছু মিশে গেলে আমাদের আগ্রহের কোন অন্ত থাকে না। 

এ সব নানা কথা ভেবে আমরাও বর্তমান সংখ্যা ভূত-ভৌতিক বিষয় নিয়ে তৈরি করেছি। বর্তমান সংখ্যাটি আপনাদের সবাইকে পড়ে দেখতে অনুরোধ জানাই। আপনাদের মূল্যবান মন্তব্য আমাদের পথ প্রদর্শনে সাহায্য করবে। 

এ প্রসঙ্গে আরও একটা কথা জানিয়ে রাখি, আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলি আগে-পরে সাজানোর ক্ষেত্রে কোন আলাদা পরিকল্পনা থাকে না। ভালো লেখা বা ভালো লেখক পত্রিকার শুরুতে স্থান পাবেন এমন কোন ভাবনা আমাদের নেই--বেশিরভাগটুকু আগে-পরে পৌঁছনোর ক্রমানুসারে সাজানো হয়। আমাদের পত্রিকায় নামিদামি লেখকরা যেমন আছেন তেমনি আগামীর সম্ভাবনাকেও ধরে রাখার জন্য অনামী, নবীন লেখকরাও আছেন। আজ এ পর্যন্ত--নিবেদন ইতি--তাপসকিরণ রায়।

সহ- সম্পাদকের কলমে:

আমাদের নিত্যদিনের চেনা শোনা জগতের   বাইরেও  যে একটা অজানা অদেখা জগত আছে, একথা অনেকেই  বিশ্বাস করেন। অনেকে আবার এসব বিশ্বাস করতে চান না। আছে আর নেই এ বিষয়ে অদ্যাবধি তর্কও বড়ো কম হয়নি। পারলৌকিক জগতে বিশ্বাসকে দৃঢ় করতেই হোক বা অজানা তথ্য আহরণের জন্যই বসেছেন প্ল্যানচেটে
 বিশ্বাস আর অবিশ্বাস যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। আবার এটাও ঠিক এমন অনেক ঘটনা ঘটে থাকে যার ব্যাখ্যাও যুক্তি বুদ্ধির অতীত।
এবারের  বিষয় হলো ভূত- ভৌতিক- অলৌকিক। অজানা-অদেখা অতীন্দ্রিয়  জগতের গল্প। ভূত আছে কী নেই, এ নিয়ে যতই বিতর্ক থাক না কেন ভূত বা ভৌতিক জগত সম্বন্ধে মানুষের কৌতূহলও কিছু কম নয়! আবার লৌকিক বিশ্বাসের বাইরেও যে কিছু শক্তি ক্রিয়া করে অর্থাৎ অলৌকিক ঘটনাবলী সম্পর্কে ও মানুষের আগ্রহের সীমা পরিসীমা নেই।
তবে ভূতের অস্তিত্বটুকুও যে ক্রমশ বিপন্ন হয়ে আসছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। না আছে আশ শ্যাওড়ার ঘন জঙ্গল না কোন পোড়ো বাড়ী। শ্যাওড়া গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা পেত্নীরাও একপ্রকার বাধ্য হয়েই এখন ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। প্রমোটারের কল্যাণে এ সমস্ত অবলুপ্তির পথেই বলা যায় ,যদিও বাঁশবাগানের বাঁশঝাড় গুলি এখনো সম্পূর্ণ রূপে তেনাদের  হাতছাড়া হয়নি। ভূত নিয়ে তর্ক বিতর্ক যারা করে করুক, ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে যাদের সন্দেহ থাকে থাক, ভূতের গল্পের অস্তিত্ব বজায় রাখতেই হবে। দেশে বিদেশে সাহিত্য জগতের অনেকটা জুড়েই রয়েছে  ভৌতিক জগতের সাম্রাজ্য।  
      শুধু মাত্র শিশু কিশোর সাহিত্য  নয়, বড়দের অনেক পত্রিকাই ভূত বিষয়ক সংখ্যা প্রকাশ করে থাকে।
        এবারের অণুগল্প গুলির মধ্যেও এবারে  ভূতেরাই না হয় বিচরণ করুক স্বচ্ছন্দে ।-- সাবিত্রী দাস।

অভিশপ্ত ব্রীজকলমেঃ স্বপ্না মজুমদার পুনা (মহারাষ্ট্র)


অভিশপ্ত ব্রীজ
স্বপ্না মজুমদার, পুনা (মহারাষ্ট্র)


নীরা আর সঙ্গীতা কলকাতায় পড়াশোনা করে প্রথম চাকরির প্লেসমেন্টে পুনা শহরে এলো।দুজনেই এক কলেজ থেকে পাশ করেছে।পুনাতে প্রথম প্লেসমেন্ট পেয়ে দুজনেই খুব খুশি। খুব যে বিশেষ বন্ধু ওরা,,তেমন নয়। তবে অচেনা শহরে দুটি বাঙালি মেয়ে বেশ ঘনিষ্ঠ হওয়ায়, বন্ধুত্ব হয়েছে এখন। হাওড়া থেকে আজাদ হিন্দ ট্রেনটিতে আরো অনেক বাঙালি ছেলে মেয়ের সাথে আলাপ হয়েছিল নীরা আর সঙ্গীতার।
এখানে এসে একটি মেসে দুজনে থাকবে ঠিক করেই এসেছিল। সেই মতো নিজেদের রুমটি ওরা গুছিয়ে গাছিয়ে নিল।দু,তিন দিন একটু এদিক ওদিক ঘোরাঘুরিও করলো। নীরা বলছিল,---জানিস তো এখানে কাছাকাছি অনেক দারুন দারুন জায়গা আছে,
ধীরে ধীরে ঘুরবো কেমন।
----- এসেছি তখন,ঘুরবো তো ঠিকই। তবে আগে অফিসে জয়েন করি। কি যে কাজ হবে বুঝতে পারছি না।
----- আমার অফিস তো বলেই দিয়েছে,,এখন তিন মাস রোজ যেতে হবে।তারপর ওয়ার্ক ফ্রম হোমে কাজ করতে হবে তবে,ওই দুদিন সপ্তাহে যেতে হবে মনে হয়।
----- সেই রে।দেখা যাক।কোভিডের পরে সব সিচুয়েশন ঘুরে গেছে।

দিন কয়েক পরেই দুজনেই অফিস জয়েন করে। আইটি ইন্ডাষ্ট্রির শহর এটা। চারিদিকে অনেক অফিস দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই মন দিয়ে কাজ করছে। সেদিন অফিস থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে যায় দুজনের। বৃষ্টি শুরু হয়েছে।পাহাড়ি শহর।প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে। অফিসের ক্যাবে দুজন শুধু। বেশ ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ রাস্তায় বড়ো গাছ পড়েছে দেখে ড্রাইভার বলে,-- থোড়া ঘুমকে যানা পাড়ে গা।ইয়ে রাস্তা তো বন্ধ লাগতা হ্যায়।
নীরা বলে,--- উও তো দেখা হমনে।চলিয়ে দুসরি রাস্তে সে।
ড্রাইভার গাড়ি অন্য রাস্তায় ঘুরিয়ে চালাতে শুরু করে।
একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে চলতে শুরু করতেই দূর হতে
সাদা পোষাক পরা তিনজন,হয়তো স্বামী,স্ত্রী ও ছোটো বাচ্চা হবে। ওরা এগিয়ে আসতে থাকে,আর হাত দেখাতে থাকে লিফট চাই ওদের। নীরা বলে,--- এই বৃষ্টিতে ওরা বেশ বিপদে পড়েছে মনে হয়।ড্রাইভার,,আপ রুকিয়ে। লিফট দেনা হ্যায়।
ড্রাইভার বলে,--- নেহি,,ঠিক সে দেখিয়ে।উন লোগো নে ক্যায়সে আতে হ্যায়। উও ভূত হ্যায়। মুঝে জলদি যানা হ্যায়। রুকুঙ্গা নেহি।ইয়ে ব্রীজ মে কভি কভি আ্যয়সা হোতা হ্যায়,,শুনা হ্যায় ম্যায়নে।
----  শুনা হ্যায় তো,,ইধার আয়া কিঁউ?
---- ক্যায়া করু ম্যাডাম! যানে কে লিয়ে অর রাস্তা নেহি।
নীরা, সঙ্গীতা দেখে সত্যিই তো ওদের পা কোথায়?
ওরা যেনো উড়ে উড়ে আসছে। ভয় পেয়ে যায় ভীষন দুজনে।দেখে এতো বৃষ্টির মধ্যেও ওরা ভেজেনি।
ভীষন ভয়ে দুজনে দুর্গা নাম জপ করতে থাকে।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা গাড়ি যেতে যেতে হাত ইশারায় বলে,--- জলদি সে যাইয়ে।
নীরা, সঙ্গীতা পিছনে তাকিয়ে দেখে ওই তিন মূর্তি খুব জোরে জোরে গাড়ির পিছনে দৌড়চ্ছে।
ড্রাইভার খুব দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে ব্রীজ পার হবার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ  আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়,আলো ঠিকরে পড়ে।
বৃষ্টি আরো জোরে পড়তে থাকে। হঠাৎ দেখে গাড়িতে ড্রাইভার নেই।গাড়ি উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়চ্ছে।
নীরা, সঙ্গীতা ভয়ে আড়ষ্ঠ।ফোন করতে থাকে চারিদিকে। পুলিশ স্টেশনে।
গাড়িটা জোর ধাক্কা মারে ডিভাইডারে।
নীরা, সঙ্গীতা রক্তাক্ত,অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকে গাড়ির মধ্যে।পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ড্রাইভারকে পাওয়া যায় মৃত অবস্থায় ব্রীজের নীচে।
বাড়ির লোক কলকাতা থেকে ছুটে আসে। অফিসের লোকজন আসে।সবাই বলাবলি করে, বেশ কিছু বছর আগে ওই ফ্যামিলিটা কার আ্যকসিডেন্ট করে এই ব্রীজে। সে সময় অনেক লিফট চেয়েছিল ওরা। কোনো গাড়ি সেদিন বর্ষার রাতে ওদের লিফট দেয়নি। পরে মধ্য রাতে ট্রাকের ধাক্কায় ওরা মারা যায়। সেই থেকে বর্ষা রাতে ওদের এভাবে কেউ কেউ লিফট চাইতে দেখেছে মাঝে মাঝে।লিফট দিতে গাড়ি স্লো হলেই ওরা গাড়িটাকে ব্রীজ থেকে ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দেয়। এভাবে এই ব্রীজে অনেক আ্যকসিডেন্ট হয়েছে।
নীরা, সঙ্গীতা হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেও
ভয় ওদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। মনের সুস্থতার জন্য এখন ওরা দুজনেই  সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং করছে।ড্রাইভারের মৃত্যুটা বেশ রহস্য হয়ে রইলো।
বন্ধ চলন্ত গাড়ি থেকে  কিভাবে ব্রীজের নিচে গিয়ে পড়লো কেউ বুঝতেই পারলো না।হয়তো গাড়ির দরজা খুলে গিয়েছিল।।

***মহারাষ্ট্র, পুনা

লাখু গোয়ালার গরু-- ঋভু চট্টোপাধ্যায়


লাখু গোয়ালার গরু--                
ঋভু চট্টোপাধ্যায়



দরজাটা হাল্কা খুলে মুণ্ডুটা দরজার ভিতরে কিছুটা ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাক্তার সাহেব আসব?’ ডাক্তারবাবু মাথা তুলে একবার দেখে বললেন, ‘তুমি কে,সোজা আমার ঘরে, কি ব্যাপার?’

–এজ্ঞে আমি লাখু গোয়ালা,আমার লখির লগে এয়েছি।

–কি হয়েছে তোমার লখির?

-এজ্ঞে বাচ্চা দিবেক।

–বাচ্চা দিবেক তো ভর্তি করে দাও।

-এজ্ঞে ইখানেই গ্যাঁড়া, ভরতি লিছে নাই।

-কেন?

-এজ্ঞে টিকিটের লাইনে কত কথা, বাপের নাম শুধায়, মায়ের নাম শুধায়।

-তুমি তাদের নাম বলবে।

-ইখানেই গ্যাঁড়া, মায়ের নাম জানি, আদুরি, কিন্তু বাপের নাম তো জানি না।

–কেন? তোমার মেয়ে নয়?

-বিটির পারা বটে, কিন্তু বিটি লয়।

-তাহলে যার মেয়ে তার নামটা লিখে দাও, আর এখান থেকে যাও, আমার অনেক কাজ।

–উখানে তো নাম লিছে নাই।

-আচ্ছা আমি বলে দেব, এবার নাম নিয়ে নেবে।

তারপরেই মহকুমা হাসপাতালের সুপার বেল বাজিয়ে হাসপাতালেরর এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিকে ডেকে বললেন,‘এই পল্টু এই লোকটার কি হয়েছে একটু দেখে দিও তো।’ কর্মচারি ভদ্রলোক আচ্ছা বলে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট কুড়ি পরে এক্কেবারে হাঁপাতে হাঁপাতে সুপারের ঘরে এসে বলেন,‘স্যার লোকটা একটা গরু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে এসেছে, গরু নাকি বাচ্চা দেবে।’ কথাটা শুনেই সুপারের মাথার অবশিষ্ট চুলগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা আরম্ভ করে দিল।এই হাসপাতালে যোগ দেওয়ার পর প্রতিদিনের নিত্য নতুন ঝামেলাতে মাথার চুল পঞ্চাশটাতে গিয়ে ঠেকেছে।ঝামেলা বলে ঝামেলা, জন্ম প্রমান পত্র থেকে মৃত্যু প্রমান পত্র, ডাক্তার থেকে জমাদার, মোক্তার থেকে ফোক্তার, ঝামেলা করতে কেউ বাদ দেয় না।এর পর রোগী থেকে ভোগি, পেসেন্ট পার্টি থেকে লোকাল পার্টি, ব্যান্ড পার্টি ও তো আছে।সুপারের অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা ঘুমিয়ে বাঁচি।কিন্তু এসব কথা বাইরের লোককে বলা যায় না।তাই একটু ঝাঁঝ নিয়ে বলেন, ‘লোকটাকে ডাকো তো দেখি।’ ডাকতেই লাখু গোয়ালা হাজির।সুপারের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা পেন্নাম ঠুকে বলে, ‘বলেন স্যার।’

–তোমাকে এই হাসপাতালে গরু নিয়ে আসতে কে বলেছে?এটা কি গরুর হাসপাতাল?

-তা লয় জানি, কিন্তু আমাকে যে বললেক এখন মানুষের হাসপাতালে পশুদেরও চিকিৎসে হচে।

শেষের কথাটা শুনে সুপার রীতিমত রেগে উঠে বলেন, ‘কে বলেছে, এই কথা কে বলেছে শুনি।’

-এজ্ঞে আমার পুঁটিকে যে মাস্টার পেরাইভেট পড়ায়, সেই তো বললেক।

-তোমাকে বলে দিলে, আর তুমি অমনি নিয়ে চলে এলে।

-কি করব সার, আমি তো লেকাপড়া শিখি নাই, আমাকে যা বললেক তাই করলুম। বললেক, ‘লাখু কাকা, তুমার গরুর বাচ্চা দিবে, তুমি আমাদের মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে চলে যাবে।’ আমি অবাক হয়ে শুধারাম, ‘আমাদের হাসপাতালে আমার লখির চিকিৎসে করবেক কেনে?’ আমাকে বললেক, ‘তুমার আর বুদ্ধি হল নাই কাকা, কলকেতাই মানুষের হাসপাতালে কুকুরের টিরিটমেন্ট হইচে, আমাদের হাসপাতালে তুমার গরুর চিকিৎসে হবেক না কেনে?’

আমি বললুম, ‘নারে তুই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস।’ আমাকে বললেক, ‘নাগো কাকা, তুমি এক কাজ কর, পঞ্চায়েত অফিস থেকে লিখিয়ে নাও।’

আমি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পাড়ার ডালু বোসকে বললাম, দুদিন পর ডালু বোস কাগজ দিয়ে দিলেক, আমার লগে ভারি খাতির কিনা।শেষের কথাগুলো শুনেই সুপার রীতিমত অবাক হয়ে বলল,‘তোমাকে কাগজ দিয়ে দিলে?’

–লাখু বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলে, ‘হুঁ, দিবে নাই কেন? আমাদের গাঁয়ের বটে।’

রাগে তখন সুপারের মাথা ফুটতে আরম্ভ করছে।যথা সম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলে, ‘দেখি তো কাগজ টা।’

লাখু গোয়ালা পকেট থেকে কাগজটা বের করে সুপারের হাতে দিল।কাগজটা পড়ে সুপারের চোখ দুটো  খুলে পাশের গাছে চেপে যাওয়ার মত অবস্থা হল।কাগজের ভাষা সত্যি হলে গরুর নাম লক্ষী ঘোষ, বাবার নাম লক্ষণ ঘোষ।সুপার কাগজটা টেবিলে রেখে লক্ষণের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি পড়াশোনা কর নি?’

–এজ্ঞে না, নুনু বেলাতে গেদে অভাব ছিল, পড়তে পারি নাই।

সুপারের অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করলেও কিছু না বলে শুধু বলে, ‘দেখ এটা মানুষের হাসপাতাল, এখানে পশুর চিকিৎসা হয় না।’ লাখু বলে,‘কেনে, কলকেতার হাসপাতালে কুকুরের টিরিটমেন্ট হলে ইখানে গরুর হবেক নাই কেন?’

এই প্রশ্নে সুপার কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না,শুধু বলে,‘তোমাদের গ্রামে গরুর ডাক্তার যায় না?’

–যায় সার, তবে ভালো লয়, প্যাটে পুকার উষুধ দ্যায়, উসব খেলে গরুট গেদে লাদে,ইতিমধ্যে বাইরে একটা গোলমাল শুনে সুপার তার চেম্বারের বাইরে এসে দেখে হাসপাতালে ভিতরে সবাই একটা গরুকে নিয়ে অস্থির। গরুটাও হাম্বা হাম্বা করে ডেকে বেশ কয়েকটা ঘরে কিছু ক্ষয় ক্ষতি করে শেষে লেবার রুমে ঢুকে পড়েছে।কথাটা শুনে লক্ষণ লেবার রুমের ভিতর গিয়ে মিনিট দশ পরে হাসি মুখ নিয়ে বেরিয়ে বলে, ‘আমার লখির বকনা হইছে। গ্যাঁজলাটা কেটি গেলে আপনাকে খাঁটি দুধ খাওয়াবো।’

 

***Sougata Chatterjee
B1-85/1, V.K.Nagar, M.A.M.C, Durgapur-713210
Paschim Bardhaman
Phno- 6295919013
Email-wribhuwriter.dgp@gmail.com

ঋভু চট্টোপাধ্যায়
আসল নাম সৌগত চ্যাটার্জী। সরকারি স্কুল শিক্ষক। প্রকাশিত লেখা আনন্দবাজার, দেশ, সুখী গৃহকোণ, গৃহশোভা, তথ্যকেন্দ্র, প্রভৃতি বাণিজ্যিক পত্রিকা। মনকলম, দেখা, সহ বহু লিটিল ম্যাগাজিন। বাংলা লাইভ, উদ্ভাস সহ একাধিক অন লাইন পত্রিকায়। নিয়মিত লেখা বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতে।

বাবা --দেবাশীষ চক্রবর্তী


বাবা --
দেবাশীষ চক্রবর্তী 
  
একটি বাংলা সংবাদ চ্যানেলের সাংবাদিক এষা রোজকার মতোই আজও রাত দশটা নাগাদ ট্রেন থেকে নামল। মাঘের প্রথম, বেশ ঠান্ডা। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ায় পুরো কাঁপিয়ে দিচ্ছে । পরিকল্পনা করে এষা যে রাস্তা দিয়ে বাড়ি যায় তার সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। এষা প্ল্যাটফর্ম থেকে নামল চারদিকে অন্ধকার।
    স্টেশন থেকে তার বাড়ি হেঁটে যেতে মিনিট সাতেক লাগে।
অন্যদিন সে হেঁটে যায় আজ তার একটু ভয় ভয় করছিল। তা ছাড়া সঙ্গে ছাতাও নেই। দুটো টোটো দাঁড়িয়েছিল। ও জানে ওরা যাবে না। এক নেতার দুর্নীতি ফাঁস করে দেওয়ার পর টোটো আর অটো চালকদের স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, কেউ যদি এষাকে যাত্রী হিসেবে নেয় তা হলে সে আর এই রুটে গাড়ি চালাতে পারবে না। সব জেনেও সে টোটো চালকদের ভাড়া যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল, কিন্তু ওরা রাজি হল না। 
     বাবার মৃত্যুর পর বাড়িতে মা একাই থাকেন। এষা তাঁকে  বিরক্ত করতে চাইল না, তাই যা আছে কপালে ভেবে এষা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে দুই যুবক তার দুপাশে এসে দাঁড়াল। এষা জোরে পা চালাতে যেতেই দুই যুবক তাকে এক ঝটকায় রাস্তার পাশের এক পরিত্যক্ত-বন্ধ কারখানর ভিতর টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বোঝা গেল কারখানার দরজা খোলাই ছিল।
   এতক্ষণে অন্ধকার অনেটাই এষার চোখ সওয়া হয়েগেছে। সে চিৎকার করতে গিয়ে থমকে গেল। অন্ধকারেই দেখল ওদের একজনের হাতে রিভলভার আর অন্যজনের হাতে ধারাল ছুরি চকচক করছে।
    ওর দিকে রিভলভার তাক করা ছেলেটা গালাগালি দিতে দিতে হিস হিস করে উঠল, বিরাট সাংবাদিক হয়েছিস না? এবার কী হবে? তোকে খাব; মারব তারপর পুঁতে দেব। তোকে কে বাঁচাবে তোর বাপ?
    কথাগুলো শুনতে শুনতে অসহায় এষা চোখ বুজে ফেলেছিল। হঠাৎ ধপ করে একটা আওয়াজ হল। এষার চোখ খুলে গেল। সে দেখল, রিভলভারধারী যুবকটি কুড়িফুুট দূরের দেওয়ালের গায়ে আছড়ে পড়ল। তার বাবা দ্বিতীয় যুবকটিকে দুহাতে তুলে দেয়ালের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। এষা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। 
    বাবাকে দেখে এষা কেঁদে ফেলল, বাবা, তুমি এসেছ বাবা!
সে বাবার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। বাবা হাত দেখিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। এষা দেখল বাবারও চোখের কোনায় জল চিক চিক করছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বাবা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে দুই যুবকের উপর কুড়িফুট উঁচু পাঁচিলটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।


***লেখক পরিচিতি:- পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার সুখচরে নভেম্বরের পাঁচ তারিখে জন্ম। বাংলা সাহিত্যে ও শিক্ষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং এম.ফিল. বতর্মানে বিদ্যালয়ে
শিক্ষকতা করেন।
   খুব ছোট থেকেই লিখছেন। একটি ষাণ্মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। চারজনের সঙ্গে একটি যৌথ কবিতার বই আছে। লেখক কবিতা, ছড়া, নাটক আর গল্প লেখেন।

ইন্দিরালয়, নরসিংহ দত্ত ঘাট রোড,
সুখচর, কলকাতা- ৭০০১১৫
চলভাষ- ৯৮৩০৭৯৪৪৮৯
হোয়াটসঅ্যাপ- ৯৭৪৮২৮৩০৩৩
ইমেল- aamidebashis21@gmail.com

জলমাতার সঙ্গে একদিন--তৈমুর খান


জলমাতার সঙ্গে একদিন--
তৈমুর খান


হঠাৎ জলের উপর ভেসে উঠলাম। পৌষের বিকেলবেলা। বুড়িগঙ্গার দুই তীরেই মানুষ থৈথৈ করছে। জলে ডুবুরি নেমেছে। বেশ কয়েকটি ট্রলার এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছে। মৃতদেহগুলি সারি সারি শোয়ানো আছে। তাহলে আমি কী করে বাঁচলাম? সত্যি আমি কি বেঁচে আছি? নিজের প্রতি সন্দেহ হলো। একটা টলার আমার দিকে ছুটে আসছে। কয়েকজন পুলিশ এবং ডুবুরি বলছে: ওই তো একজন ভেসে উঠল! এখনও জীবিত আছে! সাঁতার দিচ্ছে! আশ্চর্য তো!

    আমার কাছাকাছি এসেই দুই পাশ থেকে হাত দিয়ে টেনে তুলল ট্রলারে। ডাক্তারও অপেক্ষা করছিল। সবকিছু দেখে বলল ঠিকঠাক আছে। কিন্তু আশ্চর্য! সকাল ছয়টা থেকে এই বিকেল চারটে পর্যন্ত জলের তলায় থেকে জল শোষণ করে শরীরটা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিছুই হয়নি। পেটেও তেমন জল নেই। চোখ-মুখও স্বাভাবিক। ওরা একের পরে এক প্রশ্ন আমার দিকে ছুঁড়ে দিতে লাগল।

 —এতক্ষণ ধরে কোথায় ছিলেন?

 —তা তো বলতে পারব না।

 —ব্রিজ ভেঙে বাসটি সম্পূর্ণ জলে ডুবে যায়। তেমন কেউই বের হতে পারেনি। এখনও পর্যন্ত ৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনও জলের তলায় কমপক্ষে ১০ জন রয়ে গেছে। ডুবুরিরা তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। অথচ আপনাকে কেউ দেখল না!

 —আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! বাসটি যখন প্রচণ্ড শব্দে জলে পড়ে, তখন পর্যন্ত আমি জেনেছিলাম। তারপর আমার আর কী হয়েছিল কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি সাঁতার কাটছি। আর আপনাদের দেখতে পাচ্ছি।

 —এটা কি সম্ভব? একেবারে অবাস্তব। বারো ঘন্টা ধরে জলের তলায় কোনো মানুষ জীবিত থাকতে পারে না। ইটস্ এ গ্রেট মিস্ট্রিরিয়াস থিংস্।

 —কিন্তু আমিতো মরিনি। আমিতো জীবিতই আছি। চা খাবার ইচ্ছে করছে আমার। গরম গরম দু'কাপ চা খাব।

  সবাই অবাক হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ডাক্তার বলল: আপাতত কোনো ওষুধ লাগবে না। তবে নজরে রাখতে হবে। আপনি এখন ফিরতে পারবেন না। ক্যাম্পে থাকুন।

  আমাকে দেখতে শয়ে শয়ে লোক ভেঙে পড়ল। সাংবাদিকরা একের পরে এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে লাগল । ক্যামেরাম্যান বিভিন্ন রকম অ্যাঙ্গেলে ফটো তুলতে লাগল। আমি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু একটা কথাই বারবার বলতে লাগলাম: আমার কিছু মনে নেই। কীভাবে আমি জলের তলায় ছিলাম সেটাও মনে করতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে, কেউ যেন আমাকে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। এত দ্রুত যাচ্ছিল যে আমি কিছুরই ঠাহর করতে পারছিলাম না। চোখ খুলে তাকাতেও পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কোনো এক পাতালে চলে যাচ্ছি।

     সেদিন অনেক রাতে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দৌলতপুর থানার পুলিশ আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। বাড়ি পৌঁছেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সারা শরীর জুড়ে কীরকম এক ধরনের ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল। আর নিজেকে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। সত্যিই আমি কি বারো ঘন্টা ধরে বুড়িগঙ্গার জলের তলায় স্বপ্ন দেখছিলাম?

     সেদিন ছিল সোমবার। শনিবার হাফবেলা স্কুল ছুটি করে বাড়ি এসেছিলাম। সোমবার ফাস্ট বাস গিয়ে আবার স্কুল করতাম। সেই উদ্দেশ্যেই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বাসে উঠি। ডি এস টি সি বাস। এইটুকু মনে পড়ছে বাসের ড্রাইভার একহাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেছিলেন। অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে কার সঙ্গে জোরে জোরে ঝগড়া করছিলেন। এতই রেগে গেছিলেন যে তিনি দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাই বাস আর কন্ট্রোলে রাখতে পারেননি। দৌলতপুর ব্রিজ ভেঙেই বুড়িগঙ্গার জলে পড়ে যায়। কেবল বাসের খালাসী সাঁতার কেটে তীরে ফিরতে পারে। ড্রাইভারসহ বাসের সব যাত্রীরই সলিল সমাধি ঘটে। তাহলে আমি?

   জলে বাস পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাসে জল ঢুকতে শুরু করে। অধিকাংশ যাত্রীই শীতের পোশাকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের ঢেকে রেখেছিলেন। কেউ কেউ ঘুমের মধ্যেও ছিলেন। ওই পর্যন্তই আমার চেতনা। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখি একটা আশ্চর্য ঘরের মধ্যে আমি বসে আছি। চারিপাশে জল। কিন্তু ঘরের মধ্যে এক ফোঁটাও জল প্রবেশ করছে না। জলই যেন প্রাচীরের মতো দণ্ডায়মান হয়ে আছে। আমার সম্মুখে দীর্ঘদেহী অতীব ফর্সা অশীতিপর এক বৃদ্ধা বসে আছেন। তার চারিপাশে স্তূপ হয়ে আছে মানুষের কঙ্কাল। এত কঙ্কাল! মনে মনে চমকে গেলাম। বৃদ্ধার আয়ত চোখের দিকে চেয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। তারপর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম: 

—আমি কোথায় এসেছি?

 বৃদ্ধা বললেন: জলপুরীতে।

 —আপনি কে?

 —আমি জলমাতা।

 —জলমাতা! এরকম নাম তো কোনোদিন শুনিনি!

 —জলমাতারা কখনও স্থলে যায় না। তারা জলেই থাকে। জলেই ঘরবাড়ি আর জলেই সংসার।

 আরও অবাক হয়ে ভালো করে চেয়ে দেখলাম। জলমাতার হাত পায়ের আঙুলগুলো মানুষের মতো হলেও অনেক অনেক দীর্ঘ। মাথার চুল সাত হাতের বেশি। বৃদ্ধা হলেও শরীরের ত্বক যুবতী নারীর মতোই উজ্জ্বল ও টকটকে লাল। তিনি যেখানে বসে আছেন তার নিচে জলেরই একটা চৌকি। কিন্তু জল এতটুকু নড়াচড়া করছে না। স্তব্ধ হয়ে খাড়া হয়ে আছে। শরীরে পোশাক বলতে ঝিকিমিকি এক ধরনের রেশমের কাপড়। দুই হাতের আঙুলেই প্রবালের পাথর বসানো আংটি। দুই ঠোঁট এমনই রসালো যে মনে হচ্ছে এখনই কোনো দামি সুস্বাদু পানীয় পান করে এলেন। আমি এসব দেখতে দেখতেই বললাম:

 —সংসারের তো কিছুই দেখছি না!

 কথাটি শুনেই তিনি আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করলেন:

 —ওই দ্যাখ!

 নির্দেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে থেকে জলের স্তম্ভ সরে গেল। সম্মুখে উজ্জ্বল হয়ে উঠল একটা আলোক শোভিত অট্টালিকা। মাছের আঁশের মতো উজ্জ্বল চকচকে এর দেওয়াল। ইট দ্বারা যে নির্মিত নয় তা বুঝতে পারলাম। জলের ঢেউকে একত্রিত করে জমাটবদ্ধ করলে যেরকম হয় ঠিক সেরকমই মনে হল। বাড়ির মধ্যে ছোট ছোট অনেক ছেলেমেয়ে ছোটাছুটি করছে। তাদের পরনে ফ্রক জাতীয় পোশাক। কয়েকজন সুন্দরী যুবতী রুপোলী মাছের মতন মনে হচ্ছে ভেসে বেড়াচ্ছে। এক স্বর্গীয় প্রতিভাসে মেতে ওঠা স্বপ্নাতুর দৃশ্য। সারা শরীরে শিহরন অনুভূত হল। তারপর বললাম:

 জলমাতা, আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে! কিছু পানীয় যদি পান করাতে পারেন?

 জলমাতা বসে বসেই তার হাতখানা প্রসারিত করলেন। আর অমনি দুই হাতে লাল ও নীল রঙের পানীয় এনে বললেন: পান কর। এতেই তোর তৃষ্ণা ও ক্ষুধা নিবারণ হবে।

 অদ্ভূত সেই পানীয়ের স্বাদ। এখনও মুখে লেগে আছে। এখনও ক্ষুধা-তৃষ্ণা বলে কিছু নেই। মনে হচ্ছিল অমৃত পান করছি। সমুদ্র মন্থন করা সেই অমৃত।  সেদিন  তা পান করার পর জলমাতাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম: চিরঋণী রইলাম। আপনার দয়া কোনোদিন ভুলতে পারবো না।

 জলমাতা বললেন: দয়াতো প্রথম থেকেই করেছি। বাসে থাকা সবযাত্রী মারা গেছে। আমি শুধু তোকেই বাঁচিয়েছি। আমার হাতের কাছে তুই ছিটকে পড়েছিলি। তবে একটা শর্ত আছে। এটা সারাজীবন তোকে মেনে চলতে হবে।

 কী সেই শর্ত?

 জলমাতা আঙ্গুল তুলে ইশারা করলেন। সেই দিকে তাকাতেই দেখি, আরও তিনটে বাস জলের তলায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন জলের তলায় থেকেও বাসগুলি নষ্ট হয়নি। তা দেখতে দেখতে বললাম: ওগুলো তো বাস! কখন পড়েছিল?

 জলমাতা বললেন: ১০ বছর আগে, আরেকটি ৫ বছর আগে, আরেকটি ৩ বছর আগে। একইভাবেই সব প্যাসেঞ্জারেরই সলিল সমাধি ঘটে। আমার যখন ইচ্ছে হয় তখন এভাবেই একটা বাসকে জলের তলায় আকর্ষণ করি। আর এভাবেই বাস এ্যাক্সিডেন্ট হয়। কেউ জীবিত ফিরে যেতে পারে না।

 —তাহলে আমি তো জীবিত! আমিও কি ফিরে যেতে পারব না?

 একটা শর্তে ফিরে যেতে পারবি, তা হলো, এই জলপুরীর কথা পৃথিবীর কোনো মানুষের কাছে কোনোদিনও বলতে পারবি না। যেদিন বলা শুরু করবি, সেদিনই মুখে রক্ত উঠে মারা যাবি। কেউ বাঁচাতে পারবে না।

 আমি জলমাতার শর্তে রাজি হলাম। বললাম: কোনোদিনও আমি একথা মুখে উচ্চারণ করব না। কোনোদিন আমি বলব না। শুধু আমাকে একটা চিহ্ন দিন সারাজীবন আমি নিজের কাছে রাখব।

 জলমাতা একটা আংটি দিলেন। আর বললেন প্রবালের আংটি। ডান হাতের মধ্যমায় ধারণ করবি। কোথায় পেয়েছিস কেউ জানতে চাইলে কোনোদিনও বলবি না।

 সেই থেকেই এই প্রবালের আংটি আমার হাতে রয়েছে। জলমাতার গল্প কারও সামনেই করিনি। আজ ইচ্ছে হল তাই লিখে জানালাম। জলমাতা, আমাকে ক্ষমা কোরো।

বাঁশবাগানের ভূত -- সাবিত্রী দাস

বাঁশবাগানের ভূত সাবিত্রী দাস আজ যে এত দেরী হয়ে যাবে কে জানতো! পরের হাটবারে ভোর থাকতে বেরোলে দুধ বেচে ঠিক সময়ে  ফিরতে পারবে পানুর...